বিষ প্রয়োগে হাওরে মাছ নিধন, দিশেহারা ফিশারির মালিক
কিশোরগঞ্জের নিকলী হাওরে পূর্বশত্রুতার জেরে একটি ফিশারিতে কীটনাশক প্রয়োগ করে মাছ নিধনের অভিযোগ উঠেছে। গত রোববার দিবাগত রাতে উপজেলার কারপাশা ইউনিয়নের বড় হাওরের বাড়িয়াল বিল এলাকায় এ ঘটনা ঘটে। এ সময় মাছ নিধনের ঘটনা দেখে ফেলায় আব্দুর রশিদ (৩০) নামে এক যুবককে মারধর করা হয়েছে বলেও অভিযোগ পাওয়া গেছে। এতে তাঁর ডান হাতের হাড় ভেঙে গেছে বলে জানিয়েছেন স্বজনেরা। এ ঘটনায় মাছ চাষের জন্য বিনিয়োগ করা পুঁজি হারিয়ে দিশেহারা হয়ে পড়েছেন ফিশারির মালিক মো. আবু সালেহ ও তাঁর পরিবারের সদস্যরা।
স্থানীয় বাসিন্দা ও মৎস্য আহরণকারীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বর্ষা মৌসুমে হাওরের বিস্তীর্ণ এলাকা পানিতে ডুবে গেলে বিভিন্ন প্রজাতির দেশীয় মাছ ছোট ছোট খাদ, বিল ও পুকুরে আশ্রয় নেয়। এসব মাছ ধরে রাখতে জমির মালিকেরা পানিতে গাছের ডালপালা ফেলে মাছের আবাসস্থল তৈরি করেন। পাশাপাশি মাছের খাবার সরবরাহ ও শ্রমিক দিয়ে নিয়মিত দেখভাল করেন। বর্ষার পানি নেমে গেলে শুষ্ক মৌসুমে ধান চাষের আগে এসব খাদ, বিল ও পুকুরের পানি সেচে মাছ আহরণ ও বিক্রি করেন তাঁরা। এতে একদিকে দেশীয় মাছ সংরক্ষিত হয়, অন্যদিকে স্থানীয় পরিবারগুলোর আয়েরও সুযোগ তৈরি হয়।
এলাকাবাসী জানান, হাওরে মাছ ধরে রাখার জন্য প্রতিবছরই জমির মালিকেরা গাছের ডালপালা, মাছের খাবার ও শ্রমিকের পেছনে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ অর্থ ব্যয় করেন। এসব মাছ বিক্রির আয় দিয়ে তাঁরা বোরো মৌসুমে ধান চাষের খরচ মেটানোর পাশাপাশি পরিবারের দৈনন্দিন ব্যয় নির্বাহ করেন। ফলে মাছ নিধনের মতো ঘটনা তাঁদের আর্থিকভাবে বড় ধরনের ক্ষতির মুখে ফেলে।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, কারপাশা গ্রামের মো. আবু সালেহসহ কয়েকটি পরিবার নিকলী হাওরের প্রায় পাঁচ একর আয়তনের একটি পুকুর ইজারা নিয়ে বর্ষার পানিতে আসা দেশীয় মাছ ধরে রাখছিলেন। শুষ্ক মৌসুমে পুকুর ও বিলের পানি সেচে এসব মাছ বিক্রির পরিকল্পনা ছিল তাঁদের। প্রতিবছর এভাবে মাছ বিক্রি করে তাঁরা উল্লেখযোগ্য পরিমাণ অর্থ আয় করতেন। সেই আয় দিয়ে কৃষিকাজের ব্যয় ও সংসারের অন্যান্য আর্থিক চাহিদা মেটাতেন।
তবে স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, গত কয়েক বছর ধরে এসব বিলে রাতের আঁধারে বিষ প্রয়োগ করে মাছ নিধনের ঘটনা ঘটছে। কিন্তু জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্ত করতে না পারায় আগের ঘটনাগুলোতে মামলা করা সম্ভব হয়নি বলে জানিয়েছেন তাঁরা।
এবারের ঘটনার রাতে কারপাশা গ্রামের আব্দুর রশিদ নিজের জমিতে মাছ ধরার জন্য চাই বা ফাঁদ পাততে হাওরে যান। এ সময় তিনি ফিশারির এক কোণে পাঁচ থেকে ছয়জনের একটি দলকে কীটনাশকের কৌটা নিয়ে বসে থাকতে দেখেন বলে জানান। গভীর রাতে সেখানে তাঁদের অবস্থানের কারণ জানতে চাইলে ওই ব্যক্তিরা তাঁকে মারধর করেন বলে অভিযোগ করেন রশিদ। এতে তাঁর ডান হাতের হাড় ভেঙে যায়। এ ছাড়া শরীরের বিভিন্ন স্থানে আঘাতের চিহ্ন ও ফোলা জখম হয়েছে বলে তাঁর স্বজনেরা জানিয়েছেন।
আহত আব্দুর রশিদ জানান, হাওর থেকে প্রায় তিন কিলোমিটার দূরে নিজের বাড়িতে ফিরে যাওয়ার পর পরিবারের সদস্যরা তাঁকে নিকলী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করেন। তাঁর পরিবারের সদস্যরাও মারধরের ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করেছেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
ফিশারির মালিক মো. আবু সালেহ বলেন, প্রতিবছরের মতো এবারও তিনি মাছ চাষ ও সংরক্ষণের মাধ্যমে ভালো আয় করার আশা করেছিলেন। মাছ বিক্রির অর্থ দিয়ে কৃষিকাজের ব্যয় মেটানোর পাশাপাশি পরিবারের আর্থিক সংকট কাটিয়ে ওঠার পরিকল্পনা ছিল তাঁর। কিন্তু বিষ প্রয়োগ করে মাছ মেরে ফেলার কারণে তাঁর বিনিয়োগ করা পুঁজি নষ্ট হয়ে গেছে। এখন ঋণের টাকা কীভাবে পরিশোধ করবেন, তা নিয়ে তিনি দুশ্চিন্তায় রয়েছেন। এ কথা বলতে গিয়ে তিনি কান্নায় ভেঙে পড়েন।
ফিশারিতে বিষ প্রয়োগ করে মাছ নিধনের খবর ছড়িয়ে পড়লে আশপাশের গ্রামের শত শত মানুষ ঘটনাস্থলে ভিড় করেন। এ ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্ত ফিশারির মালিকের পরিবার ও স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে ব্যাপক ক্ষোভ দেখা দিয়েছে।স্থানীয়দের মতে ক্ষতিগ্রস্থ মাছের মুল্য প্রায় দশ লক্ষ টাকা। তাঁরা ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত এবং দায়ীদের শনাক্ত করে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন।
ঘটনার বিষয়ে নিকলী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) শামীম আরা বলেন, এটি একটি অমার্জনীয় অপরাধ। এমন অমানবিক কর্মকাণ্ডে তিনি দুঃখ প্রকাশ করেছেন। ক্ষতিগ্রস্ত ফিশারির মালিকদের সঙ্গে কথা বলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও জানান তিনি।
প্রতিবেদন পাঠানোর আগমুহূর্ত পর্যন্ত এ ঘটনায় নিকলী থানায় কোনো মামলা হয়নি। তবে ফিশারির মালিকপক্ষ জানিয়েছে, দ্রুত সময়ের মধ্যে মামলা করা হবে।












Disqus comments are not configured yet.