তারেক রহমানের সফর চায় ভারত, সম্পর্ক পুনর্গঠনে নয়াদিল্লির তৎপরতা
বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে ভারত সফরে নিতে গত কয়েক দিন ধরে তৎপরতা চালাচ্ছে নয়াদিল্লি। চলতি বছরের ফেব্রুয়ারির জাতীয় নির্বাচনে তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বিএনপি জয়ী হওয়ার পর তিনি প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার অল্প সময়ের মধ্যেই তাকে ভারত সফরের আমন্ত্রণ জানায় দেশটি। তবে এখনো সফরের তারিখ চূড়ান্ত হয়নি।
বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীকে ভারত সফরে নেওয়ার বিষয়ে নয়াদিল্লির তৎপরতা নিয়ে শুক্রবার (২৮ আগস্ট) একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে বিবিসি বাংলা।
বিবিসির প্রতিবেদনে ভারতের রাষ্ট্রপতির দপ্তরের একটি বার্তার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। ওই বার্তায় বলা হয়েছিল, বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীকে স্বাগত জানানোর প্রস্তুতির অংশ হিসেবে প্রেসিডেন্ট গার্ডের সাপ্তাহিক অনুষ্ঠান বাতিল করে তাদের মহড়ার ব্যবস্থা করা হয়েছে। তবে ওই সময় পর্যন্ত তারেক রহমানের ভারত সফর চূড়ান্ত হয়নি।
বিবিসি বলেছে, ভারতের রাষ্ট্রপতির দপ্তরের ওই বার্তা তারেক রহমানকে নয়াদিল্লি সফরে নেওয়ার জন্য ভারতের আগ্রহ ও প্রস্তুতির বিষয়টি আরও স্পষ্ট করে। তবে বার্তাটি প্রকাশের কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই প্রত্যাহার করে নেয় ভারতের রাষ্ট্রপতির দপ্তর।
বিবিসির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ভারতের পূর্বাঞ্চলীয় প্রতিবেশী বাংলাদেশের নতুন সরকারের প্রধানের ভারত সফর নিয়ে নয়াদিল্লির আগ্রহ অত্যন্ত বেশি। এর সঙ্গে সময়টিও গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, নির্বাচনে বড় জয় পাওয়ার পর এটি হলে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তারেক রহমানের প্রথম ভারত সফর হবে।
বিবিসি আরও বলেছে, ২০২৪ সালের আগস্টে গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে ভারতের দীর্ঘদিনের মিত্র শেখ হাসিনার সরকারের পতনের পর গত ফেব্রুয়ারির নির্বাচন বাংলাদেশের রাজনীতিতে নতুন অধ্যায়ের সূচনা করেছে। ওই গণঅভ্যুত্থানে বহু মানুষ নিহত হন এবং শেখ হাসিনা ভারতে চলে যান।
এরপর অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের সময় ভারত ও বাংলাদেশের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের দ্রুত অবনতি ঘটে।
বিবিসির বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ভারত মনে করছে, তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন নতুন সরকার দুই দেশের গুরুত্বপূর্ণ সম্পর্ক পুনর্গঠনে সহায়ক হতে পারে। তবে ভারতে শেখ হাসিনার অবস্থান এই সম্পর্ক পুনর্গঠনের ক্ষেত্রে একটি জটিল বিষয় হয়ে রয়েছে।
শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে জুলাইয়ের গণঅভ্যুত্থানে মারণাস্ত্র ব্যবহারের নির্দেশ দেওয়ার অভিযোগে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় মৃত্যুদণ্ডের রায় দেওয়া হয়েছে। বাংলাদেশ এরই মধ্যে তাকে ভারতের কাছে ফেরত চেয়েছে।
বিবিসির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তারেক রহমানের ভারত সফরের আগে বাংলাদেশ শেখ হাসিনাকে ফেরত দেওয়ার বিষয়টি উত্থাপন করেছে এবং সফরের জন্য অনুকূল পরিবেশ তৈরির ওপর গুরুত্ব দিয়েছে। ভারত জানিয়েছে, তারা বিষয়টি বিবেচনা করছে।
বিবিসি জানিয়েছে, বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে বিভিন্ন বিষয়ে মতপার্থক্য থাকলেও ভারতের পক্ষ থেকে বাংলাদেশের নতুন সরকারের সঙ্গে সম্পর্ক জোরদারে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
তারেক রহমান প্রধানমন্ত্রী হওয়ার অল্প সময়ের মধ্যেই ভারত আনুষ্ঠানিকভাবে তাকে সফরের আমন্ত্রণ জানায়। পাশাপাশি বাংলাদেশে নিযুক্ত ভারতীয় হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদী প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানসহ সরকারের বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করেছেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
দীনেশ ত্রিবেদী পরে জানান, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ভারত সফর করলে তাকে সর্বোচ্চ সম্মান এবং স্মরণীয় অভ্যর্থনা জানানো হবে।
বিবিসির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সাধারণত কোনো প্রতিবেশী দেশের নেতার সফর নিয়ে ভারত প্রকাশ্যে এ ধরনের আগ্রহ বা উদ্দীপনা খুব একটা দেখায় না। ফলে তারেক রহমানের সম্ভাব্য সফর নিয়ে নয়াদিল্লির তৎপরতাকে তাৎপর্যপূর্ণ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
ভারতের সাবেক পররাষ্ট্রসচিব শ্যাম শরণ বলেছেন, শেখ হাসিনাকে ফেরত দেওয়া ছাড়া বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক এগিয়ে নিতে ভারত ইতোমধ্যে অনেক দূর এগিয়েছে। তবে ঢাকার কঠোর অবস্থানের কারণে নয়াদিল্লি এখন কিছুটা হতাশ হয়ে থাকতে পারে বলেও তিনি মনে করেন।
তার ভাষ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশের কিছু চাহিদা ভারত পূরণ করেছে। এর মধ্যে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সরবরাহ, মেডিকেল ভিসা দেওয়া এবং দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য পুনরায় সচল করতে প্রয়োজনীয় বিভিন্ন পদক্ষেপ নেওয়ার বিষয় রয়েছে।
ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলোর সঙ্গে মূল ভূখণ্ডের যোগাযোগ সহজ করতে বাংলাদেশের ভৌগোলিক অবস্থান গুরুত্বপূর্ণ। বিবিসির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, শেখ হাসিনার প্রায় ১৫ বছরের শাসনামলে দুই দেশের সরকার সড়ক, রেল ও বন্দর যোগাযোগ সম্প্রসারণে বিভিন্ন পদক্ষেপ নেয়।
এ ছাড়া সীমান্তবর্তী বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠীগুলোর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার ক্ষেত্রেও শেখ হাসিনার সরকার ভারতকে সহযোগিতা করেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
তবে শেখ হাসিনার সঙ্গে ভারতের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক নিয়ে বাংলাদেশে সমালোচনাও রয়েছে। সমালোচকদের অভিযোগ, শেখ হাসিনার সরকারের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখতে গিয়ে ভারত বাংলাদেশের গণতন্ত্র ও মানবাধিকার পরিস্থিতি উপেক্ষা করেছে।
শেখ হাসিনা বর্তমানে ভারতে অবস্থান করায় দুই দেশের সম্পর্কে ওই বিষয়গুলো এখনো গুরুত্বপূর্ণ হয়ে আছে। এর মধ্যে গত ৫ আগস্ট দিল্লির অল ইন্ডিয়া প্রেসক্লাবে শেখ হাসিনার প্রকাশ্য ভার্চুয়াল সংবাদ সম্মেলনের পর বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কে নতুন করে টানাপোড়েন তৈরি হয় বলে বিবিসির প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
বিবিসির বিশ্লেষণ অনুযায়ী, এসব রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক জটিলতার প্রভাব পড়তে পারে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সম্ভাব্য ভারত সফরেও। ফলে নয়াদিল্লির আগ্রহ থাকা সত্ত্বেও সফরের তারিখ এখনো চূড়ান্ত হয়নি।














Warning: Array to string conversion in /home/dkishoreganj/public_html/wp-content/plugins/gs-facebook-comments/public/class-wpfc-public.php on line 311
Array