মারিয়ায় সার ডিলার নিয়োগে অসংগতি, কাগজে প্রতিষ্ঠান ও গুদামের হদিস নেই
কিশোরগঞ্জ সদর উপজেলার মারিয়া ইউনিয়নে সার ডিলার হিসেবে অস্থায়ীভাবে নির্বাচিত ‘নূর স্যানিটারি-২’ নামে কোনো ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের অস্তিত্ব এলাকায় খুঁজে পাওয়া যায়নি। প্রতিষ্ঠানটির আবেদনে দেওয়া ট্রেড লাইসেন্সটি কিশোরগঞ্জ পৌরসভার, যেখানে ঠিকানা উল্লেখ করা হয়েছে বড়বাজার। অন্যদিকে, মারিয়া ইউনিয়ন পরিষদ থেকে প্রতিষ্ঠানটির নামে ট্রেড লাইসেন্স নেওয়া হয়েছে ডিলার হিসেবে অস্থায়ী নিয়োগের তালিকা প্রকাশের পর, গত ১৫ অক্টোবর। গুদাম ভাড়ার চুক্তিও করা হয়েছে একইভাবে নিয়োগের পর, ১৯ অক্টোবর। এসব নথি ও তথ্যের মধ্যে অসংগতি থাকায় ডিলার নিয়োগের যাচাই-বাছাই প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
গত ৭ অক্টোবর কৃষি মন্ত্রণালয়ের সার ব্যবস্থাপনা ও মনিটরিং সেলের স্মারক নম্বর ১২.০০.০০০০.০৩১.০০০০.০০৬.২৬-১৩৫ প্রকাশিত হয়। এতে কিশোরগঞ্জ জেলার পৌরসভা ও বিভিন্ন ইউনিয়নে সার ডিলার নিয়োগের তালিকা ছিল। জেলা সার ও বীজ মনিটরিং কমিটির সুপারিশ করা ব্যবসায়ীদের অস্থায়ীভাবে নিয়োগ দেওয়া হয়। জেলা কমিটির সদস্য ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বরাতে জানা যায়, উপজেলা থেকে পাঠানো তালিকায় কোনো পরিবর্তন না করেই গত ২১ সেপ্টেম্বর তা মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছিল।
এই নিয়োগ নিয়ে সারা দেশে আলোচনা-সমালোচনা শুরু হয়। গত ২৬ অক্টোবর কৃষি মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির বৈঠকে ডিলার নিয়োগে দলীয় প্রভাব, অর্থ লেনদেনসহ নানা অনিয়মের অভিযোগ ওঠে। কমিটির সভাপতি শাহাদাত হোসেন সেলিম জানান, কিছু সদস্য এ বিষয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। সুনির্দিষ্ট অভিযোগ রয়েছে—এমন এলাকায় আপাতত ডিলারশিপ স্থগিত রাখতে বলা হয়েছে। সংসদ সচিবালয়ের বিজ্ঞপ্তিতে লালমনিরহাট, বরগুনা, সাতক্ষীরা, ফরিদপুর, নওগাঁ ও যশোরের অভিযোগের বিষয়ে ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করা হয়। যেসব এলাকায় চুক্তি হয়ে গেছে, সেখানে নিরপেক্ষ তদন্ত করে দ্রুত ব্যবস্থা নিতে বলা হয়েছে। অভিযোগ খতিয়ে দেখতে মোস্তাফিজুর রহমানকে আহ্বায়ক করে তিন সদস্যের একটি কমিটিও গঠন করা হয়েছে। তবে ওই ছয় জেলার তালিকায় কিশোরগঞ্জের নাম নেই।
কৃষিমন্ত্রীর বরাতে জানা গেছে, সারা দেশে সাড়ে চার হাজারের বেশি সার ডিলার নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। ৯০ দিনের মধ্যে অনিয়মের প্রমাণ পাওয়া গেলে ডিলারশিপ বাতিল করা যাবে।
নিজস্ব অনুসন্ধানে দেখা যায়, মারিয়া ইউনিয়নে সার ডিলার হিসেবে সুপারিশ ও অস্থায়ীভাবে নির্বাচিত হয়েছে মো. সাইফুল ইসলাম মিন্টুর মালিকানাধীন ‘নূর স্যানিটারি-২’। কিন্তু এলাকায় এ নামে কোনো ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান খুঁজে পাওয়া যায়নি।
কিশোরগঞ্জ-হোসেনপুর সড়কের সিরুর দোকান এলাকায় রাস্তার দুই পাশে বীদভর জামে মসজিদের দুটি মার্কেট রয়েছে। এর একটি মারিয়া ইউনিয়নের বুরুংগারচর ৫ নম্বর ওয়ার্ডে, অন্যটি কাতিয়ারচর ৩ নম্বর ওয়ার্ডে। মার্কেট দুটির দুটি বন্ধ দোকানের সামনে ল্যামিনেট করা কাগজে ‘নূর স্যানিটারি-২’ নাম, প্রতিষ্ঠানের মালিকের নাম ও মুঠোফোন নম্বর লেখা রয়েছে।
স্থানীয়দের ভাষ্য, তদন্তের সময় এই দোকান দুটিকেই প্রতিষ্ঠানের দোকান হিসেবে দেখানো হয়েছিল। তাঁদের অভিযোগ, ‘নূর স্যানিটারি-২’-এর কোনো গুদাম না থাকায় দোকান দুটিকে গুদাম হিসেবেও দেখানো হয়েছে। গ্রামের মানুষ বিষয়টি নিয়ে সচেতন না থাকায় আগে কেউ আপত্তি জানাননি। সার ডিলার নিয়োগের বিষয়টি সামনে আসার পর এখন এ নিয়ে আলোচনা হচ্ছে।
মসজিদ কমিটির সভাপতি মানিক মিয়া জানান, ‘নূর স্যানিটারি’ বা সাইফুল ইসলাম মিন্টু নামে কেউ মসজিদের মার্কেটে দোকান ভাড়া নেননি। এ বিষয়ে কমিটির সঙ্গে কোনো আলোচনাও হয়নি। ছোট কাগজে দোকানের নাম লিখে টাঙানোয় তাঁরা তখন সন্দেহ করেননি।
প্রতিবেদকের সঙ্গে যোগাযোগ করে সাইফুল ইসলাম মিন্টু তাঁর এক আত্মীয়ের মাধ্যমে কাগজপত্র দেখান। সেসব নথিতে দেখা যায়, ‘নূর স্যানিটারি-২’ নামে মারিয়া ইউনিয়ন পরিষদ থেকে ট্রেড লাইসেন্স নেওয়া হয়েছে গত ১৫ অক্টোবর। অর্থাৎ, ৭ অক্টোবর ডিলার নিয়োগের তালিকা প্রকাশের পর। অথচ আবেদনের সময় হালনাগাদ ট্রেড লাইসেন্স থাকা বাধ্যতামূলক। একইভাবে গুদাম ভাড়ার চুক্তিনামা করা হয়েছে ১৯ অক্টোবর, সেটিও তালিকা প্রকাশের পর।
আবেদনের সময় দেওয়া ট্রেড লাইসেন্স নম্বর ১০২৯৬-০০ নিয়ে মারিয়া ইউনিয়ন পরিষদে যোগাযোগ করা হলে পরিষদ কর্তৃপক্ষ জানায়, এই নম্বরে ইউনিয়ন পরিষদ থেকে কোনো ট্রেড লাইসেন্স ইস্যু করা হয়নি। ২০২৫-২৬ অর্থবছরেও এই নামে কোনো লাইসেন্স দেওয়া হয়নি।
অন্যদিকে, কিশোরগঞ্জ পৌরসভা কার্যালয় জানায়, ট্রেড লাইসেন্স নম্বরটি তাদের। পৌরসভার নথিতে ‘নূর স্যানিটারি-২’ নামে সাইফুল ইসলাম মিন্টুর নামে লাইসেন্সটি রয়েছে। সেখানে প্রতিষ্ঠানের ঠিকানা দেওয়া হয়েছে বড়বাজার, কিশোরগঞ্জ। আর মিন্টুর স্থায়ী ঠিকানা বত্রিশ, কিশোরগঞ্জ। অর্থাৎ, নথিতে থাকা দুটি ঠিকানার কোনোটিই মারিয়া ইউনিয়নে নয়।
এসব অসংগতি নিয়ে প্রশ্ন করা হলে সাইফুল ইসলাম মিন্টু বলেন, তিনি প্রয়োজনীয় কাগজপত্র দিয়েই আবেদন করেছেন এবং নিয়োগ পেয়েছেন। এর বেশি কিছু বলতে তিনি ইচ্ছুক নন।
‘সার ডিলার নিয়োগ ও সার বিতরণ সংক্রান্ত সমন্বিত নীতিমালা’য় ডিলার নিয়োগের ক্ষেত্রে স্থানীয় বাসিন্দাদের অগ্রাধিকার দেওয়ার বিধান রয়েছে। নীতিমালা অনুযায়ী, আবেদনকারীর ট্রেড লাইসেন্স থাকতে হবে এবং নিজস্ব বা ভাড়া নেওয়া নির্দিষ্ট ধারণক্ষমতার গুদাম থাকতে হবে। নতুন ডিলারের জন্য নিজস্ব গুদাম ও সার্ভিস সেন্টারও বাধ্যতামূলক। খাদ্যদ্রব্য, রেস্তোরাঁ বা সবজির দোকানের সঙ্গে একই গুদামে সার সংরক্ষণ করা যাবে না।
নীতিমালা অনুযায়ী, উপজেলা ও জেলা পর্যায়ে যাচাই-বাছাইয়ের পর কেন্দ্রীয় ব্যবস্থাপনা কমিটি চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয়। অভিযোগ প্রমাণিত হলে ডিলারশিপ বাতিলেরও বিধান রয়েছে। এ অবস্থায় ট্রেড লাইসেন্স ও গুদামের শর্ত পূরণ না করা প্রতিষ্ঠানের সুপারিশ এবং যাচাই-বাছাইয়ের ধাপ পেরিয়ে অস্থায়ী নিয়োগ পাওয়ার বিষয়টি কীভাবে সম্ভব হলো, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
বিষয়টি জানতে চাইলে কিশোরগঞ্জ সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. কামরুল হাসান মারুফ জানান, উপজেলা যাচাই-বাছাই কমিটির সভাপতি হিসেবে তিনি উপজেলা কৃষি কর্মকর্তার নেতৃত্বে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করে দিয়েছিলেন। বিস্তারিত জানতে তিনি কৃষি কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলার পরামর্শ দেন।
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা জয়নুল আলম তালুকদার বলেন, সার ডিলার নিয়োগের প্রক্রিয়ায় তাঁরা একেবারে তৃণমূল পর্যায়ে কাজ করেন। তদন্ত করে কাগজপত্র যাচাইয়ের পর তাঁরা তা উপজেলা কমিটির কাছে হস্তান্তর করেন। পরে উপজেলা ও জেলা পর্যায়ের প্রক্রিয়া শেষে তালিকা মন্ত্রণালয়ে অনুমোদনের জন্য পাঠানো হয়। ‘নূর স্যানিটারি-২’-এর তদন্ত ও নথির অসংগতি সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে চাইলে তিনি বিষয়টিকে ‘অতি গোপনীয়’ বলে এড়িয়ে যান। এ বিষয়ে ইউএনও বা ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলতে বলেন।
অনুসন্ধানে দেখা যায়, এক কর্মকর্তা অন্য কর্মকর্তার দিকে ইঙ্গিত করলেও কেউ বিষয়টির স্পষ্ট ব্যাখ্যা দেননি। অফিস সময়ে জেলা কমিটির সভাপতি ও জেলা প্রশাসকের সঙ্গে সাক্ষাৎ করা সম্ভব হয়নি।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে উপজেলা কমিটির একাধিক সদস্য জানান, কমিটির বৈঠকে সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় উপদেষ্টা হিসেবে স্থানীয় সংসদ সদস্য বা তাঁর প্রতিনিধি অর্থাৎ ব্যক্তিগত সহকারী- প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে উপস্থিত থাকেন। তাঁদের উপস্থিতিতেই তালিকা তৈরি করে জেলা কমিটির কাছে পাঠানো হয়। তালিকা তৈরিতে সংসদ সদস্য বা তাঁর প্রতিনিধির কোনো প্রভাব ছিল কি না, জানতে চাইলে তাঁরা কেউ এ বিষয়ে কথা বলতে রাজি হননি।
স্থানীয় সংসদ সদস্য মাজহারুল ইসলাম দেশের বাইরে থাকায় তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি। তাঁর ব্যক্তিগত সহকারী মোশারফ মুঠোফোনে উপদেষ্টা হিসেবে সংসদ সদস্য বা তাঁর প্রতিনিধির উপস্থিতির বিষয়টি নিশ্চিত করেন। তবে তালিকা তৈরিতে তাঁদের প্রভাব ছিল কি না, সে প্রশ্ন এড়িয়ে যান তিনি। মোশারফ বলেন, কোনো অনিয়ম থাকলে অভিযোগ করা উচিত। পুনঃতদন্ত হলে বিষয়টি অবশ্যই সংশোধন করা হবে।
উল্লেখ্য, প্রকাশ্যে সংসদ সদস্য বা তাঁর প্রতিনিধিকে কেউ কোনো অনিয়মে অভিযুক্ত করেননি। তবে তালিকা প্রণয়নে তাঁদের ভূমিকা কতটুকু ছিল, তা স্পষ্ট নয়। সরকারি কর্মকর্তাদের এ বিষয়ে স্পষ্টভাবে মুখ না খোলা, পরিচয় গোপন রাখার শর্তে কথা বলা এবং অনিয়মের বিষয়ে সরাসরি প্রশ্নের জবাব না দেওয়ার প্রবণতা নানা প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। অন্যদিকে, ডিলারশিপ না পাওয়া একাধিক ব্যক্তির সঙ্গে কথা বলে নিয়োগপ্রক্রিয়ায় বড় ধরনের আর্থিক লেনদেনের অভিযোগ ও সন্দেহের কথাও জানা গেছে। তবে এসব অভিযোগের পক্ষে সুনির্দিষ্ট প্রমাণ পাওয়া যায়নি। ফলে বিষয়টি এখনো সন্দেহ ও অভিযোগের পর্যায়েই রয়েছে।
সচেতন নাগরিক, কৃষি ও কৃষকসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের অনেকে মৌখিকভাবে সার ডিলার নিয়োগে অনিয়ম, আর্থিক লেনদেন ও স্বজনপ্রীতির অভিযোগ করেছেন। কিশোরগঞ্জ পৌরসভা ও কটিয়াদীর একটি ইউনিয়নে ডিলার নিয়োগে অনিয়মের খবর ইতিমধ্যে বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে।
মারিয়া ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি হাজী আবুল কাশেম বলেন, ইউনিয়নের প্রকৃত ব্যবসায়ীরা ডিলারশিপ পেলে কৃষকেরা উপকৃত হবেন এবং প্রকৃত সেবা নিশ্চিত হবে। তাঁর ভাষ্য, বাইরে থেকে আসা কোনো ব্যবসায়ী ভুল তথ্য দিয়ে, প্রতারণা বা অসদুপায় অবলম্বন করে ডিলারশিপ পেলে তিনি জনগণের উপকার করবেন না; বরং মুনাফালোভী ব্যবসায়ী হিসেবে কাজ করবেন।
সংসদীয় কমিটির উল্লেখ করা ছয় জেলার মতো কিশোরগঞ্জ জেলাতেও সার ডিলার নিয়োগ নিয়ে নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি উঠেছে। স্থানীয় সচেতন মহলের বক্তব্য, একের পর এক অসংগতি সামনে আসা এবং দায়িত্বশীল কর্মকর্তাদের স্পষ্ট ব্যাখ্যা না দেওয়ার পর স্বচ্ছ তদন্ত ছাড়া এসব প্রশ্নের সমাধান সম্ভব নয়। তাঁদের দাবি, লোকদেখানো বা নামমাত্র তদন্ত নয়; বরং তদন্তের ফলাফল ও সে অনুযায়ী গৃহীত পরিবর্তন বা ব্যবস্থা জনসমক্ষে প্রকাশ করতে হবে। যোগ্য, সৎ ও প্রকৃত স্থানীয় ব্যবসায়ীদের ডিলার হিসেবে নিয়োগ দিয়ে জেলার প্রতিটি ইউনিটে সার বিতরণসেবা নিশ্চিত করা হবে- এমন প্রত্যাশা সকলের।







Disqus comments are not configured yet.