রাজধানীর গণপরিবহনে নতুন সংযোগ যুক্ত হতে যাচ্ছে। উত্তরা থেকে মতিঝিল পর্যন্ত চলাচলকারী মেট্রোরেল এবার সম্প্রসারিত হয়ে পৌঁছাবে কমলাপুর রেলস্টেশনে। এতে মেট্রোরেল থেকে নেমে অটোরিকশা বা অন্য যানবাহনে কমলাপুর যাওয়ার বাড়তি ঝামেলা কমবে। একই সঙ্গে দেশের বিভিন্ন গন্তব্যে ট্রেনে যাতায়াতকারী যাত্রীদের জন্য তৈরি হবে সহজ যোগাযোগের সুযোগ।
মতিঝিল থেকে কমলাপুর পর্যন্ত মেট্রোরেলের সম্প্রসারিত অংশের নির্মাণকাজের সার্বিক অগ্রগতি ৮৫ শতাংশে পৌঁছেছে। সংশ্লিষ্ট পরিকল্পনা অনুযায়ী, আগামী বছরের জুলাইয়ের শুরুতে এ অংশে যাত্রী নিয়ে বাণিজ্যিক চলাচল শুরু হতে পারে। এর আগে ফেব্রুয়ারিতে পরীক্ষামূলকভাবে ট্রেন চালানোর পরিকল্পনা রয়েছে।
ঢাকা ম্যাস ট্রানজিট কোম্পানি লিমিটেডের (ডিএমটিসিএল) আওতায় বাস্তবায়নাধীন এমআরটি লাইন-৬-এর এই সম্প্রসারণ রাজধানীর গণপরিবহন ব্যবস্থায় গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আনতে পারে। বিশেষ করে কমলাপুর রেলস্টেশন থেকে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে যাতায়াতকারী যাত্রীরা সরাসরি মেট্রোরেল ব্যবহারের সুযোগ পাবেন।
বর্তমানে ফার্মগেট, কারওয়ান বাজার বা অন্য স্টেশন থেকে মেট্রোরেলে মতিঝিল পর্যন্ত এসে কমলাপুর যেতে যাত্রীদের আলাদা যানবাহন ব্যবহার করতে হয়। এতে বাড়তি ভাড়া গুনতে হয়, সময়ও ব্যয় হয়। কমলাপুর পর্যন্ত মেট্রোরেল চালু হলে এই বাড়তি যাতায়াতের প্রয়োজন অনেকটাই কমবে।
রাজধানীর মেট্রোরেলে প্রতিদিন বিপুলসংখ্যক মানুষ চলাচল করেন। শুধু মতিঝিল স্টেশন দিয়েই প্রতিদিন প্রায় এক লাখ যাত্রীর যাতায়াত রয়েছে। কমলাপুর পর্যন্ত সম্প্রসারণ সম্পন্ন হলে রেলস্টেশনগামী যাত্রীদের পাশাপাশি আশপাশের এলাকার মানুষও উপকৃত হবেন বলে আশা করা হচ্ছে।
বর্তমানে মেট্রোরেলে দৈনিক যাত্রীর সংখ্যা সাড়ে চার লাখের বেশি। কমলাপুর পর্যন্ত সম্প্রসারিত অংশ চালু হলে এ সংখ্যা ৬ লাখ ৭৭ হাজারে পৌঁছাতে পারে বলে প্রকল্পের প্রাক্কলনে উল্লেখ করা হয়েছে।
মতিঝিল থেকে কমলাপুর পর্যন্ত সম্প্রসারিত অংশের উড়ালপথ নির্মাণের কাজ শেষ হয়েছে। কমলাপুর মেট্রোস্টেশনের মূল কাঠামোর কাজও সম্পন্ন হয়েছে। এখন রেললাইন বসানো, বিদ্যুৎ সরবরাহব্যবস্থা স্থাপন এবং স্টেশনের বিভিন্ন কারিগরি ও আনুষঙ্গিক কাজ চলছে।
এ অংশে রেললাইন বসানোর পাশাপাশি বিদ্যুতের তার, সংকেতব্যবস্থা, স্বয়ংক্রিয় ভাড়া আদায়ের যন্ত্র, লিফট, চলন্ত সিঁড়ি এবং যাত্রীদের নিরাপত্তায় প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম স্থাপন করতে হবে। স্টেশনের ভেতরে টাইলস, শৌচাগার ও অন্যান্য সুযোগ-সুবিধার কাজও শেষ করা প্রয়োজন।
কিছু যন্ত্রপাতি বিদেশ থেকে আনার বিষয়টিও সময়সূচির জন্য গুরুত্বপূর্ণ। এসব সরঞ্জাম স্থাপন ও পরীক্ষা সম্পন্ন না হলে নিয়মিত যাত্রী পরিবহন শুরু করা কঠিন হবে। এ কারণে নির্মাণকাজের অগ্রগতির পাশাপাশি কারিগরি প্রস্তুতির গতিও চালুর সময় নির্ধারণে ভূমিকা রাখবে।
মতিঝিল থেকে কমলাপুর পর্যন্ত মেট্রোরেল সম্প্রসারণের কাজ নির্ধারিত সময়ের মধ্যে শেষ করা যায়নি। আগের পরিকল্পনায় ২০২৫ সালের জুনে এ অংশ চালুর লক্ষ্য ছিল। পরে বিভিন্ন কারণে সময়সূচিতে পরিবর্তন আসে।
এই সম্প্রসারণে মতিঝিল থেকে কমলাপুর পর্যন্ত প্রায় ১ দশমিক ১৬ কিলোমিটার নতুন উড়ালপথ যুক্ত হচ্ছে। এর মাধ্যমে উত্তরা থেকে কমলাপুর পর্যন্ত এমআরটি লাইন-৬-এর মোট দৈর্ঘ্য হবে ২১ দশমিক ২৬ কিলোমিটার। পুরো পথে স্টেশন থাকবে ১৭টি।
বর্তমান পরিকল্পনা অনুযায়ী, আগামী ফেব্রুয়ারিতে পরীক্ষামূলক চলাচল শুরু করে জুলাইয়ের শুরুতে যাত্রী পরিবহনে যাওয়ার লক্ষ্য রয়েছে। তবে বাকি কারিগরি কাজ, যন্ত্রপাতি স্থাপন এবং পরীক্ষামূলক চলাচলের ফলাফলের ওপর চূড়ান্ত সময়সূচি নির্ভর করবে।
কমলাপুর দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ রেল যোগাযোগকেন্দ্র। পদ্মা সেতু চালুর পর দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের সঙ্গে রেল যোগাযোগ বেড়েছে। ফলে কমলাপুরে যাত্রীদের যাতায়াতও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
মেট্রোরেলের সঙ্গে কমলাপুর রেলস্টেশনের সরাসরি সংযোগ তৈরি হলে রেলযাত্রীদের একটি অংশ সড়কপথের পরিবর্তে দ্রুতগতির গণপরিবহন ব্যবহার করতে পারবেন। এতে স্টেশনমুখী সড়কে যানবাহনের চাপ কমানোর সুযোগ তৈরি হবে। পাশাপাশি শহরের বিভিন্ন এলাকা থেকে রেলস্টেশনে পৌঁছানোর সময় ও খরচও কমতে পারে।
ঢাকার যানজট কমানোর লক্ষ্য নিয়ে ২০১২ সালে এমআরটি লাইন-৬ প্রকল্প নেওয়া হয়। উত্তরা থেকে আগারগাঁও অংশে ২০২২ সালের ২৮ ডিসেম্বর এবং আগারগাঁও থেকে মতিঝিল অংশে ২০২৩ সালের ৪ নভেম্বর যাত্রী পরিবহন শুরু হয়।
এবার কমলাপুর পর্যন্ত সম্প্রসারণের কাজ শেষ হলে মেট্রোরেল ও জাতীয় রেল যোগাযোগের মধ্যে সরাসরি সংযোগ তৈরি হবে। তবে নির্ধারিত সময়ে চালু করতে হলে নির্মাণের অবশিষ্ট কাজ, কারিগরি পরীক্ষা এবং স্টেশনের যাত্রীসেবার প্রস্তুতি দ্রুত সম্পন্ন করতে হবে।
Disqus comments are not configured yet.