চাঁদা দাবির অভিযোগে তোলপাড় ভৈরব, সংবাদ সম্মেলনের পরই আটক নেতা
কিশোরগঞ্জের ভৈরবে প্রশাসনের নাম ভাঙিয়ে এক নারীর কাছে ৫ লাখ টাকা চাঁদা দাবির অভিযোগে পৌরসভার ৩ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির সভাপতি ওমর মোহাম্মদ অপু (৩৬)কে গ্রেপ্তার করেছে জেলা গোয়েন্দা (ডিবি) পুলিশ। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হওয়া একটি অডিও কল রেকর্ডকে কেন্দ্র করে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনার মধ্যেই তিনি নিজেকে নির্দোষ দাবি করে সংবাদ সম্মেলন করেন। তবে সেই সংবাদ সম্মেলনের প্রায় এক ঘণ্টার মধ্যেই তাকে গ্রেপ্তার করা হয়।
শুক্রবার (৫ জুন) সন্ধ্যায় ভৈরব থানা পুলিশ ও ডিবি পুলিশের যৌথ অভিযানে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন ভৈরব থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আতাউর রহমান আকন্দ।
গ্রেপ্তারকৃত ওমর মোহাম্মদ অপু পৌর শহরের পঞ্চবটি পুকুরপাড় এলাকার মোমতাজ হকের ছেলে। তিনি দীর্ঘদিন ধরে স্থানীয় রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত এবং পৌর বিএনপির ৩ নম্বর ওয়ার্ডের সভাপতির দায়িত্ব পালন করে আসছিলেন।
পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, গত এক সপ্তাহ ধরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি অডিও কল রেকর্ড নিয়ে ভৈরবজুড়ে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়। অডিওটিতে এক নারীর কাছে ৫ লাখ টাকা দাবি করতে শোনা যায় একজন ব্যক্তিকে। কথোপকথনের একপর্যায়ে তিনি দাবি করেন, ওই অর্থের একটি অংশ এলাকার কিছু যুবক এবং প্রশাসনকে দিতে হবে।
ভাইরাল অডিওকে কেন্দ্র করে স্থানীয় জনমনে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়। বিষয়টি রাজনৈতিক অঙ্গনেও আলোচনার জন্ম দেয়। অনেকেই অভিযোগের সুষ্ঠু তদন্ত এবং জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানান।
অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে বৃহস্পতিবার বিকেল ৫টার দিকে ৩ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করেন ওমর মোহাম্মদ অপু। সেখানে লিখিত বক্তব্যে তিনি দাবি করেন, একটি কুচক্রী মহল পরিকল্পিতভাবে তার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করছে।
তিনি বলেন, আধুনিক প্রযুক্তি ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ব্যবহার করে তার কণ্ঠস্বর নকল করে একটি ভুয়া অডিও তৈরি করা হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তা ছড়িয়ে দিয়ে তার রাজনৈতিক ও সামাজিক ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করার চেষ্টা চলছে। এলাকায় মাদকবিরোধী কর্মকাণ্ড পরিচালনা করায় একটি মহল ক্ষুব্ধ হয়ে তাকে হেয়প্রতিপন্ন করার অপচেষ্টা চালাচ্ছে বলেও তিনি দাবি করেন।
তবে সংবাদ সম্মেলনের কিছু সময় পরই ডিবি পুলিশ অভিযান চালিয়ে তাকে গ্রেপ্তার করে। এতে ঘটনাটি নতুন মাত্রা পায় এবং এলাকায় ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়।
মামলার বাদী পপি বেগম অভিযোগ করেন, তিনি কোনো ধরনের মাদক ব্যবসার সঙ্গে জড়িত নন। তা সত্ত্বেও এলাকায় বসবাস করতে হলে তাকে ৫ লাখ টাকা দিতে হবে বলে চাপ প্রয়োগ করা হয়। চাঁদার টাকা না দিলে তাকে এলাকা ছাড়তে বাধ্য করা হবে এবং বাড়িঘর বিক্রি করে অন্যত্র চলে যেতে বলা হয়। এমনকি টাকা না দিলে তার বাড়িতে তালা ঝুলিয়ে দেওয়ারও হুমকি দেওয়া হয় বলে তিনি অভিযোগ করেন।
নিজের নিরাপত্তা ও ন্যায়বিচারের স্বার্থে তিনি থানায় লিখিত অভিযোগ দায়ের করেন। সেই অভিযোগের ভিত্তিতে পুলিশ তদন্ত শুরু করে।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর একটি সূত্র জানিয়েছে, প্রাথমিক তদন্তে চাঁদা দাবির অভিযোগের কিছু সত্যতা পাওয়া গেছে। তবে বিষয়টি নিয়ে আরও তদন্ত চলছে।
ঘটনাটি ভৈরবের রাজনৈতিক ও সামাজিক অঙ্গনে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। একদিকে সংবাদ সম্মেলনে নিজেকে নির্দোষ দাবি, অন্যদিকে অল্প সময়ের ব্যবধানে গ্রেপ্তার— পুরো ঘটনাকে ঘিরে সাধারণ মানুষের মধ্যে নানা আলোচনা চলছে।
স্থানীয় সচেতন মহল বলছে, অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত সত্য উদঘাটন করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে রাজনৈতিক পরিচয় ব্যবহার করে কেউ যাতে চাঁদাবাজি বা অন্য কোনো অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করতে না পারে, সে বিষয়েও কঠোর নজরদারি প্রয়োজন।
ভৈরব থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আতাউর রহমান আকন্দ বলেন, “ভুক্তভোগী নারী পপি বেগম বাদী হয়ে থানায় মামলা দায়ের করেছেন। অভিযোগের ভিত্তিতে ওমর মোহাম্মদ অপুকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। চাঁদা দাবি করার ক্ষেত্রে প্রশাসনের নাম ব্যবহার করার অভিযোগও পাওয়া গেছে। বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করা হচ্ছে। কোনো ব্যক্তি রাজনৈতিক পরিচয় বা প্রভাব খাটিয়ে আইনের ঊর্ধ্বে থাকতে পারবেন না। অপরাধ প্রমাণিত হলে তার বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
তিনি আরও জানান, গ্রেপ্তারকৃতকে আদালতে সোপর্দের প্রস্তুতি চলছে এবং মামলার তদন্ত অব্যাহত রয়েছে।










