পিডিবির নীরবতায় গুরুদয়াল মুক্তমঞ্চে অবাধে চলছে অবৈধ বিদ্যুৎ সংযোগ
কিশোরগঞ্জ পৌর শহরের নরসুন্দা লেকসিটির গুরুদয়াল মুক্তমঞ্চ ঘিরে গড়ে উঠেছে শতাধিক দোকানপাট ও রেস্তোরাঁ। এসব স্থাপনার কারণে মুক্তমঞ্চের হাঁটাচলা ও বসার জায়গা সংকুচিত হয়ে পড়েছে। দর্শনার্থীদের অভিযোগ, রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে এসব দোকানপাট গড়ে তোলা হয়েছে। এতে একদিকে যেমন সাধারণ মানুষের বিনোদন ও অবসর কাটানোর পরিবেশ ব্যাহত হচ্ছে, অন্যদিকে বর্জ্য ব্যবস্থাপনার অভাব, পরিবেশদূষণ এবং বখাটে ও কিশোর গ্যাংয়ের উপদ্রব নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। দীর্ঘদিন ধরে এ পরিস্থিতি চললেও উচ্ছেদের আশ্বাসের পরও জনদুর্ভোগের অবসান হচ্ছে না।
প্রতিদিন সকাল থেকে রাত পর্যন্ত নির্মল বাতাস ও নরসুন্দা নদীর সৌন্দর্য উপভোগ করতে মুক্তমঞ্চে ভিড় করেন বিভিন্ন বয়সের মানুষ। পরিবার-পরিজন নিয়ে অবসর কাটানো, বন্ধুদের সঙ্গে সময় কাটানো কিংবা খোলা পরিবেশে কিছুক্ষণ বসার জন্যও অনেকে এখানে আসেন। তবে সরেজমিনে দেখা গেছে, মুক্তমঞ্চের চারপাশে গড়ে ওঠা দোকানপাটের কারণে দর্শনার্থীদের চলাচলের জায়গা অনেকটাই সংকুচিত হয়েছে। বসার বেঞ্চ ও হাঁটার পথের কিছু অংশও দোকানপাটের দখলে চলে গেছে। ফলে খাবার বা পানীয় কেনার সুযোগ থাকলেও পরিবার নিয়ে স্বস্তিতে বসা কিংবা স্বাভাবিকভাবে ঘোরাফেরা করার পরিবেশ ব্যাহত হচ্ছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক ব্যবসায়ীর অভিযোগ, রাজনৈতিক পরিচয় ব্যবহার করে কতিপয় ব্যক্তি দোকানপ্রতি প্রতিদিন ২০০ থেকে ৩০০ টাকা করে চাঁদা আদায় করছেন। তাঁদের দাবি, দোকান পরিচালনার পাশাপাশি বিদ্যুৎ ব্যবহারের জন্যও অতিরিক্ত টাকা দিতে হচ্ছে। মিটার ছাড়াই বিদ্যুৎ সংযোগ দিয়ে বাল্বপ্রতি দৈনিক ২০ থেকে ৫০ টাকা এবং অন্যান্য বৈদ্যুতিক যন্ত্রপাতির জন্য অতিরিক্ত ১০০ থেকে ২০০ টাকা পর্যন্ত নেওয়া হচ্ছে বলে অভিযোগ করেন তাঁরা।
ব্যবসায়ীদের ভাষ্য, নতুন করে দোকান বসাতে এককালীন ২০ থেকে ৩০ হাজার টাকা অগ্রিম দিতে হয়। এসব অভিযোগ সত্য হলে দোকানপাট ঘিরে নিয়মিত অর্থ আদায় ও অবৈধ বাণিজ্যের একটি বড় পরিসর তৈরি হয়েছে। তবে এসব অর্থ কারা আদায় করছেন, তাঁদের পরিচয় এবং আদায়ের বিষয়টি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে স্বাধীনভাবে যাচাই করা প্রয়োজন।
মুক্তমঞ্চের বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন স্থানীয় বাসিন্দা ও দর্শনার্থীরা। স্থানীয় বাসিন্দা শরীফুল ইসলাম বলেন, “এখানে দর্শনার্থীর চেয়ে দোকানের সংখ্যা বেশি। হাঁটার কোনো উপায় নেই।”
শিক্ষক আকিব শিকদারের অভিযোগ, দোকানগুলোর বর্জ্য সরাসরি নরসুন্দা নদী ও কলেজ মাঠে ফেলা হচ্ছে। এতে পরিবেশ দূষিত হওয়ার পাশাপাশি পুরো এলাকাটি অস্বাস্থ্যকর হয়ে উঠছে। এ ছাড়া বখাটে ও কিশোর গ্যাংয়ের দৌরাত্ম্যে দর্শনার্থীরা প্রায়ই ছিনতাই ও হয়রানির শিকার হচ্ছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। ফলে পরিবার নিয়ে মুক্তমঞ্চে আসা মানুষের মধ্যে নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
দর্শনার্থীদের নিরাপত্তার বিষয়ে কিশোরগঞ্জ সদর মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ আবুল কালাম ভূঞা জানান, দর্শনার্থীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পুলিশের টহল জোরদার করা হয়েছে।
বিদ্যুৎ সংযোগের বিষয়ে পিডিবি কিশোরগঞ্জের নির্বাহী প্রকৌশলী মোহাম্মদ আব্দুর রউফ বলেন, মুক্তমঞ্চের দোকানগুলোতে দেওয়া বিদ্যুৎ সংযোগ বৈধ। তবে স্থাপনাগুলো অবৈধ প্রমাণিত হলে বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
জেলা পরিষদ প্রশাসক খালেদ সাইফুল্লাহ সোহেল খান বলেন, “অবৈধ বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করতে পিডিবির নির্বাহী প্রকৌশলীকে বলা হলেও কার্যকর কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। বিষয়টি জেলা সমন্বয় কমিটির মিটিংয়েও আলোচনা হয়েছে। বিদ্যুৎ অফিসের কোনো স্বার্থ আছে কি না, তা খতিয়ে দেখা দরকার।”
কিশোরগঞ্জ-১ আসনের সংসদ সদস্য মো. মাজহারুল ইসলাম বলেন, “দীর্ঘদিনের অনিয়মের কারণে এই সমস্যার সৃষ্টি হয়েছে। রাজনৈতিক নাম ভাঙিয়ে এসব অপকর্ম চলছে। মুক্তমঞ্চের বিশৃঙ্খলা রোধে দোকানপাট নিয়ন্ত্রণ ও সমাধানকল্পে আমরা কাজ করছি।”
কিশোরগঞ্জের জেলা প্রশাসক সোহানা নাসরিন জানিয়েছেন, গুরুদয়াল মুক্তমঞ্চে গড়ে ওঠা স্থাপনাগুলো সম্পূর্ণ অবৈধ। এর আগে এসব স্থাপনা উচ্ছেদ করা হয়েছিল। তবে নতুন করে উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনার আগে ব্যবসায়ীদের পুনর্বাসনের জন্য তালিকা প্রস্তুত করা হচ্ছে। অবৈধ বিদ্যুৎ সংযোগের বিষয়টিও বিদ্যুৎ বিভাগের সঙ্গে আলোচনা করে দ্রুত সমাধান করা হবে বলে জানান তিনি।
কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে উচ্ছেদ ও পুনর্বাসনের আশ্বাস দেওয়া হলেও মুক্তমঞ্চের স্বাভাবিক পরিবেশ ফিরিয়ে আনার কার্যকর উদ্যোগের অপেক্ষায় রয়েছেন দর্শনার্থীরা। তাঁদের প্রত্যাশা, জনসাধারণের বিনোদন ও অবসর কাটানোর এ স্থানটি দোকানপাটের দখলমুক্ত করে চলাচল, বসার জায়গা, পরিচ্ছন্নতা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হবে।













Disqus comments are not configured yet.