ভাইভার অপেক্ষায় উত্তীর্ণরা, এরই মধ্যে পরীক্ষা বাতিলের ইঙ্গিত শিক্ষামন্ত্রীর
বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রতিষ্ঠানপ্রধান ও সহকারী প্রধান নিয়োগে দেশের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো অনুষ্ঠিত কেন্দ্রীয় পরীক্ষার ফল প্রকাশের প্রায় দেড় মাস পর জালিয়াতি ও অনিয়মের অভিযোগে নতুন করে অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে। অভিযোগের সত্যতা মিললে পুরো পরীক্ষা বাতিল করে পুনরায় আয়োজন করা হতে পারে বলে ইঙ্গিত দিয়েছেন শিক্ষা এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন।
এর ফলে নিয়োগ প্রক্রিয়ার শেষ ধাপে এসে অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছেন পরীক্ষায় উত্তীর্ণ ১৪ হাজার ৯৪২ জন প্রার্থী, যারা বর্তমানে মৌখিক পরীক্ষার (ভাইভা) অপেক্ষায় রয়েছেন। ফল প্রকাশের দীর্ঘ সময় পর হঠাৎ করে পরীক্ষা বাতিলের সম্ভাবনা সামনে আসায় তাদের মধ্যে উদ্বেগ ও হতাশা বাড়ছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, দীর্ঘদিনের বিতর্কিত নিয়োগ ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে প্রথমবারের মতো প্রতিষ্ঠানপ্রধান ও সহকারী প্রধান নিয়োগকে বেসরকারি শিক্ষক নিবন্ধন ও প্রত্যয়ন কর্তৃপক্ষের (এনটিআরসিএ) আওতায় আনা হয়। এর আগে এসব পদে নিয়োগ দিত সংশ্লিষ্ট শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পরিচালনা কমিটি বা গভর্নিং বডি। সে ব্যবস্থাকে কেন্দ্র করে বছরের পর বছর নিয়োগ বাণিজ্য, স্বজনপ্রীতি, রাজনৈতিক প্রভাব ও আর্থিক লেনদেনের অভিযোগ ছিল।
এই বাস্তবতায় কেন্দ্রীয় নিয়োগ পরীক্ষাকে শিক্ষা খাতে একটি বড় সংস্কার উদ্যোগ হিসেবে দেখা হচ্ছিল। কিন্তু প্রথমবারের এই পরীক্ষাই এখন জালিয়াতি ও অনিয়মের অভিযোগে প্রশ্নের মুখে পড়েছে।
গত ১৮ এপ্রিল ঢাকার নয়টি কেন্দ্রে এমসিকিউ পদ্ধতিতে পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়। ১২ হাজার ৯৫১টি শূন্যপদের বিপরীতে পরীক্ষায় অংশ নেন ৪৮ হাজার ১৪৬ জন প্রার্থী। পরীক্ষার চার দিন পর, ২২ এপ্রিল ফল প্রকাশ করা হলে ১৪ হাজার ৯৪২ জন উত্তীর্ণ হন।
ফল প্রকাশের সময় জানানো হয়েছিল, পরবর্তীতে মৌখিক পরীক্ষার সময়সূচি ঘোষণা করা হবে। তবে প্রায় দেড় মাস পার হলেও ভাইভার কোনো সূচি প্রকাশ করা হয়নি।
এমন অবস্থায় সম্প্রতি এক বেসরকারি টেলিভিশনকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে শিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন বলেন, প্রতিষ্ঠানপ্রধান ও সহকারী প্রধান নিয়োগ পরীক্ষায় বিভিন্ন মহল থেকে অনিয়ম ও জালিয়াতির অভিযোগ পাওয়া গেছে। এসব অভিযোগ তদন্তে একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে।
তিনি বলেন, “তদন্তে কোনো ধরনের ত্রুটি বা অনিয়ম প্রমাণিত হলে পুরো পরীক্ষাই বাতিল করা হবে।”
শিক্ষামন্ত্রীর এই বক্তব্য প্রকাশ্যে আসার পর দেশজুড়ে উত্তীর্ণ প্রার্থীদের মধ্যে ব্যাপক উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। কারণ, দীর্ঘ প্রস্তুতি, আবেদন প্রক্রিয়া ও প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার ধাপ অতিক্রম করে তারা এখন নিয়োগের চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছেছেন।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক উত্তীর্ণ প্রার্থী বলেন, সরকার নির্ধারিত নিয়ম অনুযায়ী আবেদন করে তারা কঠোর প্রতিযোগিতার মধ্য দিয়ে উত্তীর্ণ হয়েছেন। এখন যদি পুরো পরীক্ষা বাতিল করা হয়, তবে তা হাজারো মেধাবী ও সৎ প্রার্থীর জন্য চরম হতাশার কারণ হবে।
প্রার্থীদের অনেকেই জানতে চাইছেন, কী ধরনের জালিয়াতি বা অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে, কতজনের বিরুদ্ধে অভিযোগ রয়েছে এবং তদন্ত কোন পর্যায়ে রয়েছে— এসব বিষয়ে এখন পর্যন্ত কোনো বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করা হয়নি কেন।
এদিকে, নিয়োগ কার্যক্রম পরিচালনাকারী এনটিআরসিএও বিষয়টি নিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো ব্যাখ্যা দেয়নি। সংস্থাটির সচিব এ এম এম রিজওয়ানুল হক জানিয়েছেন, মৌখিক পরীক্ষার বিষয়ে এখনো কোনো নতুন সিদ্ধান্ত হয়নি।
আরও জানা গেছে, গত ২৬ এপ্রিল নতুন চেয়ারম্যান নিয়োগের প্রজ্ঞাপন জারি হলেও তিনি এখনো দায়িত্ব গ্রহণ করেননি। ফলে এনটিআরসিএতে প্রশাসনিক শূন্যতা ও সিদ্ধান্তহীনতা তৈরি হয়েছে। বর্তমানে পরীক্ষা মূল্যায়ন ও প্রত্যয়ন সদস্য মুহাম্মদ নূরে আলম সিদ্দিকী অতিরিক্ত দায়িত্বে চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করছেন।
শিক্ষা সংশ্লিষ্টদের মতে, প্রতিষ্ঠানপ্রধান নিয়োগকে কেন্দ্রীয় ব্যবস্থার আওতায় আনার মূল উদ্দেশ্য ছিল স্বচ্ছতা ও মেধাভিত্তিক নিয়োগ নিশ্চিত করা। কিন্তু প্রথম পরীক্ষাটিকেই ঘিরে যদি অনিয়মের অভিযোগ ওঠে এবং পুরো প্রক্রিয়া অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়ে, তবে তা শুধু প্রার্থীদের নয়, নতুন নিয়োগ ব্যবস্থার বিশ্বাসযোগ্যতাকেও প্রশ্নের মুখে ফেলবে।
এখন তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনের দিকেই তাকিয়ে আছেন প্রায় ১৫ হাজার উত্তীর্ণ প্রার্থী। তাদের প্রত্যাশা, প্রকৃত সত্য উদঘাটন করে দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে এবং নির্দোষ প্রার্থীরা যেন কোনোভাবেই ক্ষতিগ্রস্ত না হন, সে বিষয়টি নিশ্চিত করা হবে।







