অবৈধ গ্যাস সংযোগের চেষ্টায় পাইপলাইনে ছিদ্র, মেরামতের পর স্বাভাবিক সরবরাহ
কিশোরগঞ্জের কটিয়াদী উপজেলার আড়িয়াল খাঁ নদের তলদেশ দিয়ে যাওয়া তিতাস গ্যাসের হাই-প্রেশার সঞ্চালন পাইপলাইনের ছিদ্র সফলভাবে মেরামত করেছে তিতাস গ্যাস কর্তৃপক্ষ। প্রায় দুই মাস ধরে চলা গ্যাস লিকেজের অবসান ঘটিয়ে বিশেষ প্রযুক্তি ব্যবহার করে পাইপলাইনের ছিদ্র স্থায়ীভাবে বন্ধ করা হয়েছে। এর ফলে কিশোরগঞ্জ শহরসহ আশপাশের এলাকায় গ্যাস সরবরাহ ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হতে শুরু করেছে।
বৃহস্পতিবার (৬ আগস্ট) বিকেলে কিশোরগঞ্জে তিতাস গ্যাস ট্রান্সমিশন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন পিএলসির জোনাল বিক্রয় কার্যালয়ের ব্যবস্থাপক মো. মোশাররফ হোসেন বিষয়টি নিশ্চিত করেন।
তিনি বলেন, পাইপলাইনের ছিদ্র সফলভাবে মেরামত করা হয়েছে। বর্তমানে ধাপে ধাপে গ্যাস সরবরাহ স্বাভাবিক করা হচ্ছে।
স্থানীয়দের ভাষ্য, প্রায় দুই মাস আগে কটিয়াদী উপজেলার মসূয়া ইউনিয়নের কাজীরচর এলাকায় আড়িয়াল খাঁ নদের পানির নিচ থেকে গ্যাসের বুদবুদ উঠতে দেখা যায়। প্রথমদিকে গ্যাস নির্গমনের পরিমাণ কম থাকলেও সময়ের সঙ্গে তা বাড়তে থাকে। শেষ দুই সপ্তাহে উচ্চচাপের কারণে পানির ওপর ফোয়ারার মতো গ্যাস বের হতে থাকে, যা স্থানীয়দের মধ্যে আতঙ্ক সৃষ্টি করে।
পাইপলাইন মেরামতের সময় কিশোরগঞ্জ শহরের বিভিন্ন এলাকায় গ্যাস সরবরাহ সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা হয়। তবে কাজ শেষ হওয়ার পর অধিকাংশ এলাকায় চুলায় গ্যাসের চাপ আগের তুলনায় স্বাভাবিক হতে শুরু করেছে।
তিতাস গ্যাস কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, অবৈধ গ্যাস সংযোগ নেওয়ার উদ্দেশ্যে প্রায় দেড় ইঞ্চি আকারের একটি ছিদ্র করা হয়েছিল। তবে উচ্চচাপের কারণে সেখানে সংযোগ দেওয়া সম্ভব হয়নি। পরে প্রকৌশলীরা তিন স্তরের পাইলিংয়ের মাধ্যমে পাইপলাইনের চারপাশের পানি সরিয়ে ওয়েল্ডিং করে স্থায়ীভাবে ছিদ্রটি বন্ধ করেন।
তিতাস গ্যাসের ময়মনসিংহ বিভাগের সিস্টেম অপারেশন অ্যান্ড মেইনটেন্যান্স শাখার আঞ্চলিক অপারেশন (ভালুকা) ব্যবস্থাপক মো. শামীম হোসেন বলেন, “কাজটি অত্যন্ত চ্যালেঞ্জিং ছিল। তবে সফলভাবে ছিদ্রটি বন্ধ করা গেছে। এখন পাইপলাইনের নিরাপত্তা আরও জোরদারে উন্নতমানের সুরক্ষা টেপ ব্যবহার করা হবে।”
তিনি আরও জানান, প্রাথমিক হিসাবে ছিদ্র থাকার কারণে শেষ কয়েক দিনে প্রতিদিন প্রায় ৫ থেকে ৬ লাখ টাকার গ্যাস অপচয় হয়েছে।
তবে মেরামতকাজে অংশ নেওয়া কয়েকজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে দাবি করেন, ছিদ্রটি এক ইঞ্চিরও বেশি ছিল এবং গ্যাসের চাপ অত্যন্ত বেশি থাকায় শেষ দুই সপ্তাহে প্রতিদিন প্রায় ২০ লাখ টাকার গ্যাস অপচয় হয়েছে। তাঁদের ধারণা, সব মিলিয়ে প্রায় ২০ কোটি টাকার গ্যাস অপচয় হয়ে থাকতে পারে। তবে এ হিসাব তিতাস গ্যাস কর্তৃপক্ষ আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত করেনি।
এ ঘটনায় গত ৪ আগস্ট কটিয়াদী মডেল থানায় বাংলাদেশ গ্যাস আইন, ২০১০ অনুযায়ী মামলা করে তিতাস গ্যাস কর্তৃপক্ষ।
মামলায় সুনামগঞ্জের ছাতক উপজেলার একটি চুনাপাথর কারখানার মালিক দেলোয়ার হোসেন তালুকদারকে প্রধান আসামি করা হয়েছে। পাশাপাশি জমির মালিক সুমন মিয়াসহ অজ্ঞাতপরিচয় আরও কয়েকজনকে আসামি করা হয়।
মামলার পর ৫ আগস্ট রাতে অভিযান চালিয়ে কাজীরচর এলাকার দুই জমির মালিক সুলতান উদ্দিন আকন্দ ও সুমন মিয়াকে গ্রেপ্তার করে কটিয়াদী মডেল থানা পুলিশ।
পুলিশ জানায়, গ্রেপ্তার ব্যক্তিরা হলেন কাজীরচর গ্রামের মৃত আসাদুজ্জামানের ছেলে সুলতান উদ্দিন আকন্দ এবং একই গ্রামের রেজাউল করিমের ছেলে সুমন মিয়া। মামলার প্রধান আসামি দেলোয়ার হোসেন তালুকদারকে গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে।
এর আগে গত ৩ আগস্ট কটিয়াদী উপজেলার সহকারী কমিশনার (ভূমি) ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট লাবনী আক্তার তারানার নেতৃত্বে ঘটনাস্থলে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালিত হয়।
অভিযানে উপজেলা প্রশাসন, তিতাস গ্যাসের আঞ্চলিক অপারেশন বিভাগ, প্রশাসন ও লিগ্যাল বিভাগের কর্মকর্তারা অংশ নেন। এ সময় অবৈধ চুনাপাথরের কারখানাটি উচ্ছেদ করা হয় এবং অবৈধ সংযোগে ব্যবহৃত বিভিন্ন আলামত জব্দ করা হয়।
কারখানা থেকে জব্দ করা ৭ হাজার ৮০০ ঘনফুট চুনাপাথর মসূয়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যানের জিম্মায় রাখা হয়েছে।
সরকারের একাধিক সংস্থার তদন্তে পাইপলাইনে অবৈধ গ্যাস সংযোগের চেষ্টাকেই ঘটনার মূল কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
মসূয়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আবু বক্কর সিদ্দিক বলেন, “এ ঘটনায় পুরো এলাকায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছিল। ভবিষ্যতে যাতে এ ধরনের অবৈধ স্থাপনা গড়ে উঠতে না পারে, সে বিষয়ে সবাইকে সচেতন থাকতে হবে।”
স্থানীয়ভাবে বিভিন্ন ব্যক্তির নাম আলোচনায় এলেও তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত কারও সম্পৃক্ততার বিষয়ে নিশ্চিত মন্তব্য করা সম্ভব নয় বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
কটিয়াদী মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. রফিকুল ইসলাম বলেন, “মামলার পর দুজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। প্রধান আসামিকে গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে। তদন্ত অব্যাহত রয়েছে।”











Warning: Array to string conversion in /home/dkishoreganj/public_html/wp-content/plugins/gs-facebook-comments/public/class-wpfc-public.php on line 311
Array