২,৮১১ কোটি টাকা খরচ, ১৪ বছরেও চালু হয়নি বাস; বাতিল হচ্ছে বিআরটি
১৪ বছর ধরে নির্মাণকাজ চলেছে। ব্যয় হয়েছে ২ হাজার ৮১১ কোটি টাকা। অথচ যে বিশেষ বাস চালানোর জন্য প্রকল্পটি নেওয়া হয়েছিল, সেই বাসই চালু হয়নি। উল্টো ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কের বিমানবন্দর থেকে গাজীপুর পর্যন্ত ২০ কিলোমিটার পথে বেড়েছে যানজট ও মানুষের ভোগান্তি। এবার প্রকল্পটি বাতিল করে বিদ্যমান অবকাঠামোকে সাধারণ মহাসড়কে রূপান্তরের সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে গত রোববার মন্ত্রিসভার বৈঠকে গাজীপুরের বাস র্যাপিড ট্রানজিট (বিআরটি) প্রকল্পের ভবিষ্যৎ নিয়ে আলোচনা হয়। পরদিন সোমবার সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের জারি করা এক পত্রে সভার আলোচনা ও সিদ্ধান্ত জানানো হয়।
সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, বিআরটি করিডরের স্টেশন ও লেন বিভাজক অপসারণ করে সড়কটিকে তিন থেকে ছয় লেনের সাধারণ মহাসড়কে রূপান্তরের প্রস্তাব করা হয়েছে। এ ছাড়া দুটি দুই লেনের উড়ালসড়ককে চার লেনে উন্নীত করার কথা বলা হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট উন্নয়নসহযোগী প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে আলোচনা করে আইনগত জটিলতা নিরসন এবং প্রকল্প বন্ধের প্রয়োজনীয় কার্যক্রম নিতে বলা হয়েছে। বিআরটি পরিচালনার জন্য গঠিত ঢাকা বাস র্যাপিড ট্রানজিট কোম্পানি বন্ধ করে এর কার্যক্রম সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরের (সওজ) আওতায় নেওয়ার প্রস্তাবও গ্রহণ করেছে মন্ত্রিসভা।
সভায় গৃহীত সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে জরুরি ভিত্তিতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে বলা হয়েছে। সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের অগ্রগতি ১৫ দিনের মধ্যে মন্ত্রণালয়কে জানাতে হবে। কার্যক্রম শেষ না হওয়া পর্যন্ত প্রতি মাসের ৩ তারিখের মধ্যে অগ্রগতি প্রতিবেদন পাঠাতে হবে।
সড়ক পরিবহন মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, মন্ত্রিসভার বৈঠকে বিআরটি প্রকল্পের ভবিষ্যৎ নিয়ে চারটি বিকল্প আলোচনা করা হয়। বিকল্পগুলো হলো—প্রকল্পটি বাতিল করা, অসমাপ্ত কাজ শেষ করে বিশেষ বিআরটি বাস চালু করা, বিদ্যমান অবকাঠামো রেখে বিশেষ বাসের পাশাপাশি বেসরকারি বাস চলতে দেওয়া এবং বিআরটি পথটি টোলের আওতায় এনে পরিচালনা করা।
শেষ পর্যন্ত সরকার প্রকল্পটি বাতিল করে সাধারণ মহাসড়ক হিসেবে ব্যবহারের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এর ফলে বিদ্যমান স্টেশন ও বিআরটি লেন আলাদা করার জন্য নির্মিত বিভাজক অপসারণ করতে হবে। উড়ালসড়ক ভবিষ্যতে সম্প্রসারণের পরিকল্পনাও রয়েছে।
তবে প্রকল্পটি সম্পন্ন করে বিশেষ বাস চালুর দাবি জানিয়ে আসছে ‘গাজীপুর ঐতিহ্য ও উন্নয়ন’ নামে একটি সংগঠন। এ দাবিতে সংগঠনটি একাধিক সংবাদ সম্মেলন করেছে এবং সরকারের বিভিন্ন দপ্তরে চিঠি দিয়েছে।
সংগঠনটির সভাপতি মো. শামসুল হক বলেন, গত ১৪ বছর গাজীপুরবাসীকে অবর্ণনীয় দুর্ভোগ পোহাতে হয়েছে। প্রকল্পের কাজ ৯৭ শতাংশ সম্পন্ন হওয়ার পর তা বাতিল করা ঠিক হবে না। সরকারের সিদ্ধান্তের প্রতিবাদ জানিয়ে তাঁরা চিঠি দেবেন।
বিআরটি প্রকল্পের ভবিষ্যৎ নিয়ে সিদ্ধান্তের আগে এর কারিগরি দিক পর্যালোচনা করে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) একটি বিশেষজ্ঞ দল। দলের নেতৃত্বে ছিলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক সামছুল হক। গত বছরের অক্টোবরে তাঁরা সড়ক পরিবহন মন্ত্রণালয়ে প্রতিবেদন জমা দেন।
অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের গঠিত দুটি কমিটির প্রতিবেদন পর্যালোচনা করে বুয়েটের বিশেষজ্ঞ দল প্রকল্পটি পুরোপুরি বাতিল করে বিদ্যমান অবকাঠামো উন্নত মহাসড়ক হিসেবে ব্যবহারের সুপারিশ করে।
প্রতিবেদনে প্রকল্পটিকে দেশের অবকাঠামো পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নে ‘পদ্ধতিগত ব্যর্থতার’ উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। যথাযথ কারিগরি যাচাই, দক্ষ জনবল ও জবাবদিহির অভাবে এ পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে বলে মত দিয়েছে দলটি। প্রকল্পের পরিকল্পনা ও নকশায় ত্রুটি এবং বিভিন্ন সংস্থার মধ্যে সমন্বয়হীনতার কথাও প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।
সড়ক পরিবহন মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে উত্তরা থেকে কেরানীগঞ্জ পর্যন্ত আরেকটি বিআরটি পথ নির্মাণের পরিকল্পনা ছিল। কিন্তু গাজীপুর-বিমানবন্দর পথটি সময়মতো চালু না হওয়ায় দ্বিতীয় প্রকল্পটি বাতিল হয়ে যায়। এতে গাজীপুর-বিমানবন্দর অংশের কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে।
এ ছাড়া বাংলাদেশের প্রচলিত বাসগুলোর দরজা বাঁ দিকে। কিন্তু বিআরটি লেনের স্টেশনগুলো এমনভাবে তৈরি করা হয়েছে, যাতে বাসের দরজা থাকে ডান দিকে। বিশ্বব্যাপী বিআরটি ব্যবস্থায় সাধারণত ডান দিকে দরজার বাস ব্যবহার করা হয়। এ ধরনের বাস চালু করলে সেগুলো গাজীপুর-বিমানবন্দর করিডরের বাইরে চলাচল করতে পারবে না।
অধ্যাপক সামছুল হক বলেন, বিআরটি প্রকল্পের সম্ভাব্য বিকল্পগুলোর মধ্যে সবচেয়ে ভালো হলো এটি বাতিল করা। তবে ১৪ বছর ধরে গাজীপুরবাসীসহ এ পথে যাতায়াতকারীরা দুর্ভোগ সহ্য করেছেন। তাঁদের জন্য বিকল্প পরিবহনব্যবস্থা করা উচিত।
তিনি বলেন, বিআরটি বাস চালু হলেও গাজীপুরের যাত্রীদের শুধু বিমানবন্দর পর্যন্ত যাওয়ার সুযোগ হতো। এরপর তাঁদের আবার বাস বদলাতে হতো, যা বাস্তবসম্মত নয়। প্রকল্পটি বাতিল করে সড়ককে উচ্চগতির মহাসড়কে রূপান্তর করলে গাজীপুরের শিল্পাঞ্চলের ব্যবহারকারীরা সুবিধা পাবেন। পাশাপাশি গাজীপুরবাসীর জন্য কমলাপুর পর্যন্ত কমিউটার ট্রেন চালু করা যেতে পারে। কারণ, এর মধ্যে রেলের তৃতীয় ও চতুর্থ লাইন নির্মাণ শেষ পর্যায়ে।
ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকার ২০১২ সালে বিমানবন্দর থেকে গাজীপুরের শিববাড়ী পর্যন্ত প্রায় ২০ কিলোমিটার দীর্ঘ বিআরটি প্রকল্প হাতে নেয়। এর মধ্যে ১৫ দশমিক শূন্য ৭ কিলোমিটার সড়কপথ, বাকিটা উড়ালপথ।
সড়কের মাঝখানে দুটি পৃথক লেনে বিশেষ বাস চালানোর পরিকল্পনা ছিল। প্রকল্পটি চালু হলে প্রতিদিন প্রায় ২৫ হাজার যাত্রী যাতায়াত করতে পারবেন বলে আশা করা হয়েছিল। বাসগুলো যানজট, ট্রাফিক সিগন্যাল কিংবা অন্য কোনো বাধায় আটকে থাকবে না—এমনটাই ছিল পরিকল্পনা।
মূলত বিদেশি অর্থায়নের ওপর নির্ভর করে প্রকল্পটি নেওয়া হয়। এতে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি), ফরাসি উন্নয়ন সংস্থা (এএফডি) এবং গ্লোবাল এনভায়রনমেন্ট ফ্যাসিলিটি (জিইএফ) অর্থায়ন করছে।
প্রকল্পের প্রাথমিক ব্যয় ধরা হয়েছিল প্রায় ২ হাজার ৪০ কোটি টাকা। ২০১৬ সালে নির্মাণকাজ শেষ করে ২০১৭ সাল থেকে স্বয়ংক্রিয় দরজার বিশেষ বাস চালুর পরিকল্পনা ছিল। কিন্তু নির্ধারিত সময়ে কাজ শেষ হয়নি। তিন দফা সংশোধনে প্রকল্পের ব্যয় বেড়ে দাঁড়ায় ৪ হাজার ২৬৮ কোটি টাকা। এর মধ্যে খরচ হয়েছে ২ হাজার ৮১১ কোটি টাকা।
২০২৫ সালে প্রকল্পটি চতুর্থবার সংশোধনের প্রস্তাব দেওয়া হয়। এতে ব্যয় বাড়িয়ে ৬ হাজার ৫৯৮ কোটি টাকা এবং মেয়াদ ২০২৯ সাল পর্যন্ত করার কথা বলা হয়। তবে অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটি (একনেক) সংশোধিত প্রস্তাব অনুমোদন করেনি। বরং প্রকল্পের বিকল্প খুঁজতে এবং নকশাগত ত্রুটির জন্য দায়ী ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান চিহ্নিত করতে নির্দেশ দেওয়া হয়।
বিমানবন্দর থেকে গাজীপুর পর্যন্ত সড়কের মাঝখানে ১৫টি স্টেশন অবকাঠামো নির্মাণ করা হয়েছে। তবে কোনো স্টেশনের কাজই পুরোপুরি শেষ হয়নি। যাত্রীদের ওঠানামার জন্য নির্মিত কয়েকটি পদচারী-সেতুতে চলন্ত সিঁড়ি ও লিফট রয়েছে। কিন্তু এসব স্থাপনার অনেকগুলোই ব্যবহার করা যাচ্ছে না। কোথাও যন্ত্রপাতিতে জং ধরেছে, কোথাও অবকাঠামো ভেঙে পড়ছে।
বিআরটি লেন আলাদা করতে সড়কের মাঝখানে সিমেন্টের প্রতিবন্ধক বসানো হয়েছে। কিছু স্থানে দেওয়া হয়েছে লোহার বেড়া। এসব কারণে সড়কের ব্যবহারযোগ্য জায়গা কমেছে। কোথাও উড়ালপথ, কোথাও সমতল সড়ক, আবার কোথাও সরু লেন থাকায় যানবাহন চলাচলে সমস্যা হচ্ছে।
প্রকল্প বাতিলের ফলে স্টেশনগুলো ভেঙে ফেলতে হবে। লিফটসহ অন্যান্য যন্ত্রপাতি অন্য কোথাও ব্যবহারের পরিকল্পনা রয়েছে সওজের।
এই সড়ক দিয়ে বৃহত্তর ময়মনসিংহ, উত্তরবঙ্গ ও টাঙ্গাইলের মানুষ যাতায়াত করেন। নির্মাণকাজ চলাকালে ক্রেনসহ বিভিন্ন দুর্ঘটনায় সাতজনের প্রাণহানিও হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, পূর্ণাঙ্গ সমীক্ষা ও নকশা শেষ হওয়ার আগেই প্রকল্পটি নেওয়া হয়েছিল। নির্মাণকাজ শুরুর পর দেখা যায়, প্রকল্প এলাকায় যথাযথ পয়োনিষ্কাশনব্যবস্থা নেই। ফলে পানি জমে থাকে। বিভিন্ন সেবা সংস্থার লাইন সরানোর পরিকল্পনাও আগে থেকে করা হয়নি। ব্যস্ত সড়কে নির্মাণকাজ চলার সময় যানবাহন সচল রাখার বিকল্প ব্যবস্থাও ছিল না।
প্রকল্প বাস্তবায়নের দায়িত্বে ছিল তিনটি সরকারি সংস্থা—সওজ, সেতু বিভাগ ও স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি)। বিআরটি পরিচালনার জন্য ২০১৩ সালে ঢাকা বাস র্যাপিড ট্রানজিট কোম্পানি গঠন করা হয়।
বর্তমানে কোম্পানিটিতে ব্যবস্থাপনা পরিচালকসহ ১৮ জন কর্মকর্তা-কর্মচারী রয়েছেন। কিন্তু বিশেষ বাস কেনা হয়নি বলে তাঁদের কাজ সীমিত। এখন কোম্পানিটি বিলুপ্ত করে এর কার্যক্রম সওজের আওতায় নেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে।
বুয়েটের প্রতিবেদনে সম্ভাব্যতা সমীক্ষা প্রস্তুতকারী, নকশা প্রণয়নকারী পরামর্শক এবং প্রকল্প পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নের সঙ্গে যুক্ত সরকারি কর্মকর্তাদের জবাবদিহির আওতায় আনার সুপারিশ করা হয়েছে। পাশাপাশি অর্থায়নকারী সংস্থা, প্রকল্প পরিচালনা কমিটি, বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগ (আইএমইডি) এবং পরিকল্পনা কমিশনের ভূমিকাও পর্যালোচনার কথা বলা হয়েছে।
তবে প্রকল্প বাতিলের আর্থিক প্রভাব নিয়েও উদ্বেগ রয়েছে বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্সের (বিআইপি)। গত বছর এক সেমিনারে সংস্থাটি বলেছিল, অবকাঠামোগত কাজের মাত্র ৩ শতাংশ বাকি থাকায় প্রকল্প বাতিল করা ঠিক হবে না। তাদের হিসাবে, প্রকল্প বাতিল হলে স্টেশন, র্যাম্প ও চলন্ত সিঁড়ি অপসারণ এবং ঠিকাদারদের ক্ষতিপূরণ দিতে এক হাজার কোটি টাকার বেশি ব্যয় হতে পারে।
গ্লোবাল বিআরটি ডেটা ওয়েবসাইটের তথ্য অনুসারে, বিশ্বের ১৯১টি শহরে বিআরটি ব্যবস্থা চালু রয়েছে। এসব ব্যবস্থায় প্রতিদিন সোয়া তিন কোটির বেশি যাত্রী যাতায়াত করেন। পাশের দেশ ভারতের ১৩টি শহরে ২২৮ কিলোমিটার দীর্ঘ বিআরটি ব্যবস্থা রয়েছে, যেখানে প্রতিদিন প্রায় পাঁচ লাখ যাত্রী পরিবহন করা হয়। চীনে বিআরটিতে প্রতিদিন প্রায় ৪৪ লাখ এবং তাইওয়ানে প্রায় সাড়ে ১৩ লাখ যাত্রী চলাচল করেন।










Disqus comments are not configured yet.