চারশ বছরের ঐতিহ্যের সাক্ষী গাঙ্গাটিয়া জমিদার বাড়ি
কিশোরগঞ্জের হোসেনপুর উপজেলার গোবিন্দপুর ইউনিয়নের গাঙ্গাটিয়া গ্রামে প্রায় চারশ বছরের ইতিহাস ও ঐতিহ্য ধারণ করে দাঁড়িয়ে আছে গাঙ্গাটিয়া জমিদার বাড়ি। স্থানীয়দের কাছে এটি ‘মানবাবুর বাড়ি’ নামে পরিচিত। প্রাচীন স্থাপত্যশৈলী, নান্দনিক কারুকার্য, জমিদারি ইতিহাস এবং মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিবিজড়িত এ বাড়ি আজও বহন করছে অতীতের গৌরবের সাক্ষ্য।
কিশোরগঞ্জ জেলা সদর থেকে প্রায় ১২ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত গাঙ্গাটিয়া জমিদার বাড়িটি রোমান-গ্রিক স্থাপত্যশৈলীর অনন্য নিদর্শন হিসেবে পরিচিত। বাড়িটির নির্মাণশৈলীতে প্রাচীন সভ্যতার ছাপ স্পষ্ট। বিশেষ করে এর স্তম্ভ, নকশা ও বিভিন্ন স্থাপনায় ১৮শ শতাব্দীর রোমান-গ্রিক স্থাপত্যের চমৎকার ব্যবহার লক্ষ করা যায়।
ঐতিহ্যবাহী এ জমিদার বাড়ির শেষ উত্তরাধিকারী ৯৩ বছর বয়সী মানবেন্দ্র নাথ চক্রবর্তী চৌধুরী, স্থানীয়ভাবে যিনি ‘মানব বাবু’ নামে পরিচিত। তিনি এখনও এ বাড়িতেই বসবাস করছেন। কলকাতায় পড়াশোনা করা মানবেন্দ্র নাথ চক্রবর্তী চৌধুরী জেনারেল এরশাদের শাসনামলে ১৯৮৫ সালে হোসেনপুর উপজেলা চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। বর্তমানে জমিদার বাড়ির আশপাশে তিনি মাছ চাষ করেন এবং জমিদার এস্টেটের বিস্তৃত এলাকায় চাষাবাদ পরিচালনা করেন।
জানা যায়, ১৬শ শতাব্দীতে ভারতের উত্তর প্রদেশ থেকে একজন উচ্চশিক্ষিত পণ্ডিত পূর্ববঙ্গে, বর্তমানে বাংলাদেশে, এসে বসতি স্থাপন করেন। তাঁর মাতুলালয় ছিল ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যের কমলপুর মহকুমার কমলপুর এলাকায়। ত্রিপুরা রাজ্যের কমলপুর শহরের শশীকান্ত ভট্টাচার্য ছিলেন গাঙ্গাটিয়া জমিদার পরিবারের ভূপতিনাথ চক্রবর্তী চৌধুরীর শ্বশুর।
তাঁদের পূর্বপুরুষেরা ছিলেন রাজবংশীয় ব্রাহ্মণ। ওই বংশের প্রথম পুরুষই এ জমিদার পরিবারের গোড়াপত্তন করেন বলে জানা যায়। গৌড়ীয় পরম্পরা অনুযায়ী বাড়ির ধ্বংসপ্রাপ্ত ভবনে পূজার জন্য তিনি একটি শিবমন্দির নির্মাণ করেন। এটিই ছিল এ বংশের নির্মিত প্রথম শিবমন্দির।
পরবর্তী সময়ে এ জমিদার পরিবার ধ্যান, পূজা ও বিভিন্ন আচার-অনুষ্ঠানের মাধ্যমে এলাকায় ব্যাপক মর্যাদা ও খ্যাতি অর্জন করে। এ বংশের দীননাথ চক্রবর্তী ছিলেন এলাকার প্রথম জমিদার। ১৮শ শতকের শেষভাগে তিনি হোসেনশাহী পরগনার এক-তৃতীয়াংশ ক্রয় করে এলাকায় জমিদারি প্রতিষ্ঠা করেন।
পরবর্তীতে দীননাথ চক্রবর্তীর ছেলে অতুলচন্দ্র চক্রবর্তী আঠারবাড়ির জমিদার জ্ঞানদাসুন্দরী চৌধুরানীর কাছ থেকে আরও দুই আনা জমি কিনে তা গাঙ্গাটিয়া জমিদারির সঙ্গে যুক্ত করেন। এভাবেই ধীরে ধীরে গাঙ্গাটিয়া জমিদারি বিস্তৃত হয়।
জমিদার পরিবারের নির্মিত প্রথম শিবমন্দিরটি জমিদার বাড়ি থেকে প্রায় এক কিলোমিটার দূরে অবস্থিত। বর্তমানে মন্দিরটি ধ্বংসপ্রাপ্ত হলেও সময়ের সাক্ষী হয়ে এখনও দাঁড়িয়ে আছে। মন্দিরটির পাশে রয়েছে বিশাল পুকুর সাগরদিঘী। এর পরেই রয়েছে আরেকটি পুরোনো ও ধ্বংসপ্রাপ্ত শিবমন্দির, যেখানে এখনও পারিবারিক পূজা অনুষ্ঠিত হয়।
এরপর বিশাল ফটক পেরিয়ে দেখা যায় শ্রীধর ভবন। সেখান থেকে প্রায় ৩০০ গজ দূরে অবস্থিত গাঙ্গাটিয়া জমিদার বাড়ির মূল ভবন। মূল ফটকের সামনে থেকে প্রায় ১২ ফুট চওড়া একটি সুন্দর রাস্তা বাড়ির দিকে চলে গেছে। রাস্তার দুই পাশে সারি সারি নারকেলগাছ। সেই পথ ধরে এগিয়ে গেলে চোখে পড়ে জমিদার বাড়ির নান্দনিক স্থাপত্য ও প্রাচীন নির্মাণশৈলী।
মূল ভবনটি দুইতলা বিশিষ্ট। ভবনের ভেতরে রয়েছে বসার ঘর, অতিথিকক্ষ, আদালত কক্ষ ও সংগীতচর্চার কক্ষ। এ ছাড়া রয়েছে কাচারিঘর, নাহাবতখানা ও দরবারঘর। ভবনের বিভিন্ন স্তম্ভে রয়েছে দৃষ্টিনন্দন কারুকার্য। সামনে রয়েছে বড় একটি উঠান, আর পুরো বাড়িটি ঘিরে রয়েছে উঁচু প্রাচীর।
প্রায় ১০ একর জমির ওপর অবস্থিত এ জমিদার বাড়ির মূল দরজাটিও নান্দনিক নকশায় সমৃদ্ধ। সময়ের ব্যবধানে স্থাপনাটির বিভিন্ন অংশ ক্ষয়প্রাপ্ত হলেও এর কারুকার্য ও স্থাপত্যসৌন্দর্য এখনও দর্শনার্থীদের আকর্ষণ করে।
মানবেন্দ্র বাবুর মতে, তাঁরা দেশের সবচেয়ে ছোট জমিদার পরিবার। তাঁরা ব্রাহ্মণ বংশীয় এবং তাঁদের পূর্বপুরুষেরা ভারতের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে এসেছিলেন।
গাঙ্গাটিয়া জমিদার বাড়ির ইতিহাসের সঙ্গে জড়িয়ে আছে ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের করুণ স্মৃতিও। মানবেন্দ্র বাবুর ভাষ্য অনুযায়ী, মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী ও তাদের স্থানীয় সহযোগীরা তাঁর পিতা শ্রীভূপতিনাথ চক্রবর্তী চৌধুরীকে হত্যা করে। ১৯৭১ সালের ৭ মে জমিদার বাড়িতেও ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি সাধন করা হয়।
যে স্থানে তাঁর পিতা পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর হাতে নিহত হন, সেখানে একটি স্মৃতিসৌধ নির্মাণ করা হয়েছে। এ ছাড়া মুক্তিযোদ্ধা সংগঠনের পক্ষ থেকে গাঙ্গাটিয়া জমিদার বাড়িতে সংঘটিত হত্যাকাণ্ড নিয়ে একটি প্রামাণ্যচিত্রও নির্মাণ করা হয়েছে।
বর্তমানে ঐতিহাসিক এ স্থাপনাটি নিয়মিত পরিদর্শন করেন স্থানীয় বাসিন্দা, বিদেশি পর্যটক, শিক্ষক-শিক্ষার্থী, সাংবাদিকসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ। প্রাচীন স্থাপত্য ও ইতিহাসের প্রতি আগ্রহীদের কাছেও বাড়িটি আকর্ষণের কেন্দ্র হয়ে উঠেছে।
মানবেন্দ্র নাথ চক্রবর্তী চৌধুরী বর্তমানে এ ঐতিহ্যবাহী বাড়িতে একাকী বসবাস করছেন। তাঁর প্রয়াত ছোট ভাই তপন কুমার চক্রবর্তী চৌধুরীরও কোনো সন্তান নেই। ফলে জমিদার পরিবারের উত্তরাধিকার ও বাড়িটির ভবিষ্যৎ সংরক্ষণ নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে।
মানবেন্দ্র বাবু এলাকার সমাজসেবক ও ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্ব হিসেবেও পরিচিত। তাঁর কোনো সন্তান না থাকায় বাড়িটির সংরক্ষণ ও সংস্কার নিয়েও তিনি চিন্তিত। তাঁর মতে, ঐতিহাসিক এ স্থাপনাটি যথাযথভাবে সংস্কার ও সংরক্ষণ করে পর্যটনকেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলা হলে এটি স্থানীয় অর্থনীতি ও সংস্কৃতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
প্রায় চারশ বছরের ইতিহাস, জমিদারি ঐতিহ্য, প্রাচীন স্থাপত্য, মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি এবং স্থানীয় জনজীবনের সঙ্গে দীর্ঘদিনের সম্পর্ক—সব মিলিয়ে গাঙ্গাটিয়া জমিদার বাড়ি কিশোরগঞ্জের ঐতিহাসিক স্থাপনাগুলোর মধ্যে বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। যথাযথ রক্ষণাবেক্ষণ, সংস্কার ও পরিচর্যার মাধ্যমে এই স্থাপনাটিকে সংরক্ষণ করা গেলে অতীতের এই গৌরবময় ইতিহাস ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছেও আরও তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।














Warning: Array to string conversion in /home/dkishoreganj/public_html/wp-content/plugins/gs-facebook-comments/public/class-wpfc-public.php on line 311
Array