চৌগাছার ধানে আর্সেনিকের শঙ্কা, নিরাপদ চাষে নতুন পদ্ধতি
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) নির্দেশনা অনুযায়ী, পানিতে আর্সেনিকের সর্বোচ্চ গ্রহণযোগ্য মাত্রা প্রতি লিটারে ০.০১ মিলিগ্রাম। বাংলাদেশে সরকারি মানদণ্ডে এ মাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ০.০৫ মিলিগ্রাম। তবে যশোরের চৌগাছা উপজেলায় পানিতে আর্সেনিকের উপস্থিতি উদ্বেগজনক বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। এ ছাড়া এখানকার ধানেও সহনীয় মাত্রার চেয়ে বেশি আর্সেনিকের উপস্থিতি পাওয়া গেছে।
এ পরিস্থিতি মোকাবেলায় কাজ করছে জাপানের জাইকা ও জাপান সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি এজেন্সি (জেএসটি)। সংস্থা দুটির কারিগরি ও আর্থিক সহায়তায় বেসরকারি সংস্থা এশিয়া আর্সেনিক নেটওয়ার্ক সেচ পদ্ধতি নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে নিরাপদ ধান উৎপাদনে কার্যক্রম পরিচালনা করছে।
আন্তর্জাতিক সংস্থা কোডেক্স অ্যালিমেন্টারিয়াস কমিশনের (সিএসি) নির্ধারিত মান অনুযায়ী, চালে অজৈব আর্সেনিকের সর্বোচ্চ গ্রহণযোগ্য মাত্রা প্রতি কেজিতে ০.৩৫ মিলিগ্রাম। তবে চৌগাছা উপজেলার ধানে এর চেয়ে বেশি আর্সেনিকের উপস্থিতি পাওয়া যাচ্ছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। এ ক্ষেত্রে ধানে আর্সেনিকের উপস্থিতি ৫৬ থেকে ৭০ শতাংশ পর্যন্ত বেশি বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
এশিয়া আর্সেনিক নেটওয়ার্ক সূত্রে জানা গেছে, ধান ও ভাতে আর্সেনিকের উপস্থিতি সহনীয় পর্যায়ে রাখতে সেচ নিয়ন্ত্রণের বিকল্প নেই। এ জন্য কৃষকদের থ্রিএফফোরডি (তিন দিন জমি ভেজানো, চার দিন জমি শুকানো) পদ্ধতি ব্যবহারে সচেতন করা হচ্ছে।
বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় (বাকৃবি) উদ্ভাবিত এ পদ্ধতি ‘নিরাপদ ও পুষ্টিকর ধান’ (সানরাইজ) প্রকল্পের অধীনে তৈরি করা হয়েছে। জাইকা ও জেএসটির কারিগরি ও আর্থিক সহযোগিতায় প্রকল্পটির মাধ্যমে চৌগাছায় আর্সেনিক সহনীয় মাত্রায় রেখে নিরাপদ ধান উৎপাদনে কাজ করছে এশিয়া আর্সেনিক নেটওয়ার্ক।
উপজেলার ১১টি ইউনিয়ন ও পৌরসভার বিভিন্ন গ্রামে ১২টি মডেল প্লট তৈরি করা হয়েছে। পৌরসভার হুদোপাড়া, চৌগাছা ইউনিয়নের কয়ারপাড়া, সিংহঝুলী ইউনিয়নের মাজালি, ফুলসারা ইউনিয়নের আড়ারদহ, জগদীশপুর ইউনিয়নের মাড়ুয়া, পাতিবিলা ইউনিয়নের সাদিপুর, হাকিমপুর ইউনিয়নের বকশিপুর, নারায়ণপুর ইউনিয়নের নারায়ণপুর, স্বরূপদাহ ইউনিয়নের স্বরূপদাহ, সুখপুকুরিয়া ইউনিয়নের মাকাপুর, ধুলিয়ানী ইউনিয়নের কুষ্টিয়া ও পাশাপোল ইউনিয়নের রঘুনাথপুর গ্রামের মাঠে এসব প্লট প্রস্তুত করা হয়েছে। এ কার্যক্রমে যুক্ত রয়েছেন ১৪৪ জন কৃষক।
এ ছাড়া প্রতিটি ইউনিয়ন ও পৌরসভায় সেচপাম্পের ৬০ জন মালিকের মাধ্যমে আগামী ইরি-বোরো মৌসুমে নিজ উদ্যোগে থ্রিএফফোরডি পদ্ধতি ব্যবহারের পরিকল্পনা রয়েছে। এরই মধ্যে তাঁদের সচেতন করতে সভা, সেমিনার ও প্রশিক্ষণের আয়োজন করা হয়েছে।
সংস্থাটির উপজেলা সমন্বয়কারী আমিরুল ইসলাম বলেন, ‘আমাদের নিরাপদ ও পুষ্টিকর চাল দিয়ে ভাত খেতে হবে। এ কারণে আর্সেনিকমুক্ত বা সহনীয় মাত্রার আর্সেনিকযুক্ত ধান উৎপাদন করা জরুরি।’
তিনি বলেন, দুটি পদ্ধতির মাধ্যমে তাঁরা কাজ করছেন। তবে মূল বিষয় হলো ধানের জমিতে পানির ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ করা। এ জন্য কৃষকদের আধুনিক কৃষিপদ্ধতি ও থ্রিএফফোরডি পদ্ধতি ব্যবহারে উৎসাহিত করা হচ্ছে। এ পদ্ধতিতে ২০ শতাংশ পানি সাশ্রয় হওয়ার পাশাপাশি ৮ শতাংশ বেশি ফলন পাওয়া সম্ভব বলে জানান তিনি।
সংস্থাটির পক্ষ থেকে আরও বলা হয়, ইরি-বোরো মৌসুমে সাধারণত ভূগর্ভস্থ পানি তুলে সেচ দেওয়া হয়। ভূগর্ভস্থ পানির স্তর কমে গেলে আর্সেনিকের ঘনত্ব বেড়ে যাওয়ার ঝুঁকি থাকে। ফলে ধানে আর্সেনিকের পরিমাণও বাড়তে পারে।
থ্রিএফফোরডি পদ্ধতিতে প্রচলিত নিয়মে জমি সব সময় জলাবদ্ধ না রেখে তিন দিন পানি ধরে রাখা হয় এবং পরবর্তী চার দিন জমি শুকানো হয়। এতে মাটিতে অক্সিডেটিভ পরিবেশ তৈরি হয়, যা ধানের চারার আর্সেনিক শোষণ কমাতে সহায়তা করে। একই সঙ্গে চালে অজৈব আর্সেনিকের মাত্রাও উল্লেখযোগ্যভাবে কমে।
আড়ারদহ গ্রামের কৃষক ইমদাদুল হক ও মাজালি গ্রামের কৃষক হাফিজুর রহমান তপন জানান, ধানে আর্সেনিক থাকতে পারে, আগে তাঁদের এ বিষয়ে ধারণা ছিল না। আগে যেভাবে ধানের জমিতে পানি দিতেন, এখন আর সেভাবে দেন না। থ্রিএফফোরডি পদ্ধতি ব্যবহার করে তাঁরা ভালো ফল পাচ্ছেন।
উপজেলা জনস্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সহকারী প্রকৌশলী ফেরদৌসী খাতুন বলেন, ধান বা চালে আর্সেনিক নিয়ন্ত্রণে সরকারি কোনো উদ্যোগ নেই। তবে পানিতে আর্সেনিক নিয়ন্ত্রণে সরকারি কার্যক্রম রয়েছে। বর্তমানে উপজেলার ১১টি ইউনিয়নে ৯০টি অগভীর নলকূপ স্থাপন করা হয়েছে। এসব নলকূপ থেকে পানি সংগ্রহ করে আঞ্চলিক পানি পরীক্ষাগারে পাঠানো হচ্ছে। যেসব নলকূপের পানিতে আর্সেনিকের মাত্রা বেশি পাওয়া যাচ্ছে, সেসব এলাকায় পানি পরিশোধনের ভ্যাসেল দেওয়া হচ্ছে।
তিনি বলেন, চৌগাছা উপজেলায় আর্সেনিকের আধিক্য রয়েছে। আগের এক প্রতিবেদনে পানিতে গড়ে প্রতি লিটারে ২০ মিলিগ্রাম আর্সেনিকের উপস্থিতি পাওয়া গিয়েছিল বলে উল্লেখ করা হয়।
উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. আহসানুল মিজান রুমী বলেন, আর্সেনিক আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা সম্পর্কে হালনাগাদ তথ্য নেই। তবে আগের বিভিন্ন জরিপে উপজেলায় প্রায় ১ হাজার ৫০০ রোগী থাকার তথ্য পাওয়া গেছে। উপজেলা হাসপাতালে এখনো আর্সেনিক আক্রান্ত রোগীরা চিকিৎসা নিতে আসছেন। তাঁদের নিয়মিত চিকিৎসা দেওয়া হয়।
তিনি বলেন, ‘প্রাথমিক পর্যায়ে এ রোগ শনাক্ত হলে চিকিৎসার পাশাপাশি আর্সেনিকমুক্ত পানি পান করলে সুস্থ হওয়া সম্ভব। এ রোগ অবহেলা করা উচিত নয়।’
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ফারজানা ইসলাম বলেন, ধানে আর্সেনিকের বিষয়ে একটি সংস্থা কাজ করছে বলে তিনি জেনেছেন। তবে এ বিষয়ে সরকারি পর্যায়ে এখনো কোনো উদ্যোগ শুরু হয়নি। পানিতে আর্সেনিক নিয়ন্ত্রণে অগভীর নলকূপ স্থাপন করা হচ্ছে। কোনো নলকূপের পানিতে আর্সেনিক পাওয়া গেলে তা পরিশোধনের জন্য সরকারিভাবে ভ্যাসেল দেওয়া হচ্ছে।
ইউএনও আরও বলেন, চৌগাছা অঞ্চলে আর্সেনিক সমস্যা দীর্ঘদিনের। স্থানীয়ভাবে ব্যবহৃত অনেক নলকূপের পানি এখন আর নিরাপদ নয়। তাই পানি ব্যবহারের ক্ষেত্রে সবাইকে সতর্ক থাকতে হবে।










Disqus comments are not configured yet.