অতীতের সব রেকর্ড ভেঙে পাগলা মসজিদের দানসিন্দুকে ১৫ কোটি ৯০ লাখ টাকা
দীর্ঘ ছয় মাস পর কিশোরগঞ্জের ঐতিহাসিক পাগলা মসজিদের ১৩টি দানসিন্দুক খুলে এবার অতীতের সব রেকর্ড ভেঙেছে দানের পরিমাণ। গণনা শেষে পাওয়া গেছে ১৫ কোটি ৯০ লাখ ৮০ হাজার ১৪৬ টাকা, যা পাগলা মসজিদের ইতিহাসে একদিনে দানসিন্দুক থেকে প্রাপ্ত সর্বোচ্চ নগদ অর্থ। নগদ টাকার পাশাপাশি উদ্ধার হয়েছে স্বর্ণালংকার, রৌপ্য, বিভিন্ন দেশের বৈদেশিক মুদ্রা এবং অন্যান্য মূল্যবান সামগ্রী।
শনিবার (২৭ জুন) সকাল ৭টায় জেলা প্রশাসক ও পাগলা মসজিদ পরিচালনা কমিটির সভাপতি সোহানা নাসরিন-এর নেতৃত্বে প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা, পুলিশ, র্যাব, আনসার, ফায়ার সার্ভিস, মসজিদ পরিচালনা কমিটি এবং গণমাধ্যমকর্মীদের উপস্থিতিতে দানসিন্দুক খোলার কার্যক্রম শুরু হয়।
সিন্দুক খোলার পর প্রথমে ৪৩ বস্তা নগদ টাকা পাওয়া যায়। পরে মসজিদের মেঝেতে টাকা ঢেলে দীর্ঘ সময় ধরে গণনা শেষে মোট ১৫ কোটি ৯০ লাখ ৮০ হাজার ১৪৬ টাকা পাওয়া যায়। সংশ্লিষ্টদের মতে, ছয় মাস ধরে জমা হওয়া দানের কারণেই এবার অতীতের সব রেকর্ড অতিক্রম করেছে পাগলা মসজিদ।
এর আগে সর্বশেষ ২০২৫ সালের ২৭ ডিসেম্বর, অর্থাৎ ৩ মাস ২৭ দিন পর দানসিন্দুক খোলা হয়েছিল। তখন ১৩টি দানসিন্দুক থেকে ৩৫ বস্তা টাকা উদ্ধার হয়। গণনা শেষে পাওয়া যায় ১১ কোটি ৭৮ লাখ ৪৮ হাজার ৫৩৮ টাকা। পাশাপাশি উদ্ধার হয়েছিল উল্লেখযোগ্য পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা, স্বর্ণালংকার ও অন্যান্য মূল্যবান সামগ্রী।
সেই রেকর্ড এবার প্রায় ৪ কোটি ১২ লাখ টাকারও বেশি ব্যবধানে ছাড়িয়ে গেল।
দানসিন্দুক খোলা ও টাকা গণনার পুরো কার্যক্রমকে ঘিরে ছিল কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা।
গণনায় অংশ নেন পাগলা মসজিদ পরিচালনা কমিটির সদস্য, পাগলা মসজিদ কমপ্লেক্সের মাদ্রাসা ও এতিমখানার শিক্ষক-শিক্ষার্থী, পার্শ্ববর্তী জামিয়া ইমদাদিয়া মাদ্রাসার শিক্ষার্থী, রূপালী ব্যাংকের কর্মকর্তা-কর্মচারীসহ প্রায় পাঁচ শতাধিক ব্যক্তি।
নিরাপত্তার দায়িত্বে ছিলেন ১৩ জন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট, ৪০ জন পুলিশ সদস্য, ৮ জন র্যাব সদস্য এবং ২০ জন আনসার সদস্য।
এ সময় উপস্থিত ছিলেন অতিরিক্ত পুলিশ সুপার নাজমুস সাকিব খান, অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট ও দানসিন্দুক খোলা কমিটির আহ্বায়ক মো. এরশাদুল আহমেদসহ প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা।
জেলা প্রশাসক সোহানা নাসরিন জানান, পাগলা মসজিদ ও ইসলামিক কমপ্লেক্সে বর্তমানে ১০টি স্থায়ী দানসিন্দুক এবং ৩টি অস্থায়ী ট্রাংক দানবাক্স হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে।
তিনি বলেন, গণনা শেষে প্রাপ্ত নগদ অর্থ রূপালী ব্যাংকে পাগলা মসজিদের হিসাবে জমা করা হবে। উদ্ধার হওয়া স্বর্ণ, রৌপ্য ও বৈদেশিক মুদ্রা যথাযথ প্রক্রিয়ায় সিলগালা করে জেলা ট্রেজারিতে সংরক্ষণ করা হবে।
জেলা প্রশাসক জানান, বর্তমানে পাগলা মসজিদের তহবিলে ১১৪ কোটি ১৩ লাখ ৭ হাজার ৩৫২ টাকা জমা রয়েছে।
এছাড়া অনলাইনে দান গ্রহণের জন্য www.paglamosque.org ওয়েবসাইট চালু রয়েছে। এ পর্যন্ত অনলাইনের মাধ্যমে ২৪ লাখ ৭৬ হাজার ৮৮২ টাকা অনুদান পাওয়া গেছে।
জেলা প্রশাসক আরও জানান, পাগলা মসজিদকে কেন্দ্র করে একটি আধুনিক ইসলামিক কমপ্লেক্স নির্মাণের কাজ চলমান রয়েছে। এ লক্ষ্যে অতিরিক্ত জমি অধিগ্রহণ করা হয়েছে এবং নান্দনিক নকশা প্রণয়নের কাজ এগিয়ে চলছে।
মুসল্লিদের সুবিধার্থে মসজিদের বাইরে আধুনিক পাবলিক টয়লেট নির্মাণের কাজও বাস্তবায়নাধীন।
মসজিদের তহবিল থেকে বর্তমানে ১৩০ জন এতিম ও অসহায় শিক্ষার্থীর লেখাপড়া ও ভরণপোষণের ব্যয় বহন করা হচ্ছে।
এছাড়া ৩৫ জন কর্মচারী ও ১০ জন আনসার সদস্যের বেতন-ভাতা, মসজিদের বিদ্যুৎ বিল এবং বিভিন্ন উন্নয়নমূলক ব্যয়ও এই তহবিল থেকে নির্বাহ করা হয়।
একই সঙ্গে তহবিলের লভ্যাংশ থেকে কিশোরগঞ্জ জেলার দরিদ্র রোগীদের চিকিৎসা সহায়তাও প্রদান করা হচ্ছে।
দেশের অন্যতম আলোচিত ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান পাগলা মসজিদে প্রতিদিন হাজারো মানুষ দান-সদকা ও মানত নিয়ে আসেন। শুধু মুসলমান নয়, বিভিন্ন ধর্মাবলম্বী মানুষও গভীর বিশ্বাস ও আস্থা থেকে এখানে দান করে থাকেন।
অনেকের বিশ্বাস, আন্তরিক নিয়তে এখানে দান করলে মহান আল্লাহ তাদের মনের আশা পূরণ করেন। সেই বিশ্বাস থেকেই দেশ-বিদেশের মানুষ নগদ অর্থ, বৈদেশিক মুদ্রা, স্বর্ণালংকারসহ নানা মূল্যবান সামগ্রী দান করেন।
শুধু অর্থ নয়, গরু, ছাগল, হাঁস-মুরগি, কবুতর, ধান, চাল, ফলমূলসহ বিভিন্ন সামগ্রীও নিয়মিত দান করা হয়। এসব সামগ্রী নিলামের মাধ্যমে বিক্রি করে মসজিদের তহবিলে জমা দেওয়া হয়।
ঐতিহাসিক সূত্রে জানা যায়, প্রায় আড়াই শতাব্দী প্রাচীন এই মসজিদটি ১৯৭৯ সালের ১০ মে থেকে ওয়াকফ এস্টেটের তত্ত্বাবধানে পরিচালিত হচ্ছে।
মসজিদের নামকরণ নিয়ে প্রচলিত রয়েছে আধ্যাত্মিক সাধক ‘পাগলা সাহেব’-এর স্মৃতি। তাঁর নাম থেকেই ‘পাগলা মসজিদ’ নামটির উৎপত্তি হয়েছে বলে ইতিহাসবিদদের ধারণা।







