বাংলাদেশের সঙ্গে বৈষম্য? আইসিসির ‘ডাবল স্ট্যান্ডার্ড’ নিয়ে প্রশ্ন তুলল উইজডেন
আগামী মাসে ভারত ও শ্রীলঙ্কায় অনুষ্ঠেয় টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপকে কেন্দ্র করে এরই মধ্যে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। ইতিমধ্যে বাংলাদেশ দল বিশ্বকাপ থেকে নিজেদের প্রত্যাহার করে নিয়েছে, যার পরিবর্তে টুর্নামেন্টে খেলবে স্কটল্যান্ড। নিরাপত্তা ঝুঁকির কথা জানিয়ে বাংলাদেশ ভারতের মাটিতে খেলতে অপারগতা প্রকাশ করেছিল এবং বিকল্প ভেন্যু হিসেবে শ্রীলঙ্কায় ম্যাচ আয়োজনের প্রস্তাব দেয়। তবে আন্তর্জাতিক ক্রিকেট কাউন্সিল (আইসিসি) সেই প্রস্তাবে সম্মতি দেয়নি। অথচ গত বছর চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফিতে পাকিস্তানের বাইরে ম্যাচ আয়োজনের জন্য ভারতের করা অনুরূপ দাবিকে মেনে নিয়েছিল সংস্থাটি। এ দুই ঘটনার প্রেক্ষাপটে বিখ্যাত ক্রিকেট ম্যাগাজিন উইজডেন প্রশ্ন তুলেছে—এটি কি আইসিসির ‘ডাবল স্ট্যান্ডার্ড’ নয়?
এবারের ইন্ডিয়ান প্রিমিয়ার লিগ (আইপিএল) নিলামে রেকর্ড ৯ কোটি ২০ লাখ রুপি দিয়ে বাংলাদেশের পেসার মোস্তাফিজুর রহমানকে দলে নেয় বলিউড অভিনেতা শাহরুখ খানের মালিকানাধীন কলকাতা নাইট রাইডার্স (কেকেআর)। তবে ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের চলমান কূটনৈতিক টানাপড়েনের প্রভাব পড়ে এই ক্রিকেটারকে ঘিরেও। ভারতীয় গণমাধ্যমে প্রচারিত নানা ‘প্রোপাগান্ডা’র প্রভাবে কট্টর হিন্দুত্ববাদী গোষ্ঠী মোস্তাফিজকে আইপিএল থেকে বাদ দেওয়ার দাবি তোলে।
এই দাবির পরিপ্রেক্ষিতে ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ড বিসিসিআই কেকেআরকে মোস্তাফিজকে দল থেকে বাদ দেওয়ার নির্দেশনা দেয় বলে অভিযোগ ওঠে। এর প্রতিক্রিয়ায় বাংলাদেশ আসন্ন বিশ্বকাপ ভারতে গিয়ে খেলতে অস্বীকৃতি জানায়। ভারতের মাটিতে বাংলাদেশ দলের খেলোয়াড়, স্টাফ, সমর্থক ও সাংবাদিকদের নিরাপত্তা ঝুঁকি বিবেচনায় নিয়ে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড (বিসিবি) আইসিসিকে ভেন্যু পরিবর্তনের প্রস্তাব দেয়।
কিন্তু ভারতীয় জয় শাহর নেতৃত্বাধীন আইসিসি নিরাপত্তা ঝুঁকির বিষয়টি আমলে নেয়নি। বরং বাংলাদেশকে ভারতের মাটিতেই খেলতে হবে বলে কঠোর অবস্থান নেয় সংস্থাটি এবং অন্যথায় টুর্নামেন্ট থেকে বাদ দেওয়ার ইঙ্গিত দেয়। শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশ নিজেদের অবস্থানে অনড় থাকায় আইসিসি বিকল্প দল হিসেবে স্কটল্যান্ডকে অন্তর্ভুক্ত করে।
উইজডেন তাদের প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছে, একই ধরনের ঘটনা ২০২৫ সালের চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফির আগেও ঘটেছিল। টুর্নামেন্টটি পাকিস্তানে আয়োজনের কথা থাকলেও ভারত স্পষ্ট জানিয়ে দেয়, তারা পাকিস্তানে সফর করবে না। নিজেদের ম্যাচের জন্য নিরপেক্ষ ভেন্যুর দাবি তোলে দেশটি। দীর্ঘ আলোচনার পর আইসিসি সেই দাবি মেনে নেয় এবং ভারত তাদের সব ম্যাচ দুবাইয়ে খেলে। একই ভেন্যুতে সব ম্যাচ খেলার সুবিধা নিয়ে শেষ পর্যন্ত ভারত টুর্নামেন্টের শিরোপাও জিতে নেয়।
উইজডেনের বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে ন্যায্যতা আদৌ কি শর্তসাপেক্ষ—সে প্রশ্ন এখন জোরালো হয়েছে। ভারত সিদ্ধান্ত জানানোর জন্য তিন মাস সময় পেয়েছিল, অথচ সূচি ও গ্রুপ ঘোষণার পর বাংলাদেশের হাতে ছিল মাত্র এক মাস। শুধু সময়ের ব্যবধান কি আইসিসির এই বৈষম্যমূলক অবস্থানকে ন্যায্যতা দিতে পারে?
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, সংকট তৈরিতে মোস্তাফিজুর রহমানকে ঘিরে ভারতের রাজনৈতিক বার্তা দেওয়ার ভূমিকা উপেক্ষা করা যায় না। বিসিসিআই কখনোই মোস্তাফিজকে বাদ দেওয়ার কারণ হিসেবে স্পষ্টভাবে নিরাপত্তার কথা বলেনি; ‘সাম্প্রতিক পরিস্থিতি’—এই অস্পষ্ট ব্যাখ্যাই দেওয়া হয়েছে। বাংলাদেশ এটিকে নিরাপত্তা হুমকি হিসেবে দেখেছে। যুক্তি ছিল—যদি একজন খেলোয়াড়ের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা না যায়, তবে পুরো দল কীভাবে নিরাপদ থাকবে?
উইজডেন আরও মন্তব্য করেছে, মোস্তাফিজকে বাদ দেওয়ার বিষয়ে ভারতের সিদ্ধান্ত ছিল নিঃশর্ত ও অনুতাপহীন। কোনো ব্যাখ্যা ছাড়াই একজন খেলোয়াড়কে সরিয়ে দেওয়ার মাধ্যমে বিসিসিআই কার্যত দেখিয়ে দিয়েছে, ক্রিকেট রাজনৈতিক উদ্দেশ্যেও ব্যবহৃত হতে পারে। প্রশাসনিক ক্ষমতা ব্যবহার করে ক্রিকেটকে রাজনৈতিক বার্তার বাহন বানানো হয়েছে বলেও ইঙ্গিত দিয়েছে ম্যাগাজিনটি।
বিশ্লেষণে বলা হয়, ভারত জানে তাদের অর্থনৈতিক শক্তি ও সুপারস্টার নির্ভর বাজার ছাড়া আইসিসির টুর্নামেন্ট কার্যত অচল। সে কারণেই তারা পাকিস্তানে যেতে অস্বীকৃতি জানিয়ে নিজেদের ইচ্ছা চাপিয়ে দিতে পেরেছে। শুরু থেকেই পাল্লা ভারতের দিকেই ভারী ছিল। বাংলাদেশের সেই সামর্থ্য না থাকায়, নীতিগত অবস্থান নেওয়ার খেসারত হিসেবেই বিশ্বকাপ থেকে ছিটকে যেতে হয়েছে তাদের।
উইজডেনের উপসংহারে বলা হয়েছে, আইসিসি এখন নীতি-নৈতিকতা ও ন্যায্যতার মানদণ্ডের চেয়ে ভারত তোষণেই বেশি মনোযোগী। অর্থনৈতিক শক্তির জোরে ভারত আইসিসি এবং অনেক সদস্য দেশকে দিয়ে নিজেদের পক্ষে সিদ্ধান্ত আদায় করে নিতে সক্ষম হচ্ছে। এমন পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের মতো দেশের জন্য আত্মমর্যাদা ও নীতিগত অবস্থান বজায় রেখে রুখে দাঁড়ানোই একমাত্র পথ।













