পশ্চিম তীরে ইসরায়েলি অভিযান, উচ্ছেদ আতঙ্কে ফিলিস্তিনিরা
দখলকৃত পশ্চিম তীরের একটি চেকপয়েন্টে দুই ফিলিস্তিনি বন্দুকধারীর হামলায় দুই ইসরায়েলি সেনা নিহত হওয়ার পর হেবরন এলাকার একটি আবাসিক এলাকায় অভিযান শুরু করেছে ইসরায়েলি বাহিনী। সেখানে ভবন ধ্বংসের পাশাপাশি বাসিন্দাদের জোরপূর্বক সরিয়ে নেওয়া হচ্ছে।
শুক্রবার (২৩ অক্টোবর) ইসরায়েলি সেনা নিহত হওয়ার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই এ অভিযান শুরু হয়।
২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের নেতৃত্বাধীন হামলার পর প্রথমবারের মতো ইসরায়েলে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। আগামী ২৭ অক্টোবরের ভোটের আগে এ হামলার ঘটনা প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দেখা দিয়েছে। নিরাপত্তা নিশ্চিত করার বিষয়ে কঠোর অবস্থানের কথা বলে আসছেন তিনি।
হামলার পর ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনী (আইডিএফ) জানায়, তারা হেবরন শহরকে সম্পূর্ণ অবরুদ্ধ করছে। নেতানিয়াহু শুক্রবার থেকে পুরো পশ্চিম তীর বন্ধ করে দেওয়ার নির্দেশও দিয়েছিলেন। তবে কয়েক ঘণ্টা পর তিনি অবস্থান কিছুটা পরিবর্তন করে হেবরন ও হালহুল শহরের চারপাশে নিরাপত্তাবেষ্টনী তৈরির কথা জানান, যা প্রয়োজনে অন্য এলাকাতেও সম্প্রসারণ করা হতে পারে।
নেতানিয়াহু আরও বলেন, হামলার এলাকা থেকে বাসিন্দাদের সরিয়ে নেওয়া হবে এবং এলাকাটির চেহারা পুরোপুরি বদলে দেওয়া হবে। ২০২৫ সালের শুরুতে জেনিন, তুলকারেম, নুর শামস ও আল-ফারআ শরণার্থীশিবিরে একই ধরনের অভিযান চালানো হয়েছিল। এতে হাজার হাজার ফিলিস্তিনি বাস্তুচ্যুত হন এবং বিস্তীর্ণ এলাকা জনশূন্য হয়ে পড়ে।
ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী ও ইসরায়েলি নিরাপত্তা সংস্থা (আইএসএ) এক যৌথ বিবৃতিতে জানিয়েছে, হেবরন এলাকায় কয়েক দিনব্যাপী সন্ত্রাসবিরোধী অভিযান শুরু হয়েছে। বিবৃতিতে বলা হয়, সন্দেহভাজনদের জিজ্ঞাসাবাদ, অস্ত্র ও সন্ত্রাসী অবকাঠামো শনাক্ত এবং সেগুলো ধ্বংস করতে পুরো এলাকায় তল্লাশি চালানো হচ্ছে। অভিযানটি মূলত হামলাকারীদের কার্যক্রম পরিচালনার এলাকার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে বলে দাবি করেছে কর্তৃপক্ষ।
আইডিএফ ও আইএসএ জানিয়েছে, এলাকার বাসিন্দারা তিনটি নির্ধারিত পথ দিয়ে বের হতে পারবেন। এ সময় তাঁদের জিজ্ঞাসাবাদ ও নিরাপত্তা তল্লাশির মুখোমুখি হতে হবে। সন্দেহজনক আচরণ বা পরিচয় পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের আরও জিজ্ঞাসাবাদের জন্য নিরাপত্তা বাহিনীর কাছে হস্তান্তর করা হবে।
যৌথ বিবৃতিতে আরও বলা হয়, অভিযানের অংশ হিসেবে সন্দেহভাজনদের বাড়ির মানচিত্র তৈরি, হেবরন ও হালহুলে নিরাপত্তাবেষ্টনী আরোপ, সড়কে প্রতিবন্ধক স্থাপন এবং বিভিন্ন এলাকায় তল্লাশি চালানো হচ্ছে। নিরাপত্তার জন্য হুমকি হিসেবে বিবেচিত স্থাপনাগুলোও ভেঙে ফেলা হচ্ছে।
ফিলিস্তিনিদের জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত করার পরিকল্পনার নিন্দা জানিয়েছে ইসরায়েলি মানবাধিকার সংস্থা ‘বিতসেলেম’। সংস্থাটির নির্বাহী পরিচালক ইউলি নোভাক বলেন, হেবরনের একটি ফিলিস্তিনি আবাসিক এলাকা খালি করা এবং পশ্চিম তীরের উত্তরাঞ্চলের শরণার্থীশিবিরগুলোতে চালানো গণ-বাস্তুচ্যুতি ও ধ্বংসযজ্ঞের পুনরাবৃত্তির ইচ্ছা প্রকাশ করেছেন নেতানিয়াহু ও ইসরায়েলের প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরায়েল কাটজ।
শুক্রবার বিকেলেই হেবরনের ফারশ আল-হাওয়া এলাকায় ভবন ধ্বংসের কাজ শুরু করে ইসরায়েলি বাহিনী। সিএনএনের পাওয়া একটি ভিডিওতে দেখা যায়, এক ইসরায়েলি সেনা আবাসন কমপ্লেক্সের বাসিন্দাদের বলছেন, তাঁদের সরে যাওয়ার জন্য পাঁচ মিনিট সময় দেওয়া হয়েছে।
নেতানিয়াহু বলেন, হেবরনের যে এলাকা থেকে হামলাকারীরা এসেছিল, সেখানে বাসিন্দাদের সরিয়ে বাড়ি বাড়ি তল্লাশি চালানো হবে। সেখানে পাওয়া অস্ত্র সরিয়ে নেওয়া এবং সন্ত্রাসী অবকাঠামো শনাক্ত করে ধ্বংস করা হবে।
এদিকে, হামলার সঙ্গে জড়িত অন্যদের খুঁজতে এলাকায় তল্লাশি অব্যাহত রেখেছে ইসরায়েলি বাহিনী। আইডিএফ জানিয়েছে, শুক্রবার সকালে দুই বন্দুকধারীকে গুলি করে হত্যা করা হয়েছে। ঘটনাস্থলের ভিডিওতে ফিলিস্তিনি বন্দুকধারী ও ইসরায়েলি বাহিনীর মধ্যে কয়েক মিনিট ধরে তীব্র গোলাগুলির দৃশ্য দেখা গেছে। রয়টার্সের একটি ভিডিওতে এক ইসরায়েলি উদ্ধারকর্মীকে বলতে শোনা যায়, গোলাগুলি অন্তত ২০ মিনিট ধরে চলেছিল এবং আহতদের সরিয়ে নিতে উদ্ধারকারীদের বেগ পেতে হচ্ছিল।
আইডিএফ আরও জানায়, হামলাকারীদের ব্যবহৃত একটি গাড়ি উদ্ধার করা হয়েছে, যাতে বিপুল পরিমাণ গোলাবারুদ ছিল। পরিস্থিতি পর্যালোচনার পর আইডিএফ প্রধান লেফটেন্যান্ট জেনারেল ইয়াল জামির ঘটনাটিকে ভয়াবহ সন্ত্রাসী হামলা হিসেবে বর্ণনা করেন। তাঁর দাবি, সেনাদের দ্রুত পদক্ষেপে আরও বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতি এড়ানো সম্ভব হয়েছে। গাড়িতে থাকা গোলাবারুদ আরও বড় পরিসরে হামলা চালানোর উদ্দেশ্যে রাখা হয়েছিল বলেও তিনি জানান।
জামির বলেন, সন্দেহভাজনদের গ্রেপ্তারে অভিযান বাড়ানো এবং এলাকায় গোয়েন্দা তৎপরতা জোরদার করা হবে। নেতানিয়াহুও এক বিবৃতিতে হামলার জন্য দায়ীদের খুঁজে বের করার অঙ্গীকার করেন। তবে হামাস হামলার প্রশংসা করে বিবৃতি দিলেও এর দায় স্বীকার করেনি।













Disqus comments are not configured yet.