‘সন্ত্রাসবাদের কোনো স্থান নেই বাংলাদেশে’—হলি আর্টিজান স্মরণে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী
ঢাকার গুলশানের হলি আর্টিজান বেকারিতে ভয়াবহ সন্ত্রাসী হামলার দশম বার্ষিকীতে নিহতদের গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করেছে বাংলাদেশ সরকার ও বাংলাদেশে কর্মরত বিভিন্ন দেশের কূটনৈতিক মিশন। এ উপলক্ষে আয়োজিত স্মরণানুষ্ঠানে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম সন্ত্রাসবাদ ও সহিংস উগ্রবাদের বিরুদ্ধে বাংলাদেশের ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি পুনর্ব্যক্ত করে বলেন, রাজনৈতিক, ধর্মীয়, আদর্শিক বা অন্য কোনো কারণেই সন্ত্রাসবাদকে কখনো ন্যায্যতা দেওয়া যায় না।
বুধবার (১ জুলাই) আয়োজিত স্মরণানুষ্ঠানে তিনি বলেন, “সন্ত্রাসবাদ ও সহিংস উগ্রবাদের বিরুদ্ধে সর্বক্ষেত্রে মোকাবিলায় আমাদের সরকার দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। এ ধরনের অপশক্তির বাংলাদেশে কোনো স্থান নেই। দেশের শান্তি, স্থিতিশীলতা ও সম্প্রীতি বিনষ্টের সুযোগ তাদের কখনো দেওয়া হবে না।”
পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী বলেন, হলি আর্টিজান হামলা ছিল মানবতা, সহনশীলতা ও সহাবস্থানের ওপর একটি নির্মম আঘাত। এটি ছিল একটি প্রাণবন্ত, অসাম্প্রদায়িক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজে ভয়, ঘৃণা ও বিভাজন সৃষ্টি করার সুপরিকল্পিত অপচেষ্টা। তবে সেই ভয়াবহ ঘটনার মধ্যেও বাংলাদেশ অসাধারণ দৃঢ়তা, ঐক্য ও সামাজিক সংহতির পরিচয় দিয়েছে।
তিনি বলেন, “দশ বছর পেরিয়ে গেলেও সেই রাতের ক্ষত এখনো আমাদের জাতীয় চেতনা থেকে মুছে যায়নি। ২০১৬ সালের ১ জুলাইয়ের সেই বিভীষিকাময় রাত আমাদের ইতিহাসের অন্যতম অন্ধকার অধ্যায় হয়ে আছে।”
শামা ওবায়েদ আরও বলেন, ওই হামলায় বাংলাদেশি নাগরিকদের পাশাপাশি ভারত, ইতালি, জাপান ও যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকদেরও নির্মমভাবে হত্যা করা হয়েছিল। আজ তাদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানিয়ে তিনি বলেন, “আমরা শুধু তাদের স্মৃতিকেই নয়, তাদের সাহস, মানবিক মূল্যবোধ ও সংহতিকেও সম্মান জানাই।”
তিনি নিহতদের পরিবারের প্রতি গভীর সমবেদনা জানিয়ে বলেন, “যারা প্রাণ হারিয়েছেন, তাদের স্মৃতি ঘৃণা ও সংঘাতের বিরুদ্ধে আলোকবর্তিকা হয়ে থাকুক। সহমর্মিতা, সহনশীলতা ও মানবতার যে মূল্যবোধ তারা ধারণ করেছিলেন, আমরা যেন তা সবসময় সমুন্নত রাখতে পারি।”
পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী জানান, সন্ত্রাসবাদ ও সহিংস উগ্রবাদ মোকাবিলায় বাংলাদেশ সরকার ‘সমগ্র সরকার’ (Whole of Government) এবং ‘সমগ্র সমাজ’ (Whole of Society) ভিত্তিক কৌশল বাস্তবায়ন করছে। এতে সরকারি প্রতিষ্ঠান, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, গোয়েন্দা সংস্থা, নাগরিক সমাজ, ধর্মীয় নেতা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, নারী, তরুণ, বেসরকারি খাত ও আন্তর্জাতিক অংশীদারদের সম্পৃক্ত করা হয়েছে।
তিনি বলেন, অপরাধীদের যথাযথ আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে বিচারের আওতায় এনে জবাবদিহি নিশ্চিত করা হয়েছে। একই সঙ্গে বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসবাদবিরোধী উদ্যোগেও সক্রিয় ভূমিকা রেখে বিশ্ব শান্তি, নিরাপত্তা ও টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করতে কাজ করে যাচ্ছে।
অনুষ্ঠানে বাংলাদেশ সরকারের পাশাপাশি ইতালি, জাপান, ভারত, যুক্তরাষ্ট্র ও ফিলিস্তিনের কূটনীতিকরা হলি আর্টিজান হামলায় নিহতদের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করেন।
বাংলাদেশে ইতালির রাষ্ট্রদূত আন্তোনিও আলেসান্দ্রো তাঁর বাসভবনে আয়োজিত স্মরণানুষ্ঠানে বলেন, “আমরা যেন এই মর্মান্তিক ঘটনাকে কখনো ভুলে না যাই। পৃথিবীর কোথাও যেন এমন ঘটনা আর না ঘটে।”
তিনি সব ধরনের সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সঙ্গে সমন্বিতভাবে কাজ করার বিষয়ে ইতালির অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেন এবং নিরাপদ, উন্মুক্ত ও মানবিক সমাজ গড়ে তুলতে বৈশ্বিক ঐক্যের ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
অনুষ্ঠানের শুরুতে বাংলাদেশে ইতালি দূতাবাসের কনস্যুলার শাখার প্রধান লরা স্কেলা নিহতদের নাম পাঠ করেন। পরে তাদের স্মরণে পুষ্পস্তবক অর্পণ ও এক মিনিট নীরবতা পালন করা হয়।
এ সময় বাংলাদেশে কূটনৈতিক কোরের ডিন ও ফিলিস্তিনের রাষ্ট্রদূত ইউসুফ এস. ওয়াই. রমাদান, ইতালির রাষ্ট্রদূত আন্তোনিও আলেসান্দ্রো, জাপানের রাষ্ট্রদূত শিনইচি সাইদা, ভারতের হাইকমিশনার, যুক্তরাষ্ট্র দূতাবাসের ভারপ্রাপ্ত উপপ্রধান এবং বাংলাদেশ পুলিশের একজন প্রতিনিধি শ্রদ্ধা নিবেদন করেন।
২০১৬ সালের ১ জুলাই ঢাকার গুলশান কূটনৈতিক এলাকায় অবস্থিত হলি আর্টিজান বেকারিতে সশস্ত্র জঙ্গিরা হামলা চালায়। প্রায় ১২ ঘণ্টাব্যাপী জিম্মি সংকটের ওই ঘটনায় ২০ জন জিম্মি, দুই পুলিশ কর্মকর্তা এবং হামলাকারী ছয় জঙ্গিসহ মোট ২৮ জন নিহত হন। নিহতদের মধ্যে ইতালির ৯ জন, জাপানের ৭ জন, ভারতের একজন এবং বাংলাদেশের নাগরিকরাও ছিলেন। ঘটনাটি বাংলাদেশের ইতিহাসে অন্যতম ভয়াবহ সন্ত্রাসী হামলা হিসেবে বিবেচিত হয়।













