আগামীকাল শুরু এসএসসি, কিশোরগঞ্জে কালবৈশাখীর বিদ্যুৎ সংকটে দুশ্চিন্তায় পরীক্ষার্থীরা
“এসো হে বৈশাখ, এসো এসো”—এই আহ্বানে নতুন বছরকে বরণ করলেও ১৪৩৩ বঙ্গাব্দের শুরুতেই কিশোরগঞ্জবাসীর জীবনে নেমে এসেছে দুর্ভোগ। বিশেষ করে আসন্ন এসএসসি পরীক্ষাকে সামনে রেখে কালবৈশাখীর তাণ্ডবে বিদ্যুৎ বিপর্যয়ে পড়েছে জেলার হাজারো শিক্ষার্থী।
আগামীকাল মঙ্গলবার (২১ এপ্রিল) সারাদেশে শুরু হতে যাচ্ছে মাধ্যমিক স্কুল সার্টিফিকেট (এসএসসি) ও সমমানের পরীক্ষা। এর ঠিক আগে টানা ৩–৪ দিন ধরে বিদ্যুৎহীন অবস্থায় কিশোরগঞ্জের বিভিন্ন গ্রামীণ জনপদের মানুষ চরম ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন।
জানা গেছে, বাংলা নববর্ষের প্রথম রাতেই কিশোরগঞ্জ জেলার বিভিন্ন এলাকায় ভয়াবহ কালবৈশাখী ঝড় বয়ে যায়। এতে পল্লী বিদ্যুতের লাইনের ওপর গাছ পড়ে অসংখ্য স্থানে তার ছিঁড়ে যায়। কোথাও ভেঙে পড়ে বৈদ্যুতিক খুঁটি, কোথাও লাইনের ওপর পড়ে থাকে গাছগাছালি।
এর ফলে জেলার কিশোরগঞ্জ সদর, হোসেনপুর, পাকুন্দিয়া, কটিয়াদী, করিমগঞ্জ, তাড়াইল, নিকলী, বাজিতপুর, ইটনা, মিঠামইন ও অষ্টগ্রাম উপজেলার বিস্তীর্ণ এলাকা দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎবিচ্ছিন্ন থাকে।
প্রচণ্ড গরমের মধ্যে বিদ্যুৎ না থাকায় জনজীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। ফ্রিজে রাখা পচনশীল খাবার নষ্ট হয়ে যাচ্ছে, দেখা দিয়েছে তীব্র পানির সংকট। মোবাইল ফোনসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় ইলেকট্রনিক যন্ত্রপাতি চার্জের অভাবে অচল হয়ে পড়েছে।
স্থানীয়রা জানান, দিনের বেলা তীব্র গরমে ঘরে থাকা দায় হয়ে পড়েছে, আর রাতের অন্ধকারে বাড়ছে চুরি ও নিরাপত্তাহীনতার শঙ্কা।
সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়েছেন এসএসসি পরীক্ষার্থীরা। বিদ্যুৎ না থাকায় তাদের প্রস্তুতিতে মারাত্মক ব্যাঘাত ঘটছে।
সদর উপজেলার মহিনন্দ ইউনিয়নের বাসিন্দা বিল্লাল হোসেন বলেন, “আমাদের এলাকায় তিন দিন ধরে বিদ্যুৎ নেই। পানির সংকটও তীব্র। আমার ছোট বোন এসএসসি পরীক্ষার্থী—পড়াশোনার ক্ষতি হওয়ায় তাকে শহরে আত্মীয়ের বাসায় পাঠিয়েছি।”
হোসেনপুরের আল-আমীন বলেন, “আমার ছেলে এসএসসি পরীক্ষার্থী। বিদ্যুৎ না থাকায় পড়াশোনায় সমস্যা হচ্ছে। মোমবাতি বা হারিকেনে পড়া এখনকার ছেলেমেয়েদের জন্য খুব কষ্টকর।”
এসএসসি পরীক্ষার্থী মুকিম বলেন, “মোমবাতির আলোয় পড়তে খুব অসুবিধা হয়। সামনে পরীক্ষা—এভাবে প্রস্তুতি নেওয়া কঠিন।”
অন্য পরীক্ষার্থী সানজিদা জানায়, “ছোটবেলা থেকে কখনো হারিকেন দেখিনি। মোমবাতি দিয়ে পড়লে বাইরের বাতাসে আলো দুলে যায়, তাই বাবা হারিকেন নিয়ে আসছে। দীর্ঘ সময়ের জন্য বিদ্যুৎ চলে গেলে যখন আইপিএস লাইটের চার্জ শেষ হয়ে যায়, তখন তা ব্যবহার করি।”
অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (শিক্ষা ও আইসিটি) জেসমিন আক্তার জানান, “এ বছর জেলায় ৭৫টি কেন্দ্রে প্রায় ৩০ হাজার পরীক্ষার্থী এসএসসি ও সমমান পরীক্ষায় অংশ নেবে। প্রশাসনের পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় সব প্রস্তুতি সম্পন্ন করা হয়েছে।”
গাইটাল এলাকার বাসিন্দা হাবিবুর রহমান জানান, “আমার মেয়ে এসএসসি পরীক্ষার্থী। শনিবার আমি পিডিবির লাইন ব্যবহার করলেও পল্লী বিদ্যুতের মতো আমার বাসায় বিদ্যুৎ ছিল না। কিন্তু আমার পাশের মহল্লাতেই বিদ্যুৎ ছিল। ছেলে-মেয়েদের পড়াশোনা ও বাসার ভাড়াটিয়াসহ সবাই পানির কষ্টে ছিলাম।”
কিশোরগঞ্জ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মোহাম্মদ আবদুর রউফ বলেন, “কালবৈশাখী ঝড় ও বজ্রপাতের কারণে বিদ্যুৎ লাইনে ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। বিশেষ করে শনিবার যশোদল সাব-স্টেশনের ৩৩ কেভি ব্রেকার নষ্ট হওয়ায় অনেক এলাকা দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎবিচ্ছিন্ন ছিল।”
তিনি আরও বলেন, “এসএসসি পরীক্ষার্থীদের বিষয়টি আমরা গুরুত্ব দিচ্ছি। প্রকৃতির ওপর নিয়ন্ত্রণ না থাকলেও আমাদের সক্ষমতার মধ্যে সর্বোচ্চ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি।”
কিশোরগঞ্জ পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির জেনারেল ম্যানেজার (জিএম) মো. আতিকুজ্জামান চৌধুরী বলেন, “পহেলা বৈশাখের রাতে ঝড়ে লাইনের ওপর গাছ পড়ে তার ছিঁড়ে যাওয়ায় সমস্যা তৈরি হয়। পরবর্তী ঝড়েও কিছু ক্ষতি হয়েছে। দ্রুত সংস্কারকাজ চালিয়ে অধিকাংশ এলাকায় বিদ্যুৎ সরবরাহ স্বাভাবিক করা হয়েছে। নতুন করে ক্ষতি হলে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
তিনি আরও বলেন, “পরীক্ষার্থীরা আমাদেরই সন্তান। তাদের কথা বিবেচনায় রেখে সর্বোচ্চ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি।”
এসএসসি পরীক্ষার ঠিক আগে এমন বিদ্যুৎ সংকটে শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের মধ্যে উদ্বেগ বাড়ছে। দ্রুত বিদ্যুৎ পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হলে পরীক্ষার্থীদের প্রস্তুতিতে নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।













