‘গুমের মতো মানবতাবিরোধী অপরাধে জড়িতদের বিচার নিশ্চিত করতে হবে’
আন্তর্জাতিক গুম প্রতিরোধ দিবস উপলক্ষে গুম হওয়া ব্যক্তি ও তাঁদের পরিবারের প্রতি গভীর সহানুভূতি ও সহমর্মিতা জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। একই সঙ্গে গুমের মতো মানবতাবিরোধী অপরাধে জড়িত ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানগুলোর বিচার ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে বিশ্বজুড়ে ঐক্য ও সংহতির আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।
আন্তর্জাতিক গুম প্রতিরোধ দিবস উপলক্ষে দেওয়া এক বাণীতে প্রধানমন্ত্রী এসব কথা বলেন।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, রাষ্ট্র বা সরকার কর্তৃক গুমের বিরুদ্ধে বিশ্ববিবেককে জাগ্রত রাখতে বিশ্বজুড়ে আন্তর্জাতিক গুম প্রতিরোধ দিবস পালিত হচ্ছে। এবারের দিবসের প্রতিপাদ্য—‘ভিক্টিমস ফার্স্ট, অ্যাকশন্স নাউ’।
তিনি বলেন, বিশ্বের নিকৃষ্টতম অপরাধগুলোর মধ্যে গুম বা ‘এনফোর্সড ডিজঅ্যাপিয়ারেন্স’ অন্যতম ভয়ংকর অপরাধ। এটি একটি বৈশ্বিক সমস্যা এবং মানবাধিকারের চরম লঙ্ঘন। বিশেষ করে স্বৈরতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা ও রাজনৈতিক সংঘাতপূর্ণ অঞ্চলে এ ধরনের অমানবিক ঘটনা ঘটে থাকে।
বাংলাদেশের বিগত সরকারের বিরুদ্ধে গুম ও অপহরণের অভিযোগ তুলে প্রধানমন্ত্রী বলেন, গণতান্ত্রিক ও রাজনৈতিক অধিকার দমন করতে গুম-অপহরণের পথ বেছে নেওয়া হয়েছিল। গুমের শিকার ব্যক্তিদের মাসের পর মাস কিংবা বছরের পর বছর আটকে রাখতে গোপন বন্দিশালা তৈরি করা হয়েছিল, যা জনপরিসরে ‘আয়নাঘর’ নামে পরিচিতি পায়।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, দেশি-বিদেশি মানবাধিকার সংস্থাগুলোর হিসাব অনুযায়ী, আইন প্রয়োগকারী সংস্থাকে ব্যবহার করে বিভিন্ন সময়ে কমপক্ষে সাত শতাধিক মানুষকে গুম করা হয়েছে। বর্তমান সরকার প্রতিটি গুমের ঘটনা তদন্ত করে বিচার কার্যক্রম শুরু করেছে।
তিনি বলেন, ভবিষ্যতে গুম বা ‘এনফোর্সড ডিজঅ্যাপিয়ারেন্স’ বন্ধে পৃথক আইনি কাঠামো প্রণয়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ইতোমধ্যে জাতীয় সংসদে ‘গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার বিল, ২০২৬’ এবং ‘জাতীয় মানবাধিকার কমিশন বিল, ২০২৬’ উত্থাপন করা হয়েছে।
গুমের শিকার ব্যক্তিদের পরিবারের দুর্ভোগের কথা তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, গুম কিংবা অপহরণ শুধু কোনো ব্যক্তির হারিয়ে যাওয়া নয়; এর সঙ্গে একটি পরিবারের স্বপ্ন, সাধ ও আকাঙ্ক্ষার মৃত্যু জড়িয়ে থাকে। স্বজনদের দিন কাটে অনিশ্চয়তার মধ্যে। এমন পরিস্থিতিতে স্বাভাবিকভাবে শোক পালনেরও সুযোগ থাকে না।
২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের প্রসঙ্গ তুলে তিনি বলেন, ফ্যাসিবাদবিরোধী দীর্ঘ আন্দোলন-সংগ্রামের ধারাবাহিকতায় গণঅভ্যুত্থানে ফ্যাসিস্ট চক্রের পতনের পর সৌভাগ্যবান কেউ কেউ ফিরে এসেছেন। তবে ইলিয়াস আলী ও চৌধুরী আলমের মতো অসংখ্য মানুষের এখনো কোনো সন্ধান পাওয়া যায়নি।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, আইসিসির রোম সংবিধানের ৭(২) অনুচ্ছেলে গুমকে মানবতাবিরোধী অপরাধ হিসেবে সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে। গুমের ঘটনার দৃষ্টান্তমূলক বিচারের ওপরও তিনি গুরুত্বারোপ করেন।
আজ ৩০ আগস্ট আন্তর্জাতিক গুম প্রতিরোধ দিবস। দিবসটি উপলক্ষে গুম হওয়া ব্যক্তিদের স্বজনদের সংগঠন ‘মায়ের ডাক’সহ বিভিন্ন মানবাধিকার সংগঠন নানা কর্মসূচি আয়োজন করেছে।
জোরপূর্বক গুম একটি বৈশ্বিক সমস্যা। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে, বিশেষ করে স্বৈরতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা ও রাজনৈতিক সংঘাতপূর্ণ অঞ্চলে এ ধরনের ঘটনা ঘটে থাকে। রাষ্ট্রের নিরাপত্তা বা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী অনেক সময় ভিন্নমতের রাজনৈতিক কর্মীদের দমনে এ ধরনের কৌশল ব্যবহার করে থাকে বলে মানবাধিকার সংগঠনগুলোর প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।
এর ফলে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তির পরিবার তাঁদের স্বজনের অবস্থান সম্পর্কে কোনো তথ্য জানতে পারে না এবং ন্যায়বিচার পাওয়ার অধিকার থেকেও বঞ্চিত হয়।
জাতিসংঘের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, বিশ্বব্যাপী গুমের শিকার ব্যক্তিদের উদ্ধারে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ, তাঁদের স্মরণ এবং ভুক্তভোগী পরিবারের সদস্যদের প্রতি সমবেদনা জানাতে ২০১১ সাল থেকে প্রতি বছর ৩০ আগস্ট আন্তর্জাতিক গুম প্রতিরোধ দিবস পালিত হয়ে আসছে।
দিবসটির পটভূমি পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, বিশ্বের বিভিন্ন দেশে রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় গুম বন্ধের পাশাপাশি এই অপরাধের দায়মুক্তি বিলোপ, ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা এবং ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তিদের সহায়তার লক্ষ্যে ২০০৬ সালের ২০ ডিসেম্বর গুম হওয়া সব ব্যক্তির সুরক্ষায় জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে একটি আন্তর্জাতিক সনদের প্রস্তাব গৃহীত হয়।
পরবর্তীতে ২০১০ সালের ডিসেম্বরে ‘ইন্টারন্যাশনাল কনভেনশন ফর দ্য প্রোটেকশন অব অল পারসন্স অ্যাগেইনস্ট এনফোর্সড ডিজঅ্যাপিয়ারেন্স’ কার্যকর হয়। এই সনদের আওতায় ৩০ আগস্টকে আন্তর্জাতিক গুম প্রতিরোধ দিবস হিসেবে পালন করা হয়। গুম হওয়া ব্যক্তিদের স্বজনদের সংগঠন এবং সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন সংস্থা প্রতি বছর দিনটি পালন করে আসছে।
দিবসটির মূল উদ্দেশ্য হলো গুমের মতো মানবতাবিরোধী অপরাধকে বিশ্বমঞ্চে তুলে ধরা, রাষ্ট্রগুলোর ওপর জবাবদিহির চাপ সৃষ্টি করা এবং গুমের শিকার ব্যক্তি ও তাঁদের পরিবারের অধিকার সুরক্ষায় কার্যকর পদক্ষেপ নিশ্চিত করা। ২০১১ সাল থেকে বাংলাদেশেও দিনটি পালিত হয়ে আসছে।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে গুমের ইতিহাস খুব বেশি পুরোনো নয়। তবে সাম্প্রতিক সময়ে বিষয়টি ব্যাপকভাবে আলোচিত ও সমালোচিত হয়েছে। আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে গুম করে ‘আয়নাঘরে’ আটকে রেখে নির্যাতনের অভিযোগের বিভিন্ন তথ্য গুম কমিশন ও আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংস্থার প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।
বিশেষ করে আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে বিরোধী রাজনৈতিক নেতাকর্মী, মানবাধিকারকর্মী এমনকি সাংবাদিকদের গুম করার অভিযোগও সামনে এসেছে। ভুক্তভোগী পরিবারের সদস্যদের অভিযোগ, অনেক ক্ষেত্রেই আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পরিচয়ে তাঁদের স্বজনদের তুলে নিয়ে যাওয়ার পর আর কোনো সন্ধান পাওয়া যায়নি।
২০২৪ সালের জুলাইয়ে সংঘটিত গণঅভ্যুত্থানের পর বিষয়টি আলোচনায় নতুন মাত্রা পায়। গুমের সুনির্দিষ্ট অভিযোগে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে একাধিক আবেদন দাখিল করা হয়েছে। গুমের শিকার ব্যক্তি ও ভুক্তভোগী পরিবারের সদস্যরা বিচার চেয়ে আনুষ্ঠানিক অভিযোগও দাখিল করেছেন।
এ ছাড়া ২০২৪ সালের ২৯ আগস্ট বাংলাদেশ আনুষ্ঠানিকভাবে আন্তর্জাতিক গুম প্রতিরোধ সনদে স্বাক্ষর করে।
আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে বিরোধী মত দমনের নামে রাজনৈতিক নেতাকর্মী ও মানবাধিকারকর্মীসহ বহু মানুষ গুমের শিকার হয়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। বর্তমানে এসব ঘটনার তদন্ত চলছে। এরই মধ্যে তদন্তে একের পর এক তথ্য সামনে আসছে। ভুক্তভোগী পরিবারের সদস্যরা গুমের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের দৃষ্টান্তমূলক ও কঠোর শাস্তির দাবি জানিয়েছেন।
গুমকে একটি স্বতন্ত্র, আমলযোগ্য, জামিন-অযোগ্য ও আপস-অযোগ্য ফৌজদারি অপরাধ হিসেবে চিহ্নিত করে ‘গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার আইন, ২০২৬’-এর খসড়ায় নীতিগত ও চূড়ান্ত অনুমোদন দিয়েছে মন্ত্রিসভা।
গুম প্রতিরোধ, দায়ী ব্যক্তিদের শাস্তি নিশ্চিত করা, ভুক্তভোগী ও তাঁদের পরিবারের অধিকার সংরক্ষণ ও প্রতিকার প্রদান এবং মানবাধিকার ও ব্যক্তি-স্বাধীনতা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে ‘গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার বিল, ২০২৬’ গত ২৭ আগস্ট জাতীয় সংসদে উত্থাপন করা হয়েছে।
বিলটি সংসদে উত্থাপন করেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। বিস্তারিত পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর প্রতিবেদন দাখিলের জন্য বিলটি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটিতে পাঠানো হয়েছে।
প্রস্তাবিত আইনে গুমের অপরাধে সর্বোচ্চ যাবজ্জীবন কারাদণ্ড ও অর্থদণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে। আর গুমের কারণে ভুক্তভোগীর মৃত্যু হলে, মরদেহ উদ্ধার হলে কিংবা পাঁচ বছর পরও ব্যক্তির সন্ধান না মিললে সর্বোচ্চ মৃত্যুদণ্ড বা যাবজ্জীবন কারাদণ্ড এবং অর্থদণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে।
শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর ‘আয়নাঘর’ হিসেবে পরিচিত গোপন বন্দিশালা থেকে দীর্ঘদিন পর বেশ কয়েকজন ব্যক্তি মুক্ত হয়ে ফিরে আসার পর গুমের বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় আসে।
বেসরকারি মানবাধিকার সংগঠন ‘অধিকার’-এর পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গত ১৫ বছরে বাংলাদেশে সাত শতাধিক মানুষ গুমের শিকার হয়েছেন। তাঁদের মধ্যে ১৫০ জনেরও বেশি মানুষের খোঁজ এখনো পাওয়া যায়নি।
উল্লেখ্য, বাংলাদেশ জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক নয়টি মূল সনদের আটটিতে আগেই অনুস্বাক্ষর করেছিল। তবে জাতিসংঘের দীর্ঘদিনের অনুরোধ সত্ত্বেও বিগত সরকার গুমবিরোধী সনদে স্বাক্ষর করা থেকে বিরত ছিল। পরবর্তীতে ২০২৪ সালের ২৯ আগস্ট বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক গুম প্রতিরোধ সনদে স্বাক্ষর করে।
গুমবিরোধী আন্তর্জাতিক সনদটি ২০০৬ সালের ডিসেম্বরে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে গৃহীত হয়। ৩২টি দেশ এটি অনুস্বাক্ষর করার পর ২০১০ সাল থেকে এর আনুষ্ঠানিক বাস্তবায়ন শুরু হয়। সামগ্রিকভাবে এই সনদের লক্ষ্য হলো গুম বন্ধের পাশাপাশি এই অপরাধের দায়মুক্তি রোধ, ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা এবং ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তি ও তাঁদের পরিবারের জন্য প্রয়োজনীয় সহায়তা নিশ্চিত করা।











Warning: Array to string conversion in /home/dkishoreganj/public_html/wp-content/plugins/gs-facebook-comments/public/class-wpfc-public.php on line 311
Array