গণতন্ত্র ও সার্বভৌমত্ব রক্ষায় ঐক্যের ডাক প্রধানমন্ত্রীর
শনিবার ঐতিহাসিক ৭ নভেম্বর জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস উপলক্ষে আয়োজিত শোভাযাত্রাপূর্ব সমাবেশে প্রধান অতিথির বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেছেন, দেশি-বিদেশি যেকোনো ষড়যন্ত্রের জবাব ঐক্যবদ্ধভাবে দেওয়া হবে। দেশের ভেতরে কিংবা বাইরে—যেখান থেকেই ষড়যন্ত্র হোক না কেন, তা মোকাবিলায় সবাইকে ঐক্যবদ্ধ থাকার আহ্বান জানান তিনি। প্রধানমন্ত্রী বলেন, এ দেশের বীর জনগণকে অতীতেও কেউ দাবিয়ে রাখতে পারেনি, ভবিষ্যতেও পারবে না।
প্রধানমন্ত্রীর এ বক্তব্য এমন এক সময়ে এসেছে, যখন দেশের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক পরিস্থিতি নানা চ্যালেঞ্জের মুখে। পোশাকশিল্পে শ্রমিক অসন্তোষ, বিভিন্ন স্থানে নাশকতার ঘটনা এবং বিরোধী দলের সরকারবিরোধী কর্মসূচি ঘিরে রাজনৈতিক অঙ্গনে উত্তেজনা তৈরি হয়েছে। এসব ঘটনার পেছনে দেশি-বিদেশি ষড়যন্ত্রের অভিযোগও তুলছেন সরকারের মন্ত্রী ও রাজনৈতিক নেতারা। তাঁদের দাবি, একটি নির্বাচিত সরকারকে চাপে ফেলা, দেশের গণতান্ত্রিক পরিবেশ অস্থিতিশীল করা এবং বিএনপির নেতৃত্বে শুরু হওয়া উন্নয়ন কার্যক্রম বাধাগ্রস্ত করাই এসব তৎপরতার উদ্দেশ্য।
তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপি সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকেই নানা চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হচ্ছে। বৈশ্বিক পরিস্থিতিও সরকারের জন্য বাড়তি চাপ তৈরি করেছে। ইরান যুদ্ধ ও মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনার প্রভাবে বিশ্বজুড়ে জ্বালানি তেলের সংকট ও মূল্যবৃদ্ধি ঘটেছে। এর প্রভাব পড়েছে বাংলাদেশের অর্থনীতিতেও। এ পরিস্থিতিতে জ্বালানি সরবরাহ স্বাভাবিক রাখা এবং অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড সচল রাখতে সরকারকে নানা পদক্ষেপ নিতে হচ্ছে।
এমন বৈশ্বিক সংকটের সময়ে দলমত নির্বিশেষে জাতীয় ঐক্য বজায় রাখা জরুরি। কিন্তু রাজনৈতিক বিরোধ ও বিভিন্ন কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে দেশে অস্থিরতা তৈরির আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। পোশাকশিল্পের শ্রমিক আন্দোলনও এ পরিস্থিতিকে জটিল করে তুলেছে।
গার্মেন্টসশিল্পে সাম্প্রতিক অস্থিরতার পেছনে বিভিন্ন রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক কারণ রয়েছে। সরকারের মন্ত্রী, উপদেষ্টা ও রাজনৈতিক নেতাদের বক্তব্যে অভিযোগ উঠেছে, ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের সাবেক মন্ত্রী-এমপি এবং দলটির সহযোগী সংগঠন ছাত্রলীগ ও শ্রমিক লীগের নেতাকর্মীরা শ্রমিক অসন্তোষকে উসকে দিয়ে দেশে অস্থিতিশীলতা তৈরির চেষ্টা করছেন। তাঁদের অভিযোগ, আসন্ন ডিসেম্বরকে সামনে রেখে একটি বিশেষ গোষ্ঠী নিরপরাধ শ্রমিকদের ব্যবহার করে সরকারকে চাপে ফেলতে চাইছে।
তবে শ্রমিক আন্দোলনের পেছনে প্রকৃত কারণ কী, তা নির্ধারণে শ্রমিকদের ন্যায্য দাবিদাওয়া, কর্মপরিবেশ ও সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর বক্তব্য বিবেচনায় নেওয়া জরুরি। একই সঙ্গে আন্দোলনে রাজনৈতিক ইন্ধন বা সহিংসতার অভিযোগ থাকলে তা নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও গোয়েন্দা সূত্রের বরাত দিয়ে বিভিন্ন প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, ভারতে অবস্থানরত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং আওয়ামী লীগের সাবেক মন্ত্রী-এমপি ও তাঁদের অনুসারীরা সাম্প্রতিক অস্থিরতায় ইন্ধন দিচ্ছেন। এসব অভিযোগে বলা হয়েছে, নিষিদ্ধ ঘোষিত আওয়ামী লীগ, শ্রমিক লীগ ও ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা ছদ্মবেশে মিরপুর, আশুলিয়া ও গাজীপুরের শ্রমিক আন্দোলনে যুক্ত হয়ে সহিংসতা, অগ্নিসংযোগ ও ভাঙচুরে উসকানি দিচ্ছেন। এসব অভিযোগের সত্যতা নিরপেক্ষভাবে যাচাই করা জরুরি।
এ ধরনের পরিস্থিতিতে দেশের রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে সমন্বয় ও ঐক্য প্রয়োজন। কিন্তু এরই মধ্যে সরকারের বিরুদ্ধে কর্মসূচি শুরু করেছে জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় ঐক্য। গণভোটের গণরায় বাস্তবায়ন, জুলাই গণহত্যার বিচার এবং বিদ্যুৎ, তেল, গ্যাস ও সার সংকট নিরসনসহ সাত দফা দাবিতে ঢাকা থেকে বিভিন্ন বিভাগীয় শহরের উদ্দেশে লং মার্চ কর্মসূচি পালন করছে জোটটি।
গত ৫ সেপ্টেম্বর ঢাকা-চট্টগ্রাম অভিমুখে প্রথম লং মার্চ কর্মসূচি শুরু হয়। এরপর ১৯ সেপ্টেম্বর রংপুর এবং সর্বশেষ ৩১ অক্টোবর ঢাকা-খুলনা-কুষ্টিয়া অভিমুখে তৃতীয় লং মার্চ অনুষ্ঠিত হয়। এসব কর্মসূচিতে বিরোধীদলীয় নেতা ও জামায়াতের আমির ডা. শফিকুর রহমানসহ শরিক দলগুলোর শীর্ষ নেতারা বক্তব্য দেন। তাঁদের বক্তব্যে সরকারের সমালোচনার পাশাপাশি সরকার পতন ও নতুন বিপ্লবের কথাও উঠে এসেছে। সামনে বরিশাল, রাজশাহী, সিলেট ও ময়মনসিংহ বিভাগেও একই কর্মসূচি পালনের পরিকল্পনা রয়েছে।
সরকারের আট মাসের মাথায় বিরোধী দলের এমন কর্মসূচির রাজনৈতিক লক্ষ্য ও প্রভাব নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। সংসদের বাইরে আন্দোলন ও প্রতিবাদ গণতান্ত্রিক রাজনীতির স্বাভাবিক অংশ। তবে এসব কর্মসূচি যেন সহিংসতা কিংবা অস্থিতিশীলতার দিকে না যায়, সে বিষয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর দায়িত্বশীল ভূমিকা প্রয়োজন। বিরোধী দলের কর্মসূচি ও সরকারের সমালোচনা গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার অংশ হলেও রাজনৈতিক উত্তেজনা বাড়লে তার সুযোগ নিতে পারে অগণতান্ত্রিক শক্তি।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের একাংশের মতে, রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে দূরত্ব ও সংঘাতের সুযোগ নিয়ে পলাতক রাজনৈতিক শক্তি দেশে বিশৃঙ্খলা তৈরির চেষ্টা করতে পারে। সাম্প্রতিক সময়ে রাজধানীর বিভিন্ন স্থানে ককটেল বিস্ফোরণ, বাসে অগ্নিসংযোগ ও অন্যান্য নাশকতার ঘটনা জনমনে উদ্বেগ তৈরি করেছে।
গত শনিবার রাজধানীর মিরপুর-১২ নম্বর এলাকায় একটি যাত্রীবাহী বাসে অগ্নিসংযোগের চেষ্টা করে দুর্বৃত্তরা। তবে বাসের কর্মী ও স্থানীয় লোকজন দ্রুত আগুন নিভিয়ে ফেলেন বলে জানিয়েছে পুলিশ। এর আগে শুক্রবার (৬ নভেম্বর) সন্ধ্যা থেকে গভীর রাত পর্যন্ত আদাবর, শাহবাগ, বিমানবন্দর, খিলগাঁও ও মিরপুরের কালশী এলাকায় অন্তত আটটি ককটেল বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে। একই সন্ধ্যায় রাজধানীর বারিধারা এলাকায় প্রগতি সরণিতে বৈশাখী পরিবহনের একটি যাত্রীবাহী বাসে আগুন দেয় দুর্বৃত্তরা।
এর আগের দিন রাজধানীর রায়েরবাজারে কৃষি মার্কেটের সামনে একটি কুরিয়ার সার্ভিসের কাভার্ড ভ্যানে বিস্ফোরণ ও অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। এতে গাড়িটির চালক আহত হন। এসব ঘটনায় রাজধানীতে আতঙ্ক ও নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। নাশকতার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনা জরুরি।
জুলাইয়ের গণ-আন্দোলনের মধ্য দিয়ে যে জাতীয় ঐক্য তৈরি হয়েছিল, তা ধরে রাখা এখন গুরুত্বপূর্ণ। রাজনৈতিক বিভাজন ও সংঘাত বাড়লে অস্থিতিশীলতা সৃষ্টির সুযোগ পেতে পারে পতিত স্বৈরাচারের অনুসারীরা—এমন আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যায় না। তাই দেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব ও গণতান্ত্রিক অগ্রযাত্রা রক্ষায় রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে দায়িত্বশীল আচরণ ও পারস্পরিক সহযোগিতা প্রয়োজন।
বহু ত্যাগের বিনিময়ে অর্জিত গণতন্ত্র ও নতুন বৈষম্যহীন বাংলাদেশ গড়ার স্বপ্ন রক্ষা করতে হলে নাশকতা ও ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে সবাইকে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে। একই সঙ্গে গণতান্ত্রিক অধিকার, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও রাজনৈতিক মতপার্থক্যের প্রতি সম্মান বজায় রাখতে হবে। জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবসে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ঐক্যের আহ্বানের মূল তাৎপর্যও এখানেই—দেশের স্বার্থে বিভেদ ভুলে সম্মিলিতভাবে কাজ করা।










Disqus comments are not configured yet.