হোসেনপুরে বিলুপ্তির পথে মাকাল ফল, নতুন প্রজন্মের কাছে এখন অচেনা
“গুরুমশায় বলেন তারে- বুদ্ধি যে নেই একেবারে, দ্বিতীয় ভাগ করতে সারা ছয় মাস ধরে নাকাল। রেগেমেগে বলেন, ‘বাঁদর, নাম দিনু তোর মাকাল।’” রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের শিশুতোষ কবিতা ‘মাকাল’-এ এভাবেই ফলটির নামের উল্লেখ পাওয়া যায়। তবে যে ফলটি একসময় বাংলার গ্রামীণ জনপদে পরিচিত ছিল, আজ সেটিই নতুন প্রজন্মের কাছে প্রায় অচেনা।
উদ্ভিদবিদদের তথ্যমতে, মাকালের প্রাচীন নাম ছিল ‘মহাকাল’। সময়ের ব্যবধানে নামটি পরিবর্তিত হয়ে ‘মাকাল’ রূপে প্রচলিত হয়। এর বৈজ্ঞানিক নাম Trichosanthes tricuspidata।
টকটকে লাল রঙের মাকাল ফল দেখতে অনেকটা ছোট আপেলের মতো হলেও এর ভেতরের অংশ তিতা এবং কালচে বর্ণের। কিশোরগঞ্জের আঞ্চলিক ভাষায় অনেক স্থানে একে ‘কাওয়াকাঁদি’ নামেও ডাকা হয়। অতীতে এ ফলের বীজ ও অন্যান্য অংশ থেকে তৈরি প্রাকৃতিক বিষ কৃষিকাজে ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হতো। বর্তমানে পরিবেশগত পরিবর্তন, বনভূমি ধ্বংস এবং রাসায়নিক কীটনাশকের বিস্তারের কারণে মাকাল গাছের সংখ্যা আশঙ্কাজনকভাবে কমে গেছে।
মাকাল একটি বহুবর্ষজীবী লতাজাতীয় উদ্ভিদ। সাধারণত বন-জঙ্গল কিংবা বড় গাছকে আশ্রয় করে এটি ৩০ থেকে ৪০ ফুট পর্যন্ত বিস্তৃত হতে পারে। পাতার কক্ষে সাদা ফুল ফোটে এবং বর্ষা মৌসুমে ফুল ও ফল ধারণ করে। কাঁচা অবস্থায় ফলের রং গাঢ় সবুজ, পরবর্তীতে হলুদ এবং সম্পূর্ণ পাকলে উজ্জ্বল লাল হয়ে ওঠে।
স্থানীয় বৃক্ষপ্রেমী মো. নবী হোসেন বলেন, মাকাল শুধু একটি ফল নয়; এটি একটি মূল্যবান ভেষজ উদ্ভিদ। এর শিকড় কোষ্ঠকাঠিন্য ও বদহজমের ওষুধ তৈরিতে ব্যবহৃত হয়। এছাড়া কফ, শ্বাসকষ্ট, নাক ও কানের ক্ষত, জন্ডিস, শরীরে পানি জমা, স্তনের প্রদাহ, প্রস্রাবজনিত সমস্যা, বাতব্যথা, কাশি এবং শিশুদের অ্যাজমাসহ নানা রোগের লোকজ চিকিৎসায় মাকালের বিভিন্ন অংশ ব্যবহৃত হয়ে আসছে।
তিনি আরও জানান, মাকালের বীজ থেকে প্রাপ্ত তেল সাপ ও বিছার কামড়, আমাশয়, ডায়রিয়া, মৃগীরোগসহ বিভিন্ন সমস্যার লোকজ চিকিৎসায় ব্যবহারের প্রচলন রয়েছে। একই সঙ্গে সাবান উৎপাদন এবং চুলের পরিচর্যাতেও এ তেলের ব্যবহার রয়েছে বলে স্থানীয়ভাবে বিশ্বাস করা হয়।
স্থানীয়দের ভাষ্য, মাকাল ফলের বীজ ও আঁশ শুকিয়ে গুঁড়া করে পানিতে মিশিয়ে তৈরি দ্রবণ দীর্ঘদিন ধরে প্রাকৃতিক কীটনাশক হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। বিশেষ করে কিশোরগঞ্জের হোসেনপুর অঞ্চলের কৃষকেরা একসময় ফসলের পোকামাকড় ও ইঁদুর দমনে মাকালের বিষ ব্যবহার করতেন। এটি ফসলের জন্য তুলনামূলকভাবে পরিবেশবান্ধব বলে পরিচিত ছিল।
জানা গেছে, বাংলাদেশের ঢাকা, ময়মনসিংহ, টাঙ্গাইল ও কিশোরগঞ্জ জেলার বিভিন্ন বনাঞ্চল ও পরিত্যক্ত স্থানে একসময় মাকাল গাছ প্রচুর দেখা যেত। তবে গত এক যুগে এর সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে। স্থানীয়দের দাবি, আগের তুলনায় বর্তমানে এর উপস্থিতি প্রায় দশ ভাগের এক ভাগে নেমে এসেছে।
স্থানীয় পরিবেশবিদ অধ্যাপক এবিএম ছিদ্দিক চঞ্চল বলেন, “অবাধ বন উজাড়, প্রাকৃতিক আবাসস্থল ধ্বংস এবং রাসায়নিক কীটনাশকের ব্যাপক ব্যবহারের কারণে মাকাল গাছ দ্রুত হারিয়ে যাচ্ছে। একসময় কৃষকেরা প্রাকৃতিক কীটনাশক হিসেবে মাকালের বিষ ব্যবহার করলেও এখন বাজারে এর চাহিদা প্রায় নেই। দেশীয় এ মূল্যবান উদ্ভিদ সংরক্ষণে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া জরুরি।”
পরিবেশবিদদের মতে, দেশীয় বিরল উদ্ভিদ সংরক্ষণে সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে উদ্যোগ, সচেতনতা বৃদ্ধি এবং বনাঞ্চল রক্ষায় কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করা না হলে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম হয়তো কেবল বইয়ের পাতাতেই মাকাল ফলের নাম খুঁজে পাবে।











Warning: Array to string conversion in /home/dkishoreganj/public_html/wp-content/plugins/gs-facebook-comments/public/class-wpfc-public.php on line 311
Array