বদলি ও পদায়নে লটারি পদ্ধতি: দুর্নীতি বন্ধের কার্যকর উদ্যোগ
বাংলাদেশে দুর্নীতির অন্যতম প্রধান কারণ সরকারি চাকরিতে নিয়োগ, বদলি ও পদায়ন বাণিজ্য। একটি সংঘবদ্ধ দালাল ও মধ্যস্বত্বভোগী চক্র সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের পদোন্নতি, বদলি ও পদায়নে তদবিরের মাধ্যমে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নেয়। সব সরকারের আমলেই এ চক্রের সদস্যরা প্রশাসনের অন্দরমহলে প্রভাব বিস্তার করে আসছেন।
ক্ষমতায় যে দলই থাকুক, দালাল চক্রের সদস্যরা নিজেদের পরিচয় ও অবস্থান বদলে ক্ষমতাসীনদের ঘনিষ্ঠ হয়ে ওঠেন। তাঁদের কারণে প্রশাসনে দুর্নীতি ছড়িয়ে পড়ে, আর বদনাম হয় সরকারের।
কোনো কর্মকর্তা ঘুষ দিয়ে কাঙ্ক্ষিত পদে নিয়োগ বা পদায়ন পেলে তাঁর প্রথম লক্ষ্য হয়ে ওঠে সেই টাকা তুলে আনা। ফলে নতুন দায়িত্বে যোগ দিয়েই জনগণের সেবা করার পরিবর্তে তিনি দুর্নীতিতে জড়িয়ে পড়েন। ঘুষ দিয়ে পদে বসার কারণে অনেক ক্ষেত্রে তাঁরা জবাবদিহি এড়িয়ে চলার চেষ্টা করেন। এভাবেই সরকারি দপ্তরগুলোতে দুর্নীতির বিস্তার ঘটে।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপি সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর দুর্নীতি দমনে কঠোর অবস্থান নিয়েছে। প্রধানমন্ত্রী দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি ঘোষণা করেছেন। দুর্নীতি প্রতিরোধে সরকার বিভিন্ন উদ্যোগও নিয়েছে। এর মধ্যে সরকারি দপ্তরে বদলি ও পদায়নে লটারি পদ্ধতি চালুর উদ্যোগ বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।
ইতিমধ্যে প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনায় কয়েকটি পদে লটারির মাধ্যমে বদলি পদ্ধতি চালু করা হয়েছে। সম্প্রতি দেশে প্রথমবারের মতো লটারির মাধ্যমে সাবরেজিস্ট্রারদের বদলি করা হয়েছে। আইন মন্ত্রণালয়ের এই উদ্যোগের লক্ষ্য ছিল বদলি প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা। সংশ্লিষ্টদের মতে, এ পদ্ধতি সাবরেজিস্ট্রার পদে বদলি ও পদায়ন ঘিরে দুর্নীতির সুযোগ কমাতে সহায়ক হতে পারে।
অতীতে ভূমি নিবন্ধন খাতে সাবরেজিস্ট্রার পদায়নকে কেন্দ্র করে ঘুষ লেনদেনের অভিযোগ ছিল ব্যাপক। জমি নিবন্ধনের সময় জনগণের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ থাকায় এ পদকে কেন্দ্র করে অবৈধ অর্থ আদায়ের সুযোগ তৈরি হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। এসব অর্থ বিভিন্ন পর্যায়ে বণ্টনের অভিযোগও রয়েছে। কিছু লাভজনক পদে পদায়নের জন্য রীতিমতো দরকষাকষি ও নিলামের মতো পরিস্থিতি তৈরি হতো বলে সংশ্লিষ্টদের দাবি।
গুলশান, গাজীপুর, রূপগঞ্জ ও কেরানীগঞ্জের মতো এলাকায় সাবরেজিস্ট্রার হিসেবে পদায়ন পেতে কয়েক কোটি টাকা লেনদেনের অভিযোগও রয়েছে। লটারির মাধ্যমে বদলি চালুর ফলে এ ধরনের অনিয়মের সুযোগ কমানোর একটি পথ তৈরি হয়েছে।
তবে সাবরেজিস্ট্রারদের বদলিতে লটারি পদ্ধতি চালু হলেও অন্যান্য সরকারি দপ্তরে বদলি ও পদায়ন বাণিজ্যের অভিযোগ এখনো রয়েছে। সরকারি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক থেকে শুরু করে চিকিৎসক, পুলিশ কর্মকর্তা ও বিভিন্ন দপ্তরের প্রকৌশলীদের পদায়নেও তদবির ও ঘুষ লেনদেনের অভিযোগ পাওয়া যায়।
সরকারি চাকরির বিভিন্ন পর্যায়ে পছন্দের কর্মস্থলে বদলি হতে মধ্যস্বত্বভোগীদের মাধ্যমে অর্থ লেনদেনের অভিযোগ দীর্ঘদিনের। কিছু লাভজনক পদে পদায়নের জন্য বিপুল অঙ্কের অর্থ দিতে হয় বলেও অভিযোগ রয়েছে। পদ ও কর্মস্থলভেদে এই অর্থের পরিমাণ কমবেশি হয়।
অনুসন্ধানে অন্তত ২৫টি পদে অর্থ লেনদেন ছাড়া বদলি হওয়া কঠিন বলে দাবি করা হয়েছে। তবে এসব অভিযোগের ব্যাপকতা ও বর্তমান পরিস্থিতি নির্ধারণে নির্ভরযোগ্য তথ্যের ভিত্তিতে পৃথক যাচাই প্রয়োজন।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর মধ্যেও পদায়ন বাণিজ্যের অভিযোগ রয়েছে। বিশেষ করে থানাকেন্দ্রিক দুর্নীতির অভিযোগ দীর্ঘদিনের। অতীতে গুলশান, বনানী ও ধানমন্ডির মতো অভিজাত এলাকার থানায় ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) হিসেবে পদায়ন পেতে ১০ থেকে ১৫ কোটি টাকা ব্যয়ের অভিযোগ উঠেছিল। সংশ্লিষ্টদের দাবি, এখনো পরিস্থিতির উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন হয়নি। এমনকি এসব থানায় কনস্টেবল পদে যোগ দিতেও অর্থ লেনদেনের অভিযোগ রয়েছে।
একজন পুলিশ সদস্য ঘুষ দিয়ে কোনো পদে দায়িত্ব পেলে তাঁর পক্ষে সততা বজায় রাখা কতটা সম্ভব—সে প্রশ্নও সামনে এসেছে।
নিম্ন আদালতের বিচারকদের পদায়ন নিয়েও অতীতে অর্থ লেনদেনের অভিযোগ উঠেছে। বিশেষ করে ঢাকা ও আশপাশের এলাকায় পদায়ন পেতে বেশি অর্থ দিতে হয় বলে অভিযোগ রয়েছে।
আগের অন্তর্বর্তী সরকারের সময় সচিব পর্যায়ে পদায়ন ও পদোন্নতি, জেলা প্রশাসক (ডিসি) নিয়োগ এবং জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের বিভিন্ন সিদ্ধান্ত নিয়ে অনিয়মের অভিযোগ সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছিল। রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংক ও বিমা প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনা পরিচালক নিয়োগেও মধ্যস্বত্বভোগীদের তৎপরতা এবং অর্থ লেনদেনের অভিযোগ রয়েছে।
বন বিভাগ, গণপূর্ত অধিদপ্তর, সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তর এবং স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরেও লাভজনক পদে বদলি ও পদায়ন নিয়ে অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে। এসব দপ্তরে উচ্চপর্যায়ের কিছু পদে বিপুল অঙ্কের অর্থ লেনদেনের অভিযোগও বিভিন্ন সময়ে সামনে এসেছে।
চিকিৎসকদের বদলি ও পদায়নেও একই ধরনের সমস্যা রয়েছে বলে অভিযোগ করা হয়। ঢাকায় বদলি হতে অর্থ লেনদেনের অভিযোগের পাশাপাশি জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে চিকিৎসকসংকটের বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ। আগের অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে বিপুলসংখ্যক চিকিৎসক ও কর্মচারীর বদলি এবং পদায়ন নিয়ে আলোচনা-সমালোচনা হয়েছে। বদলির পর অনেক চিকিৎসক নতুন কর্মস্থলে যোগ না দিয়ে তদবিরের মাধ্যমে ঢাকায় বা আশপাশের এলাকায় থাকার চেষ্টা করেছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। এর ফলে প্রত্যন্ত অঞ্চলে স্বাস্থ্যসেবা ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
বদলি ও পদায়ন বাণিজ্যের কারণে একদিকে দুর্নীতির সুযোগ তৈরি হয়, অন্যদিকে জনগণ সরকারি সেবা থেকে বঞ্চিত হন। এ পরিস্থিতি পরিবর্তনে সাবরেজিস্ট্রারদের বদলিতে লটারি পদ্ধতি চালুর উদ্যোগকে ইতিবাচক পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে। তবে এ পদ্ধতি দুর্নীতি কতটা কমিয়েছে, তা নির্ধারণে স্বচ্ছ তথ্য ও পরিসংখ্যানের ভিত্তিতে মূল্যায়ন প্রয়োজন।
লটারির মাধ্যমে বদলি ও পদায়নের এই পদ্ধতি অন্যান্য মন্ত্রণালয় ও সরকারি প্রতিষ্ঠানে সম্প্রসারণ করা যেতে পারে। ইতিমধ্যে গণপূর্ত অধিদপ্তরের নির্বাহী প্রকৌশলীদের বদলি ও পদায়নে লটারি পদ্ধতি চালুর কথা জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়। বদলি বাণিজ্য বন্ধ, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত এবং যোগ্য ব্যক্তিকে উপযুক্ত স্থানে পদায়ন করাই এ উদ্যোগের লক্ষ্য।
রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংক ও বিমা প্রতিষ্ঠানের প্রধান নির্বাহী নিয়োগের ক্ষেত্রেও প্রথমে যোগ্য প্রার্থীদের যাচাই করে একটি তালিকা তৈরি করা যেতে পারে। এরপর নির্দিষ্ট যোগ্যতার ভিত্তিতে নির্বাচিত প্রার্থীদের মধ্য থেকে লটারির মাধ্যমে পদায়নের ব্যবস্থা করা হলে স্বচ্ছতা বাড়তে পারে। তবে এ ক্ষেত্রে পেশাগত দক্ষতা, অভিজ্ঞতা ও প্রতিষ্ঠানের প্রয়োজনীয়তা নিশ্চিত করা জরুরি।
একইভাবে জেলা প্রশাসক, থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা এবং চিকিৎসকদের বদলি ও পদায়নের ক্ষেত্রেও উপযুক্ত যোগ্যতার তালিকা তৈরি করে লটারি পদ্ধতি বিবেচনা করা যেতে পারে। এতে রাজনৈতিক বা ব্যক্তিগত তদবিরের প্রভাব কমানোর সুযোগ তৈরি হবে। তবে সব পদে একই পদ্ধতি প্রয়োগের আগে সংশ্লিষ্ট দায়িত্বের ধরন, বিশেষায়িত দক্ষতা ও প্রশাসনিক প্রয়োজন বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন।
সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীরা ঘুষ ছাড়াই যোগ্যতা ও স্বচ্ছ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে পদায়ন পেলে তাঁদের ওপর অবৈধ অর্থ আদায়ের চাপ কমতে পারে। একই সঙ্গে নিয়মিত তদারকি, অভিযোগ তদন্ত এবং অনিয়মের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা থাকলে জবাবদিহি নিশ্চিত করা সহজ হবে।
তবে শুধু লটারি পদ্ধতি চালু করলেই বদলি ও পদায়ন বাণিজ্য পুরোপুরি বন্ধ হবে—এমন নিশ্চয়তা নেই। লটারির প্রক্রিয়া স্বচ্ছ রাখা, যোগ্যতার মানদণ্ড প্রকাশ করা, ফলাফল যাচাইয়ের সুযোগ রাখা এবং অনিয়মের অভিযোগ তদন্তের ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে।
সরকারের সেবামূলক প্রতিষ্ঠানগুলোতে ধাপে ধাপে এ পদ্ধতি চালুর পাশাপাশি নিয়োগ, পদোন্নতি ও পদায়নের প্রতিটি পর্যায়ে স্বচ্ছতা প্রতিষ্ঠা করা প্রয়োজন। দুর্নীতির উৎস বন্ধ করতে পারলে সরকারি প্রতিষ্ঠানে জনগণের আস্থা বাড়বে এবং সেবার মান উন্নত হওয়ার সুযোগ তৈরি হবে।
দুর্নীতির বিরুদ্ধে সরকারের ঘোষিত অবস্থান কার্যকর করতে বদলি ও পদায়নে লটারি পদ্ধতি একটি সম্ভাবনাময় হাতিয়ার হতে পারে। তবে এর সাফল্য নির্ভর করবে স্বচ্ছ বাস্তবায়ন, যোগ্যতার সুরক্ষা এবং জবাবদিহি নিশ্চিত করার ওপর।













Disqus comments are not configured yet.