রাজনীতি, মামলা আর ক্রিকেট—সাকিবকে ফেরানোর জটিল সমীকরণ
সাকিব আল হাসান আগেও দেশে ফিরে জাতীয় দলে খেলার আগ্রহ প্রকাশ করেছিলেন। তবে নানা জটিলতায় তা সম্ভব হয়নি। ফারুক আহমেদ বোর্ড সভাপতি থাকার সময় থেকেই বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড (বিসিবি) তাঁকে ফেরাতে চাইলেও এখন পর্যন্ত সফল হয়নি। তবে এবার প্রকাশ্যেই সাকিবকে জাতীয় দলের জন্য বিবেচনায় রাখার ঘোষণা দিয়েছে বিসিবি। পাশাপাশি তাঁর ফেরার একটি সময়ও নির্ধারণ করেছে বোর্ড। আগামী মার্চে পাকিস্তানের বিপক্ষে ঘরের মাঠের ওয়ানডে সিরিজ দিয়েই সাকিবকে জাতীয় দলে ফেরানোর ইচ্ছা বিসিবির।
২০২৪ সালের ৫ আগস্টের গণ–অভ্যুত্থানের পর আর দেশে ফিরতে পারেননি সাকিব। ওই বছরের জানুয়ারিতে অনুষ্ঠিত জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তিনি আওয়ামী লীগের সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। তিনি চেয়েছিলেন ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে ঘরের মাঠে দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে টেস্ট ম্যাচ খেলে আন্তর্জাতিক টেস্ট ক্রিকেটকে বিদায় জানাতে। কিন্তু তত দিনে তাঁর বিরুদ্ধে একাধিক মামলা হওয়ায় দেশে এলে গ্রেপ্তার হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়। পাশাপাশি বিরোধীদের রোষানলে পড়ার ভয়ও ছিল। ফলে ফারুক আহমেদের নেতৃত্বাধীন বোর্ড চাইলেও সাকিবের সেই ইচ্ছা পূরণ করতে পারেনি।
বর্তমান বিসিবি সভাপতি আমিনুল ইসলামের বোর্ডেও শুরু থেকেই সাকিবকে ফেরানোর আকাঙ্ক্ষা ছিল। পরিচালকদের মধ্যে অনানুষ্ঠানিকভাবে এ বিষয়ে একাধিকবার আলোচনা হলেও প্রথমবারের মতো ২৪ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত বোর্ড সভায় বিষয়টি আনুষ্ঠানিকভাবে উত্থাপিত হয়।
সভা শেষে বিসিবির মিডিয়া কমিটির প্রধান আমজাদ হোসেন সাংবাদিকদের জানান, ফর্ম ও ফিটনেস সন্তোষজনক হলে সাকিবকে আবার জাতীয় দলে বিবেচনায় নেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে। একই সংবাদ সম্মেলনে বিসিবি পরিচালক আসিফ আকবর জানান, বিষয়টি নিয়ে সরকারের সঙ্গে যোগাযোগ শুরু করেছেন বিসিবি সভাপতি আমিনুল ইসলাম।
সাকিবকে ফেরানোর প্রক্রিয়ার সর্বশেষ অবস্থা সম্পর্কে জানতে চাইলে আসিফ আকবর প্রথম আলোকে বলেন, ‘এ বিষয়ে আমাদের বোর্ড সভাপতি সরকারের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করছেন। আমরা আশা করছি, আগামী মার্চে ঘরের মাঠে পাকিস্তানের বিপক্ষে সিরিজেই সাকিবকে আবার জাতীয় দলে দেখা যাবে।’
এই সিরিজই কি সাকিবের শেষ আন্তর্জাতিক সিরিজ হবে—এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, ‘আমরা চাই সাকিব দেশের হয়ে আবার খেলুক এবং সেটা এই পাকিস্তান সিরিজ থেকেই। এরপর সে খেলা চালিয়ে যাবে কি না, সেটা পুরোপুরি তার সিদ্ধান্ত।’
বাংলাদেশে পাকিস্তান দলের সফরটি দুই ধাপে অনুষ্ঠিত হবে। মার্চে তিন ম্যাচের ওয়ানডে সিরিজ খেলে তারা দেশে ফিরে যাবে। এরপর ২৬ মার্চ থেকে শুরু হওয়া পিএসএল শেষ করে মে মাসে দুই ম্যাচের টেস্ট সিরিজ খেলতে আবার বাংলাদেশে আসবে।
বিসিবির সঙ্গে সাকিবের যোগাযোগ শুরু হয় প্রায় এক মাস আগে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক বোর্ড পরিচালক জানান, সাকিব নিজেই আবার দেশের হয়ে খেলার আগ্রহ প্রকাশ করেছেন। তাঁর ভাষায়, ‘সরকারে কিছু পরিবর্তন আসায় সে হয়তো আত্মবিশ্বাসী হয়েছে। সে খুব আগ্রহ দেখিয়েছে যে এবার কিছু হতে পারে।’
বিসিবির ধারণা, জাতীয় দলের হয়ে সাকিবের খেলায় কোনো বাধা থাকা উচিত নয়। বাংলাদেশের ক্রিকেটে তাঁর অবদান বিবেচনায় নিয়ে দেশের মাটিতে খেলে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটকে বিদায় জানানোর সুযোগ দেওয়া উচিত বলেও মনে করে বোর্ড।
যদিও সাকিবের বিরুদ্ধে মামলা এখনো বহাল রয়েছে। তবে সাবেক ক্রীড়া উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভুঁইয়া সরকারে না থাকায় বড় কোনো বাধা আসবে না বলে বিশ্বাস বিসিবির। বর্তমানে আইন উপদেষ্টা অধ্যাপক আসিফ নজরুল একই সঙ্গে যুব ও ক্রীড়া উপদেষ্টার দায়িত্বে থাকায় বিসিবির পক্ষে বিষয়টি এগিয়ে নেওয়া তুলনামূলক সহজ হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। সরকারের মনোভাবও ইতিবাচক বলে মনে করছে বিসিবি।
তবে ১২ ফেব্রুয়ারি জাতীয় নির্বাচনের আগে বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারের হাতে সময় খুব বেশি নেই। এত অল্প সময়ের মধ্যে সাকিবের ফেরার প্রক্রিয়া কতটা মসৃণ হবে—এ নিয়ে প্রশ্ন থাকলেও এক বোর্ড পরিচালক বলেন, ‘মার্চের আগে এখনো যথেষ্ট সময় আছে। নির্বাচনের পর বিষয়টি আরও সহজও হতে পারে।’
বিসিবির সিদ্ধান্ত জানার পর নিউইয়র্কে অবস্থানরত সাকিব আল হাসানের সঙ্গে মুঠোফোনে কথা হয়। তিনি আনুষ্ঠানিক বক্তব্য না দিলেও স্পষ্টভাবে জানান, দেশের হয়ে আবার খেলতে চান। সরকারের সঙ্গে বিসিবির আলোচনার মাধ্যমে দেশে ফেরা ও জাতীয় দলে খেলার সুযোগ তৈরি হবে বলে আশাবাদী সাকিব। পাকিস্তান সিরিজকেই আপাতত পাখির চোখ করছেন তিনি।













