কুলিয়ারচরে পুলিশের গুলিতে দুই নেতা নিহতের তিন বছর, বিচারের দাবিতে বাবার কান্না
‘আমার ছেলে তো আর ফিরে আসবে না। কিন্তু তার হত্যাকারীদের বিচার হলে অন্তত বুকের ভেতরের কষ্টটা কিছুটা হলেও কমবে।’ তিন বছর ধরে সন্তানের হত্যার বিচারের আশায় মানুষের দ্বারে দ্বারে ঘুরে বেড়ানো এক বাবার কণ্ঠে এভাবেই ঝরে পড়ে আক্ষেপ আর আকুতি।
গত ৩১ অক্টোবর ছিল ছাত্রদল নেতা রেফায়েত উল্লাহর তৃতীয় মৃত্যুবার্ষিকী। তিন বছর পেরিয়ে গেলেও এখনো সন্তানের হত্যার বিচার পাননি তাঁর বাবা। ২০২৩ সালের ৩১ অক্টোবর তৎকালীন বিএনপির অবরোধ কর্মসূচি চলাকালে পুলিশের গুলিতে নিহত হন রেফায়েত উল্লাহ ও কৃষক দল নেতা বিল্লাল হোসেন।
তাঁদের তৃতীয় মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে গত ৩১ অক্টোবর শনিবার বিকেল সাড়ে ৪টার দিকে কুলিয়ারচর উপজেলার ছয়সূতী ইউনিয়নের বড় ছয়সূতী গ্রামের কবরস্থানে কবর জিয়ারত ও বিশেষ মোনাজাতের আয়োজন করা হয়। স্থানীয় বিএনপি ও অঙ্গসংগঠনের যৌথ উদ্যোগে এ কর্মসূচি পালন করা হয়।
এতে উপস্থিত ছিলেন কুলিয়ারচর উপজেলা বিএনপির সহসভাপতি মো. ছিদ্দিক মিয়া, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট মুহাম্মদ শাহ আলম, ছয়সূতী ইউনিয়ন বিএনপির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মো. মিজানুর রহমান মিজান, উপজেলা যুবদলের আহ্বায়ক আজাহার উদ্দিন লিটন, উপজেলা শ্রমিক দলের সাধারণ সম্পাদক তৌহিদুল ইসলাম বিপ্লব, ছয়সূতী ইউনিয়ন ছাত্রদলের সভাপতি মশিউর রহমান সজীব ও সাধারণ সম্পাদক মো. রবিন মিয়াসহ বিএনপি ও অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মী এবং স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিরা। কবর জিয়ারত শেষে বিশেষ মোনাজাত পরিচালনা করেন বড় ছয়সূতী আরব আলী খান ফুরকানিয়া ও হাফিজিয়া মাদ্রাসার অধ্যক্ষ মাওলানা মাহমুদ হাসান।
কবর জিয়ারতের আগে নিহত রেফায়েত উল্লাহর বাবা মো. কাউসার মিয়া ও দলীয় নেতারা দ্রুত বিচার দাবি করেন। কাউসার মিয়া জানান, ছেলেকে হারানোর পর তাঁর লাশ দাফন করতেও চরম কষ্টের মুখোমুখি হতে হয়েছিল পরিবারকে। সে সময় পরিবার ও স্বজনদের ওপর দিয়ে বয়ে যাওয়া দুর্বিষহ পরিস্থিতির স্মৃতি এখনো তাঁদের তাড়িয়ে বেড়ায়। তাঁর অভিযোগ, তখন পুলিশি বাধার কারণে আত্মীয়স্বজন ও বিএনপির নেতাকর্মীদের জন্য এলাকায় স্বাভাবিক চলাফেরাও কঠিন হয়ে পড়েছিল।
দলীয় নেতাকর্মীদের ভাষ্য, ২০২৩ সালের ৩১ অক্টোবর তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকারের পদত্যাগের দাবিতে বিএনপির কেন্দ্রীয় কর্মসূচির অংশ হিসেবে ছয়সূতী বাসস্ট্যান্ডে অবরোধ পালন করা হচ্ছিল। এ সময় পুলিশ নেতাকর্মীদের ওপর গুলি চালায়। এ ঘটনায় তৎকালীন কুলিয়ারচর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) গোলাম মোস্তফার নির্দেশনা নিয়েও অভিযোগ তোলেন নিহতের পরিবার ও স্থানীয় বিএনপির নেতারা।
সম্প্রতি এই হত্যাকাণ্ডকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন মহলে অর্থ লেনদেন ও স্বার্থ হাসিলের গুঞ্জন ছড়িয়েছে বলে অভিযোগ করেছে নিহতের পরিবার। তাদের দাবি, আওয়ামী লীগের লোকজনের কাছ থেকে টাকা নেওয়ার মতো অসত্য অভিযোগও তোলা হচ্ছে শোকাহত পরিবারটির বিরুদ্ধে।
এ বিষয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করে কাউসার মিয়া বলেন, ‘একজন বাবা কি এতটাই লোভী হতে পারে যে, নিজের সন্তানের লাশের বিনিময়ে টাকা নেবে? আমি স্পষ্ট করে বলতে চাই, আমার সন্তানের হত্যাকাণ্ড নিয়ে যদি কেউ কোনো ধরনের অর্থ লেনদেন করে থাকে, তবে সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে সত্য বের করা হোক।’
বর্তমানে রাষ্ট্রক্ষমতায় বিএনপি। নিহত রেফায়েত উল্লাহ ছিলেন ছাত্রদলের সক্রিয় কর্মী। এরপরও তিন বছরেও বিচার না পাওয়ার বিষয়টি তুলে ধরে তাঁর পরিবার প্রশ্ন করেছে, ‘কেন আজও আমাদের মানুষের দ্বারে দ্বারে ঘুরতে হচ্ছে? আমার ছেলের হত্যার বিচার কি আমি জীবিত থাকতেও দেখে যেতে পারব না?’
সন্তান হারানোর শোকে অসুস্থ হয়ে শয্যাশায়ী মা এবং এক বাবার দীর্ঘদিনের বিচারপ্রার্থনার লড়াই যেন থামছেই না। এ অবস্থায় বস্ত্র ও পাট প্রতিমন্ত্রী মো. শরীফুল আলম এমপির কাছে আকুল আবেদন জানিয়েছেন কাউসার মিয়া। তিনি বলেন, ‘দয়া করে আমার সন্তানের হত্যার বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখুন। সুষ্ঠু তদন্ত করে দোষীদের দ্রুত আইনের আওতায় আনার ব্যবস্থা করুন। আমি একজন অসহায় বাবা হিসেবে আপনার কাছে ন্যায়বিচার চাই।’
নিহত রেফায়েত উল্লাহ ও বিল্লাল হোসেনের আত্মার মাগফিরাত কামনা করে এবং শোকসন্তপ্ত পরিবারগুলোর প্রতি সমবেদনা জানিয়ে এলাকাবাসী ও দলীয় নেতাকর্মীরা হত্যাকাণ্ডের দ্রুত, সুষ্ঠু তদন্ত ও দৃষ্টান্তমূলক বিচার দাবি করেছেন।










Disqus comments are not configured yet.