সাত দিনব্যাপী শেষ বিদায় শুরু: খামেনিকে শ্রদ্ধা জানাতে লাখো মানুষের ঢল
ইরানের প্রয়াত সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির সাত দিনব্যাপী রাষ্ট্রীয় দাফন ও শেষকৃত্যের আনুষ্ঠানিকতা শুরু হয়েছে। দেশটির ইতিহাসের অন্যতম বৃহৎ এ রাষ্ট্রীয় আয়োজনে কোটি কোটি শোকাহত মানুষের অংশগ্রহণের আশা করছে ইরানি কর্তৃপক্ষ। ইরান ও ইরাকের বিভিন্ন শহরে এ উপলক্ষে ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতা, শোকসভা, শোকমিছিল ও বিশেষ দোয়া মাহফিলের আয়োজন করা হয়েছে।
খামেনির মৃত্যুর চার মাসেরও বেশি সময় পর শুরু হওয়া এ আনুষ্ঠানিকতাকে ইরানি কর্মকর্তারা ‘শতাব্দীর সবচেয়ে বড় বিদায়’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। রাষ্ট্রীয়ভাবে আয়োজিত এ কর্মসূচি শুধু একটি ধর্মীয় অনুষ্ঠান নয়; বরং জাতীয় ঐক্য, রাজনৈতিক বার্তা এবং রাষ্ট্রীয় সংহতিরও প্রতীক হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
ইরানি কর্তৃপক্ষের ধারণা, শেষ বিদায়ে এক কোটি ২০ লাখ থেকে দুই কোটি মানুষ অংশ নিতে পারেন। সম্ভাব্য এই বিপুল জনসমাগমকে সামনে রেখে দেশটির ইতিহাসের অন্যতম বৃহৎ নিরাপত্তা ও লজিস্টিক প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে।
প্রস্তুতির অংশ হিসেবে হাজারো সেবাকেন্দ্র (মাওকিব) স্থাপন, ১০ লাখেরও বেশি মানুষের আবাসনের ব্যবস্থা, চিকিৎসাসেবা, নিরাপত্তা এবং তেহরানের কেন্দ্রজুড়ে পৃথক প্রবেশ ও বহির্গমন পথ নির্ধারণ করা হয়েছে। পুরো কার্যক্রম পরিচালনা করছে ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর (আইআরজিসি) তেহরানভিত্তিক ‘মোহাম্মদ রাসুলুল্লাহ কর্পস’।
ইরানি কর্মকর্তাদের তথ্য অনুযায়ী, কয়েক ডজন দেশের রাষ্ট্রপ্রধান, প্রধানমন্ত্রী, পার্লামেন্ট স্পিকার, মন্ত্রী ও উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিরা শেষকৃত্যের বিভিন্ন কর্মসূচিতে অংশ নিচ্ছেন। পাশাপাশি বিশ্বের বিভিন্ন দেশের প্রায় ৮০০ বিদেশি সাংবাদিক এ আয়োজন কাভার করছেন। বাংলাদেশের জাতীয় সংসদের স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদও ইতোমধ্যে তেহরানে পৌঁছেছেন বলে জানা গেছে।
রাষ্ট্রীয় শোকানুষ্ঠানের প্রতীক হিসেবে নির্ধারণ করা হয়েছে মুষ্টিবদ্ধ হাতের প্রতীক এবং ‘আমাদের জেগে উঠতেই হবে’ স্লোগান।
শনিবার স্থানীয় সময় সকাল ৬টায় তেহরানের গ্র্যান্ড মুসাল্লা কমপ্লেক্সে আনুষ্ঠানিকতা শুরু হয়। রোববার বিকেল পর্যন্ত সাধারণ মানুষ সেখানে গিয়ে প্রয়াত নেতার প্রতি শেষ শ্রদ্ধা জানানোর সুযোগ পাবেন।
ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর কমান্ডার হাসান হাসানজাদেহ জানান, খামেনির কফিন একটি উঁচু মঞ্চে রাখা হয়েছে। দর্শনার্থীদের নির্বিঘ্ন চলাচল নিশ্চিত করতে বিশেষ ব্যবস্থাও গ্রহণ করা হয়েছে, যাতে স্বল্প সময়ের মধ্যেই বিপুলসংখ্যক মানুষ শ্রদ্ধা নিবেদন করতে পারেন।
ঘোষিত কর্মসূচি অনুযায়ী, মঙ্গলবার মরদেহ কোম শহরে নেওয়া হবে। সেখানে জামকারান মসজিদে জানাজার নামাজ অনুষ্ঠিত হবে। এরপর বুধবার মরদেহ ইরাকের নাজাফ ও কারবালায় নেওয়া হবে। সর্বশেষ বৃহস্পতিবার তা আবার ইরানে ফিরিয়ে এনে তাঁর জন্মশহর মাশহাদের ইমাম রেজা (আ.) মাজার প্রাঙ্গণে দাফন করা হবে।
দাফনের পর দেশজুড়ে আরও ৪০ দিনব্যাপী রাষ্ট্রীয় শোক কর্মসূচি পালনের পরিকল্পনা রয়েছে। পাশাপাশি প্রথম মৃত্যুবার্ষিকী পর্যন্ত বিভিন্ন স্মরণানুষ্ঠান আয়োজনের কথাও জানিয়েছে ইরানি কর্তৃপক্ষ।
বিশ্লেষকদের মতে, এই শেষকৃত্য কেবল ধর্মীয় আবেগের বহিঃপ্রকাশ নয়; এটি ইরানের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক আয়োজনও। তাঁদের ধারণা, এই কর্মসূচির মাধ্যমে রাষ্ট্র জাতীয় ঐক্যের বার্তা দেওয়ার পাশাপাশি খামেনি-পরবর্তী নেতৃত্বের প্রতি জনসমর্থন আরও সুসংহত করার চেষ্টা করবে। তবে এত বড় আয়োজন দেশের রাজনৈতিক ও সামাজিক বিভাজন কমাতে কতটা কার্যকর হবে, তা নিয়েও আলোচনা রয়েছে।
এদিকে শেষকৃত্যকে ঘিরে দুটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় এখনো স্পষ্ট হয়নি। প্রথমত, খামেনির ছেলে মোজতবা খামেনি অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকবেন কি না। দ্বিতীয়ত, জানাজার নামাজে কে ইমামতি করবেন। পর্যবেক্ষকদের মতে, এই দুটি বিষয়ই ইরানের ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব ও ক্ষমতার ভারসাম্য সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক বার্তা বহন করতে পারে।










