জলবায়ু পরিবর্তন ও অর্থনৈতিক সংকটে দারিদ্র্যের ঝুঁকিতে কোটি মানুষ
দারিদ্র্য শুধু আয় কমে যাওয়ার নাম নয়। এর অর্থ একটি পরিবারের শিশুর পুষ্টিকর খাবার না পাওয়া, অসুস্থ হলে চিকিৎসা করাতে না পারা, পড়াশোনা বন্ধ হয়ে যাওয়া কিংবা জীবিকার তাগিদে বসতভিটা ছেড়ে অন্য কোথাও চলে যেতে বাধ্য হওয়া।
বিশ্বব্যাংকের দারিদ্র্যবিষয়ক আলোচনায় উঠে এসেছে, বিভিন্ন সংকটের সম্মিলিত প্রভাবে বিপুলসংখ্যক মানুষ নতুন করে দারিদ্র্যের ঝুঁকিতে পড়তে পারেন। ‘আরও চার কোটি মানুষ’—এমন শিরোনামে প্রকাশিত তথ্যটি সেই উদ্বেগেরই প্রতিফলন। তবে এই সংখ্যাটি কোন নির্দিষ্ট প্রতিবেদন, সময়সীমা ও দারিদ্র্যের সংজ্ঞার ভিত্তিতে বলা হয়েছে, তা নিশ্চিত হওয়া জরুরি।
বাংলাদেশের জন্য দারিদ্র্যের এই ঝুঁকি বিশেষভাবে উদ্বেগজনক। বিশ্বব্যাংকের ২০২৬ সালের অক্টোবরের প্রতিবেদন অনুযায়ী, দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির গতি কমে যাওয়া, উচ্চ মূল্যস্ফীতি, কর্মসংস্থানের সংকট ও জ্বালানির ঘাটতি মানুষের জীবনযাত্রাকে আরও কঠিন করে তুলেছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২২ সালে বাংলাদেশের জাতীয় দারিদ্র্যের হার ছিল ১৮ দশমিক ৭ শতাংশ। ২০২৬ সালে তা বেড়ে আনুমানিক ২২ দশমিক ৫ শতাংশে পৌঁছেছে। অর্থাৎ, দারিদ্র্যের হার বৃদ্ধির পাশাপাশি নতুন করে দরিদ্র মানুষের সংখ্যাও বাড়ছে।
এই সংকটের বড় শিকার নিম্ন আয়ের শ্রমজীবী মানুষ। তাঁদের আয় বাড়লেও অনেক ক্ষেত্রে সেই আয় দিয়ে আগের মতো সংসার চালানো সম্ভব হচ্ছে না। চাল, ডাল, তেল, মাছ, সবজি, ওষুধ, বাড়িভাড়া ও যাতায়াতের খরচ মেটাতে গিয়ে মাসের শেষ দিকে অনেক পরিবারকে ধারদেনা করতে হচ্ছে।
কোনো পরিবার হয়তো এখনো দারিদ্র্যসীমার সামান্য ওপরে রয়েছে। কিন্তু পরিবারের একজন সদস্য অসুস্থ হলে, চাকরি চলে গেলে কিংবা বাড়িভাড়া বেড়ে গেলে সেই পরিবারও নতুন করে দারিদ্র্যের মধ্যে পড়ে যেতে পারে
দারিদ্র্য বৃদ্ধির অন্যতম প্রধান কারণ মূল্যস্ফীতি। নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বাড়লে সবচেয়ে বেশি চাপে পড়েন নির্দিষ্ট আয়ের মানুষ।
একজন দিনমজুরের দৈনিক আয় যদি ৭০০ টাকা হয়, অথচ খাবার, বাসাভাড়া ও যাতায়াতের ব্যয় মেটাতে ৮০০ টাকা প্রয়োজন হয়, তাহলে প্রতিদিনই তাঁকে ঘাটতি নিয়ে সংসার চালাতে হবে। আয় বাড়ার সুযোগ না থাকলে এই ঘাটতি ধীরে ধীরে ঋণে পরিণত হয়।
অন্যদিকে, কর্মসংস্থানের সুযোগ কমে গেলে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়। বিশ্বব্যাংকের পর্যবেক্ষণে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক মন্থরতা শ্রমবাজারে নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। বিশেষ করে সাম্প্রতিক সময়ে নারীরা কর্মসংস্থান হারানোর ঝুঁকিতে পড়েছেন।
কর্মসংস্থান শুধু আয় উপার্জনের মাধ্যম নয়; এটি মানুষের আত্মমর্যাদা, পরিবারের নিরাপত্তা ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার ভিত্তি। তাই নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি না হলে দারিদ্র্য কমানোর প্রচেষ্টাও দুর্বল হয়ে পড়ে।
বাংলাদেশের মতো জলবায়ু ঝুঁকিপূর্ণ দেশে দারিদ্র্যের সঙ্গে পরিবেশগত সংকটের সম্পর্ক গভীর।
বন্যা, ঘূর্ণিঝড়, নদীভাঙন, লবণাক্ততা ও দীর্ঘস্থায়ী তাপপ্রবাহ মানুষের জীবিকা ধ্বংস করে দিতে পারে। কৃষক ফসল হারান, জেলেরা মাছ ধরতে পারেন না, দিনমজুর কাজ হারান। অনেক পরিবার বসতভিটা হারিয়ে শহরে এসে নতুন করে জীবন শুরু করতে বাধ্য হয়।
জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব শুধু সম্পদহানিতে সীমাবদ্ধ নয়। এর ফলে খাদ্য উৎপাদন ব্যাহত হয়, পানীয় জলের সংকট দেখা দেয় এবং স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়ে।
বিশ্বব্যাংকের ২০২৫ সালের একটি গবেষণায় বলা হয়েছে, উচ্চমাত্রার গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণ এবং অভিযোজনের সীমিত সুযোগ অব্যাহত থাকলে ২০৫০ সালের মধ্যে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বিশ্বে অতিরিক্ত ৪ কোটি ১০ লাখ মানুষ চরম দারিদ্র্যের মধ্যে পড়তে পারেন।
এটি একটি দীর্ঘমেয়াদি পূর্বাভাস, নিশ্চিত ভবিষ্যৎ নয়। তবে জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় কার্যকর উদ্যোগ না নিলে দারিদ্র্য হ্রাসের অগ্রগতি বাধাগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
দারিদ্র্য মোকাবিলায় সরকারের সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। বয়স্ক ভাতা, বিধবা ভাতা, প্রতিবন্ধী ভাতা, খাদ্যসহায়তা ও বিভিন্ন নগদ সহায়তা কর্মসূচি দরিদ্র মানুষের জীবনধারণে সহায়তা করে। তবে এসব সহায়তা প্রকৃত দরিদ্র মানুষের কাছে পৌঁছানো নিশ্চিত করা জরুরি।
বিশ্বব্যাংকের ২০২৬ সালের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশের সবচেয়ে দরিদ্র ২০ শতাংশ পরিবারের প্রায় অর্ধেক কোনো সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির আওতায় নেই। অর্থাৎ, যাঁদের সহায়তা সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন, তাঁদের একটি বড় অংশই প্রয়োজনীয় সহায়তা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।
এ অবস্থায় সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির পরিধি বাড়ানোর পাশাপাশি উপকারভোগী নির্বাচন আরও স্বচ্ছ ও কার্যকর করতে হবে। একই সঙ্গে নগদ সহায়তার পরিমাণ এমন পর্যায়ে নিতে হবে, যাতে তা পরিবারের মৌলিক চাহিদা পূরণে বাস্তব ভূমিকা রাখতে পারে।
দারিদ্র্য মোকাবিলায় শুধু সাময়িক সহায়তা যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন এমন অর্থনৈতিক ব্যবস্থা, যেখানে মানুষের নিয়মিত কাজের সুযোগ থাকবে, আয় বাড়বে এবং মৌলিক সেবাগুলো সবার জন্য সহজলভ্য হবে।
এ জন্য কয়েকটি পদক্ষেপ জরুরি।
- কর্মসংস্থান সৃষ্টি: কৃষি, শিল্প, ক্ষুদ্র ব্যবসা ও সেবা খাতে নতুন কাজের সুযোগ বাড়াতে হবে। বিশেষ করে তরুণ ও নারীদের কর্মসংস্থানে গুরুত্ব দিতে হবে।
- মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ: খাদ্যপণ্যের সরবরাহব্যবস্থা শক্তিশালী করা, বাজার তদারকি এবং নিম্ন আয়ের মানুষের ক্রয়ক্ষমতা রক্ষায় কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে।
- সামাজিক নিরাপত্তা সম্প্রসারণ: প্রকৃত দরিদ্র ও ঝুঁকিপূর্ণ পরিবারগুলোকে চিহ্নিত করে সময়মতো সহায়তা নিশ্চিত করতে হবে।
- শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবায় বিনিয়োগ: দরিদ্র পরিবারের শিশুদের শিক্ষা ও পুষ্টি নিশ্চিত করতে হবে, যাতে দারিদ্র্যের চক্র পরবর্তী প্রজন্মেও চলতে না থাকে।
- জলবায়ু সহনশীলতা বৃদ্ধি: কৃষি, অবকাঠামো, নিরাপদ পানি ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় বিনিয়োগ বাড়াতে হবে।
দারিদ্র্য কোনো ব্যক্তির ব্যর্থতা নয়; অনেক সময় এটি অর্থনৈতিক বৈষম্য, কর্মসংস্থানের অভাব, প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও অপর্যাপ্ত সামাজিক সুরক্ষার সম্মিলিত ফল।
নতুন করে চার কোটি মানুষ দরিদ্র হওয়ার আশঙ্কা আমাদের মনে করিয়ে দেয়, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সুফল সবার কাছে পৌঁছানো কতটা জরুরি। দেশের উন্নয়ন তখনই অর্থবহ হবে, যখন একজন শ্রমজীবী মানুষ তাঁর আয় দিয়ে পরিবারের খাবার, চিকিৎসা, শিক্ষা ও বাসস্থানের নিশ্চয়তা দিতে পারবেন।
দারিদ্র্য কমানোর লড়াই তাই শুধু অর্থনীতির লড়াই নয়; এটি মানুষের মর্যাদা, অধিকার ও নিরাপদ ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করার লড়াই।










Disqus comments are not configured yet.