দুই হাজার কোটি টাকার প্রকল্পে লিকেজ, তিন মাসেও পানি পাচ্ছেন না গ্রাহক
প্রায় দুই হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে বাস্তবায়িত ভাণ্ডালজুড়ি পানি সরবরাহ প্রকল্পের পাইপলাইনে লিকেজ দেখা দেওয়ার তিন মাসের বেশি সময় পার হলেও তা শনাক্ত ও মেরামত করতে পারেনি চট্টগ্রাম ওয়াসা। ফলে কর্ণফুলী উপজেলার শিকলবাহা ও মইজ্জারটেক এলাকার প্রায় ২৫০টি সংযোগে পানি সরবরাহ বন্ধ রয়েছে। এতে আনুমানিক দুই থেকে আড়াই হাজার মানুষ পানিসংকটে পড়েছেন। কবে নাগাদ সরবরাহ স্বাভাবিক হবে, তা নিশ্চিত করে বলতে পারছেন না ওয়াসার কর্মকর্তারা।
বাংলানিউজের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দিনের পর দিন পানি সরবরাহ বন্ধ থাকায় আবাসিক ও বাণিজ্যিক গ্রাহকেরা ভোগান্তিতে পড়েছেন। বিশেষ করে যেসব পরিবার ওয়াসার পানি পাওয়ার পর বিকল্প পানির উৎস বন্ধ করে দিয়েছিল, তাদের দুর্ভোগ বেড়েছে। পানি না থাকায় রেস্টুরেন্টসহ বিভিন্ন ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানও সংকটে পড়েছে। তিন মাস ধরে চলা এ পরিস্থিতিতে ক্ষুব্ধ স্থানীয় গ্রাহকেরা।
জানা গেছে, দক্ষিণ চট্টগ্রামের বোয়ালখালী, পটিয়া, আনোয়ারা ও কর্ণফুলী উপজেলার আবাসিক গ্রাহক এবং শিল্পকারখানায় পানি সরবরাহের লক্ষ্যে ভাণ্ডালজুড়ি পানি সরবরাহ প্রকল্প হাতে নেয় চট্টগ্রাম ওয়াসা।
২০১৬ সালের ৫ জানুয়ারি জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় প্রকল্পটি অনুমোদন পায়। শুরুতে প্রকল্পের ব্যয় ধরা হয়েছিল এক হাজার ৩৬ কোটি ৩০ লাখ টাকা। পরে তা বেড়ে দাঁড়ায় প্রায় এক হাজার ৯৯৪ কোটি ১৪ লাখ টাকা। অর্থাৎ প্রকল্পের ব্যয় বেড়েছে প্রায় ৯৫৮ কোটি টাকা বা ৯২ শতাংশের বেশি।
পাঁচ বছর মেয়াদি প্রকল্পটির কাজ ২০২০ সালের সেপ্টেম্বরে শেষ হওয়ার কথা ছিল। নির্ধারিত সময়ে কাজ শেষ না হওয়ায় প্রকল্পের মেয়াদ ও ব্যয়—দুটিই বাড়ানো হয়। প্রকল্পের আওতায় প্রায় ১৩৩ কিলোমিটার ট্রান্সমিশন ও ডিস্ট্রিবিউশন পাইপলাইন স্থাপন করা হয়েছে। পানি শোধনাগারটির দৈনিক উৎপাদনক্ষমতা ছয় কোটি লিটার।
প্রকল্পের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে পটিয়ার শিকলবাহা খালের তলদেশে কালারপোল সেতুর পাশে বিশেষ টানেল তৈরি করে পাইপলাইন স্থাপন করা হয়। ২০২২ সালের অক্টোবরে শুরু হওয়া এ কাজ ২০২৩ সালের শেষ দিকে সম্পন্ন হয়। পরে ২০২৪ সালের অক্টোবর-নভেম্বরে পুরো পাইপলাইনের জোড়াতালি পরীক্ষা ও পরীক্ষামূলক পানি সরবরাহ কার্যক্রম শেষ হয়। তবে পাইপলাইন স্থাপনের দুই বছর পার না হতেই সংশ্লিষ্ট লাইনে লিকেজ দেখা দেওয়ায় প্রকল্পের নির্মাণমান ও তদারকি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
লিকেজ শনাক্তে দীর্ঘসূত্রতা নিয়ে জানতে চাইলে প্রকল্প পরিচালক মাহবুব আলম বলেন, প্রকল্পের কাজ চলছে। কোরিয়ান কোম্পানি লিকেজ শনাক্তে কাজ করছে। নদীর নিচ দিয়ে প্রায় ৮০ ফুট গভীর টানেলের মাধ্যমে পাইপলাইন নেওয়া হয়েছে। ফলে ওই গভীরতায় কাজ করতে হচ্ছে। এ কারণে লিকেজ খুঁজে পেতে সময় লাগছে।
তবে কবে নাগাদ লিকেজ শনাক্ত ও মেরামত করে পানি সরবরাহ স্বাভাবিক করা যাবে, তা নির্দিষ্ট করে জানাতে পারেননি তিনি।
দীর্ঘদিন পানি না থাকায় সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়েছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। শিকলবাহা ইউনিয়নের ৩ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দা সাইফুল ইসলাম বাংলানিউজকে বলেন, তিন মাস ধরে এলাকায় পানি নেই। বিকল্প পদ্ধতিতে তাঁদের চলতে হচ্ছে। এলাকায় আগে গভীর নলকূপসহ পানির বিভিন্ন ব্যবস্থা ছিল। ওয়াসার পানি আসার পর অনেকে সেগুলো বন্ধ করে দিয়েছেন। এখন মাসের পর মাস পানি ছাড়া তাঁদের দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে।
শহরতলি হওয়ায় কর্ণফুলী উপজেলার শিকলবাহা ও মইজ্জারটেক এলাকায় দ্রুত নগরায়ণ হচ্ছে। একদিকে গড়ে উঠেছে ভারী শিল্পকারখানা, অন্যদিকে বাড়ছে আবাসিক ভবন ও বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান। তুলনামূলক কম খরচে বসবাসের সুযোগ থাকায় এ এলাকায় জনবসতিও বাড়ছে। ফলে পানি সরবরাহ বন্ধ থাকায় আবাসিক গ্রাহকদের পাশাপাশি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোও বিপাকে পড়েছে।
মইজ্জারটেক এলাকার রেস্টুরেন্ট ব্যবসায়ী জামিল আহমেদ বাংলানিউজকে বলেন, তিন মাস ধরে ওয়াসার পানি বন্ধ থাকায় তাঁদের ব্যবসা পরিচালনা করতে সমস্যা হচ্ছে। ওয়াসায় যোগাযোগ করলে সঞ্চালন লাইনে লিকেজের কথা জানানো হয়েছে। একটি লিকেজ মেরামতে এত সময় লাগা নিয়ে প্রশ্ন তুলে তিনি প্রকল্পে অনিয়ম-দুর্নীতির আশঙ্কা প্রকাশ করেন।
চট্টগ্রাম ওয়াসার ব্যবস্থাপনা পরিচালক জানে আলম বাংলানিউজকে বলেন, তিনি ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন। তবে কোথায় ও কীভাবে লিকেজ হয়েছে, তা এখনো শনাক্ত করা যায়নি। ওয়াসার কর্মীরা কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন।
কোরিয়ান এক্সিম ব্যাংকের ঋণ, সরকারি অর্থ এবং চট্টগ্রাম ওয়াসার নিজস্ব তহবিলে প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হয়েছে। এর মধ্যে কোরিয়ান এক্সিম ব্যাংক থেকে প্রায় এক হাজার ২২৪ কোটি টাকা, সরকার থেকে প্রায় ৭৫০ কোটি টাকা এবং ওয়াসার নিজস্ব তহবিল থেকে ২০ কোটি টাকা দেওয়া হয়েছে।










Disqus comments are not configured yet.