কটিয়াদীতে ভাতিজাকে কুপিয়ে হত্যার অভিযোগ চাচার বিরুদ্ধে
বাঁচার আকুতি ছিল চোখে, সাহায্যের হাত বাড়ায়নি কেউ
রক্তাক্ত একটি নিথর দেহ পড়ে ছিল মাঠে। কণ্ঠে ছিল বাঁচার আকুতি, অথচ ধীরে ধীরে নিস্তেজ হয়ে আসছিল শরীর। আশপাশে দাঁড়িয়ে এমন দৃশ্য দেখছিলেন স্থানীয় লোকজন। কেউ মোবাইলে ভিডিও করছিলেন, কেউ দূরত্ব বজায় রেখে তাকিয়ে ছিলেন পৈশাচিক সেই ঘটনার দিকে। কিন্তু জীবন বাঁচাতে এগিয়ে আসেননি কেউ। মানবিকতার ভাষা যেন মুহূর্তেই স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিল। এমনকি জরুরি সেবা ৯৯৯-এ ফোন করেও পুলিশকে খবর দেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ উঠেছে। দীর্ঘ সময় রক্তাক্ত অবস্থায় পড়ে থাকার পর একসময় নিথর দেহটির নড়াচড়া থেমে যায়। পরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে হৃদয়বিদারক সেই ঘটনার ভিডিও।
ঘটনাটি ঘটেছে কিশোরগঞ্জের কটিয়াদী উপজেলার লোহাজুরী ইউনিয়নের ১ নম্বর ওয়ার্ডের পূর্বচর পাড়াতলা এলাকায়। সেখানে ভাতিজা আনোয়ার হোসেনকে (৩৫) কুপিয়ে হত্যার অভিযোগ উঠেছে তার আপন চাচা মরম আলীর বিরুদ্ধে।
নিহত আনোয়ার হোসেন একই গ্রামের মৃত সাফি উদ্দিনের ছেলে। অভিযুক্ত মরম আলী আব্দুল হেকিমের ছেলে। সম্পর্কে তারা চাচা-ভাতিজা।
এ ঘটনায় নিহতের মা শিরিনা আক্তার বাদী হয়ে শুক্রবার রাতে কটিয়াদী মডেল থানা-এ একটি হত্যা মামলা দায়ের করেছেন। মামলায় অভিযুক্ত চাচা মরম আলীসহ ৯ জনের নাম উল্লেখ করা হয়েছে। পাশাপাশি অজ্ঞাতনামা আরও কয়েকজনকে আসামি করা হয়েছে।
শনিবার সকালে মামলার বিষয়টি নিশ্চিত করেন কটিয়াদী মডেল থানার ওসি (তদন্ত) মো. শ্যামল মিয়া।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, দীর্ঘদিন ধরে আনোয়ার হোসেনের সঙ্গে তার চাচা মরম আলীর জমিজমা সংক্রান্ত বিরোধ চলছিল। বিষয়টি নিয়ে এলাকায় একাধিকবার সালিস-দরবার হলেও কোনো স্থায়ী সমাধান হয়নি। বরং সময়ের সঙ্গে বিরোধ আরও তীব্র হয়ে ওঠে। সম্প্রতি তুচ্ছ ঘটনাকে কেন্দ্র করে দুই পক্ষের মধ্যে নতুন করে উত্তেজনা সৃষ্টি হয়।
শুক্রবার বিকেলে স্থানীয় পূর্বচর পাড়াতলা উচ্চ বিদ্যালয়ের সিঁড়ির সামনের মাঠে আনোয়ার হোসেনকে রক্তাক্ত অবস্থায় পড়ে থাকতে দেখেন স্থানীয়রা।
স্থানীয়দের দাবি, ঘটনার পর অভিযুক্ত মরম আলী ও তার ছেলেদের ভয়ে কেউ আহত আনোয়ারের কাছে যাওয়ার সাহস পাননি। দীর্ঘ সময় তিনি মাঠে পড়ে ছিলেন। তখনও তিনি জীবিত ছিলেন এবং ছটফট করছিলেন। সন্ধ্যার আগমুহূর্তে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে আনোয়ার হোসেনকে মৃত অবস্থায় দেখতে পায়। পরে সুরতহাল প্রতিবেদন শেষে মরদেহ থানায় নিয়ে যাওয়া হয়। ঘটনার পর থেকেই অভিযুক্তরা আত্মগোপনে রয়েছেন।
নিহতের মা শিরিনা আক্তার অভিযোগ করে বলেন, “আমি দুপুরে বাড়িতে ছিলাম না। সেই সুযোগে মরম আলী ও তার লোকজন আমাদের বাড়িতে ঢুকে বসতঘর ভাঙচুর করে। পরে আমার ছেলে আনোয়ারকে ধারালো অস্ত্র দিয়ে কুপিয়ে গুরুতর আহত করে। এরপর তাকে অবরুদ্ধ করে রাখা হয়। একপর্যায়ে স্কুলের বারান্দায় ফেলে রেখে মৃত্যু নিশ্চিত করা হয়। দীর্ঘ সময় তারা সেখানে অবস্থান করে কাউকে কাছে আসতে দেয়নি। আমার ছেলেকে পরিকল্পিতভাবে হত্যা করা হয়েছে। আমি এ ঘটনার বিচার চাই।”
তিনি আরও বলেন, তার ছোট ছেলে বিদেশে থাকেন এবং তাকেও হত্যার হুমকি দেওয়া হয়েছে।
নিহতের বোন সালমা আক্তার বলেন, “বাড়ি ফাঁকা পেয়ে পূর্বপরিকল্পিতভাবে আমার ভাইকে হত্যা করা হয়েছে। তাকে তিলে তিলে কষ্ট দিয়ে মারা হয়েছে। আমরা এই হত্যাকাণ্ডের বিচার চাই।”
স্থানীয় ইউপি সদস্য আব্দুল বাতেন বলেন, “মরম আলী ও আনোয়ার হোসেনের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে জমিজমা নিয়ে বিরোধ চলছিল। বিষয়টি নিয়ে আমি একাধিকবার সালিস করেছি। এর আগেও আনোয়ারকে মারধর করে গুরুতর আহত করা হয়েছিল। তখন তাকে উদ্ধার করে চিকিৎসার ব্যবস্থা করা হয়েছিল। এবারও যদি আগে জানতে পারতাম, তাহলে দ্রুত চিকিৎসার ব্যবস্থা করা যেত।”
নিহতের ছোট ভাই প্রবাসী সজল বলেন, “পরিকল্পিতভাবেই আমার ভাইকে হত্যা করা হয়েছে। শরীরের বিভিন্ন স্থানে ধারালো অস্ত্রের আঘাতের চিহ্ন রয়েছে। দুই পায়ের রগ পর্যন্ত কেটে ফেলা হয়েছে। অনেক কষ্টে তার মৃত্যু হয়েছে।”
তবে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক স্থানীয় একাধিক ব্যক্তি জানান, নিহত আনোয়ারের বিরুদ্ধে মাদক সেবন ও চুরিসহ নানা অভিযোগ ছিল। এ কারণে এলাকাবাসীর মধ্যে তার প্রতি বিরূপ মনোভাব ছিল। যদিও তারা এ ধরনের নৃশংস হত্যাকাণ্ডের সুষ্ঠু বিচার দাবি করেছেন।
কটিয়াদী মডেল থানার ওসি (তদন্ত) মো. শ্যামল মিয়া বলেন, “মরদেহ ময়নাতদন্তের জন্য কিশোরগঞ্জ সদর মর্গে পাঠানো হয়েছে। নিহতের মা বাদী হয়ে একটি হত্যা মামলা দায়ের করেছেন। ঘটনাটি গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করা হচ্ছে। জড়িতদের দ্রুত আইনের আওতায় আনা হবে।”










