আটক আসামিকে ছেড়ে দেওয়া নিয়ে প্রশ্ন, স্বাক্ষরহীন রি-কল দেখাল ভৈরব থানা
কিশোরগঞ্জের ভৈরব থানায় ইমিগ্রেশন পুলিশের হাতে আটক এক আসামিকে ছেড়ে দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মো. মাহবুবুর রহমানের বিরুদ্ধে। সোমবার (৫ অক্টোবর) দিবাগত রাত আনুমানিক ১২টার দিকে আরিয়ান খুলুদ নামের ওই আসামিকে ছেড়ে দেওয়া হয় বলে অভিযোগ রয়েছে।
তবে ওসি মাহবুবুর রহমানের দাবি, আসামির পক্ষে আদালতের আদেশের রি-কল থাকায় তাকে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। যদিও ওসির দাবিকৃত রি-কলে কিশোরগঞ্জের সিনিয়র জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট বিশ্বজিৎ চক্রবর্তীর নাম থাকলেও তাঁর স্বাক্ষর না থাকায় রি-কলটি আসল নাকি নকল, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। বিষয়টি তদন্ত করে জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন সচেতন মহলের লোকজন।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ভৈরব থানার মামলা নম্বর-৩৯ (৩) ২০২৬ এবং সি.আর. মোকদ্দমা নম্বর-৩৯/২০২৬-এর আসামি আরিয়ান খুলুদ। মামলাটির ধারাগুলো হলো- দণ্ডবিধির ১৪৩/৪৪৮/৩২৩/৩০৭/৩৮৪/৪২৭/৪৪৭/৫০৬(১)/৫০০/৩৪ এবং ৭/৩০ বিশেষ ক্ষমতা আইন। তাঁর বিরুদ্ধে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর ইমিগ্রেশন পুলিশের কাছে দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা ছিল বলে জানা গেছে।
সোমবার পর্তুগালের উদ্দেশ্যে বিদেশে যাওয়ার সময় ইমিগ্রেশন পুলিশ আরিয়ান খুলুদকে আটক করে ভৈরব থানা পুলিশকে বিষয়টি জানায়। পরে সোমবার বেলা ১১টার দিকে ভৈরব থানার উপপরিদর্শক (এসআই) শক্তি পদ মৃধা বিমানবন্দর ইমিগ্রেশন পুলিশের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। এরপর বেলা ২টার দিকে আরিয়ান খুলুদকে ভৈরব থানায় নিয়ে আসা হয়।
অভিযোগ রয়েছে, আসামিকে ছাড়িয়ে নিতে ওইদিন বিকেল থেকে রাত পর্যন্ত একটি প্রভাবশালী মহল ওসি মাহবুবুর রহমানের সঙ্গে যোগাযোগ করে। পরে মোটা অঙ্কের টাকার বিনিময়ে গভীর রাতে থানা থেকে আরিয়ান খুলুদকে ছেড়ে দেওয়া হয় বলে অভিযোগ করা হয়েছে।
উল্লেখ্য, শহরের ভৈরবপুর উত্তরপাড়ার মৃত বশির মিয়ার ছেলে আরিয়ান খুলুদের বিরুদ্ধে চারটি মামলা রয়েছে বলে জানা গেছে। একটি সূত্র জানায়, চারটি মামলার মধ্যে একটি মামলায় তিনি খালাস পেয়েছেন।
অভিযোগে বলা হয়েছে, ৩৭(১)২০২৬ নম্বর মামলায় আসামি আরিয়ান খুলুদ গত ৩ মে ২০২৬ আদালতে হাজির হলে কিশোরগঞ্জ দায়রা ও জজ আদালতের বিচারকের আদেশে জামিনে মুক্তি পান। দীর্ঘদিন অর্থাৎ প্রায় পাঁচ মাস পেরিয়ে গেলেও ওই রি-কল ভৈরব থানায় জমা হয়নি বলে দাবি করা হয়েছে।
সোমবার দুপুরে ইমিগ্রেশন পুলিশ এসআই শক্তি পদ মৃধার কাছে আরিয়ান খুলুদকে হস্তান্তর করার পর তাঁকে ভৈরব থানায় নেওয়া হয়। পরে ওইদিন রাতে কিশোরগঞ্জের সিনিয়র জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট বিশ্বজিৎ চক্রবর্তীর স্বাক্ষরবিহীন একটি রি-কল দেখিয়ে তাঁকে ছেড়ে দেওয়া হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। স্বাক্ষরবিহীন ওই রি-কলের কপি গোয়েন্দা সংস্থা ও সাংবাদিকরা ভৈরব থানা পুলিশের কাছ থেকে সংগ্রহ করেছেন বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে।
রি-কলের বিষয়ে কিশোরগঞ্জ জেলা পুলিশ সুপার মিজানুর রহমান শৈলীর সঙ্গে কথা হলে তিনি ওসিকে ফোন করে স্বাক্ষরযুক্ত রি-কল পাঠাতে বলেন। তবে দীর্ঘক্ষণ পর ওসি মাহবুবুর রহমানের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলেও তিনি স্বাক্ষরযুক্ত রি-কল পাঠাতে পারেননি বলে জানা গেছে।
ভৈরব থানার এসআই শক্তি পদ মৃধা বলেন, “আরিয়ান খুলুদ পর্তুগালের উদ্দেশ্যে ইমিগ্রেশন পার হওয়ার সময় ইমিগ্রেশন পুলিশ তাকে আটক করে। বাড়িঘর ভাঙচুর ও লুটপাটের ঘটনায় হওয়া মামলার বাদী তাহমিনা বেগম ইমিগ্রেশন পুলিশকে বিষয়টি অবগত করলে তারা আসামির পাসপোর্ট ব্লক করে দেয়।”
তিনি বলেন, “সোমবার বেলা ১১টায় ইমিগ্রেশন পুলিশের কাছ থেকে খুলুদকে নিয়ে দুপুরে থানায় আসি। এই মামলার রি-কল থানায় জমা ছিল না। গতকাল রাতে রি-কলটি থানায় জমা দেওয়া হলে ওসি স্যার তা যাচাই-বাছাই করেন। যেহেতু যাচাই-বাছাই করে রি-কলটি সঠিক হওয়ায় এসপি স্যারের নির্দেশে তাকে রাতে ছেড়ে দেওয়া হয়।”
এসআই শক্তি পদ মৃধা আরও বলেন, “তার নামে চারটি মামলা রয়েছে, এর মধ্যে একটি মামলায় আদালত থেকে খালাস পেয়েছে। বাসস্ট্যান্ডের বিভিন্ন মারামারি মামলা ছিল তার বিরুদ্ধে। সে কোনো আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত নয়। বিদেশে যেহেতু চলে যাবে, এখানে একটি সুযোগ পেয়েছে।”
আসামিকে ছেড়ে দেওয়ার ঘটনায় মোটা অঙ্কের টাকা লেনদেন হয়েছে কি না জানতে চাইলে তিনি তা অস্বীকার করেন।
এ বিষয়ে ভৈরব থানার ওসি মো. মাহবুবুর রহমান বলেন, “পাসপোর্ট লক থাকায় ইমিগ্রেশন পুলিশ তাকে আটক করে। এর আগে থানা থেকে আবেদন দেওয়ার পর কোর্ট থেকে পাসপোর্টটি লক করা হয়। ইমিগ্রেশন পুলিশের কাছ থেকে আটক হওয়া আসামি আরিয়ান খুলুদকে ভৈরব থানায় নিয়ে এসে যাচাই-বাছাই করে দেখলাম, তার বিরুদ্ধে কোনো কিছু নেই, কোনো মামলাও নেই, ওয়ারেন্টও নেই। যার জন্য খুলুদকে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে।”
রি-কলের কপিতে বিচারকের স্বাক্ষর না থাকার বিষয়ে জানতে চাইলে ওসি বলেন, “রি-কলটি আমার কাছে আগে থেকেই আছে। আমি তো কোর্ট থেকে খবর নিয়েছি, সে জামিনে আছে।”
এ বিষয়ে কিশোরগঞ্জ জেলা পুলিশ সুপার মিজানুর রহমানের সঙ্গে মুঠোফোনে কথা হলে তিনি বলেন, “আমরা কোর্ট থেকে অরিজিনালটি আনছি। ফোনে যাচাই-বাছাই করেছি, রি-কলটি সঠিক আছে। তার বিরুদ্ধে চারটি মামলা আছে, চারটিতেই জামিনে আছে।”
তিনি আরও বলেন, “আপনি চাইলে রি-কলের কপিটি আপনাকে দিতে পারি। ইমিগ্রেশনে যে লক থাকে, সেটি খোলেনি। আবেদন দিলে ব্লকটি খুলে দেবে। রাতেই কনফার্ম হয়েছি, সবগুলোতে জামিনে আছে। আপনারা যেটা পেয়েছেন, সেই কাগজ কে দিয়েছে, আমি জানি না। মূলত সই ছাড়া- এটা তো তথ্য। সই ছাড়া রি-কল হয় না। অনেক সময় ফোনে নিয়ে নেয় না, সেটাই হয়েছে মনে হয়। ওসিকে বলে দিচ্ছি, সইযুক্ত কপিটি যেন আপনাকে পাঠায়।”











Warning: Array to string conversion in /home/dkishoreganj/public_html/wp-content/plugins/gs-facebook-comments/public/class-wpfc-public.php on line 311
Array