দুই দশক পেরিয়েও মঙ্গলে সক্রিয় নাসার দুই মহাকাশযান
মঙ্গলে পৌঁছানোর পর দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে কাজ করে যাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রের মহাকাশ গবেষণা সংস্থা নাসার মহাকাশযান মার্স ওডিসি ও মার্স রিকনাইস্যান্স অরবিটার (এমআরও)। নির্ধারিত সময়ের চেয়ে অনেক বেশি দিন ধরে সক্রিয় থেকে মহাকাশ গবেষণায় প্রযুক্তির স্থায়িত্ব ও সক্ষমতার গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ হয়ে উঠেছে মহাকাশযান দুটি।
২০০১ সালের ২৪ অক্টোবর মঙ্গলে পৌঁছায় মার্স ওডিসি। অন্যদিকে, ২০০৬ সাল থেকে মঙ্গলকে প্রদক্ষিণ করে তথ্য সংগ্রহ করছে এমআরও। শুরুতে মহাকাশযান দুটিকে মাত্র কয়েক বছর কাজ করার উপযোগী করে তৈরি করা হলেও প্রত্যাশার চেয়ে অনেক বেশি সময় ধরে সেগুলো গবেষণায় অবদান রাখছে।
দীর্ঘদিন ধরে তথ্য সংগ্রহের ফলে মঙ্গল সম্পর্কে বিজ্ঞানীদের ধারণায় গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন এসেছে। বিশেষ করে, গ্রহটিতে অতীতে ও বর্তমানে পানির অস্তিত্ব সম্পর্কে নতুন তথ্য পাওয়া গেছে। বছরের পর বছর ধরে সংগৃহীত তথ্য মঙ্গলের ভূমির গঠন ও পরিবর্তন সম্পর্কে বিজ্ঞানীদের আরও স্পষ্ট ধারণা দিয়েছে। ফলে মঙ্গলকে শুধু প্রাণহীন পাথুরে গ্রহ হিসেবে দেখার পরিবর্তে এর পরিবেশ ও ভূপ্রকৃতির পরিবর্তনশীল বৈশিষ্ট্য নিয়েও গবেষণা করছেন তাঁরা।
যুক্তরাষ্ট্রের পারডু বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্রহবিজ্ঞানী ব্রায়নি হর্গান মঙ্গল গবেষণায় মহাকাশযান দুটির গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকার কথা তুলে ধরেছেন। তাঁর মতে, নাসার মঙ্গল অভিযানে মার্স ওডিসি ও এমআরও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। মঙ্গলে বরফের উপস্থিতি শনাক্ত ও পর্যবেক্ষণে মার্স ওডিসি উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রেখেছে। এর মাধ্যমে গ্রহটির জলবায়ু ও ভূতত্ত্ব সম্পর্কে নতুন তথ্য পেয়েছেন বিজ্ঞানীরা।
অন্যদিকে, মঙ্গলের পৃষ্ঠে সময়ের সঙ্গে কী ধরনের পরিবর্তন ঘটছে, তা পর্যবেক্ষণ করছে এমআরও। এর সংগৃহীত তথ্য থেকে বিজ্ঞানীরা জানতে পেরেছেন, গ্রহটির বিভিন্ন ভূপ্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্য কীভাবে সময়ের সঙ্গে পরিবর্তিত হচ্ছে।
মঙ্গলে পাঠানো বিভিন্ন রোবটযানের সঙ্গে পৃথিবীর সরাসরি যোগাযোগের সুযোগ সীমিত। তাই এসব রোবটযানের কাছ থেকে তথ্য সংগ্রহ করে পৃথিবীতে পাঠানোর কাজে মার্স ওডিসি ও এমআরও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। এই দুই মহাকাশযানসহ অন্যান্য মহাকাশযানের সমন্বিত যোগাযোগব্যবস্থা মঙ্গল অনুসন্ধানকে আরও কার্যকর করেছে।
মহাকাশে দীর্ঘদিন ধরে কাজ চালিয়ে যাওয়া অত্যন্ত কঠিন। মার্স ওডিসি ও এমআরওর দীর্ঘস্থায়ী সাফল্যের পেছনে রয়েছে উন্নত প্রযুক্তি, প্রকৌশলীদের দক্ষতা, বিভিন্ন কারিগরি সমস্যার সমাধান এবং কিছুটা সৌভাগ্য। মহাকাশে থাকা উচ্চশক্তির বিভিন্ন কণা মহাকাশযানের সংবেদনশীল যন্ত্রপাতির ক্ষতি করতে পারে। এসব ঝুঁকি মোকাবিলা করেই মহাকাশযান দুটিকে দীর্ঘদিন কার্যক্রম চালিয়ে যেতে হচ্ছে।
পৃথিবীর কক্ষপথে থাকা উপগ্রহগুলোর সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ ও সেগুলো পর্যবেক্ষণ করা সম্ভব হলেও মঙ্গলে থাকা মহাকাশযানের ক্ষেত্রে কাজটি অনেক বেশি কঠিন। অনেক সময় সপ্তাহে মাত্র এক বা দুইবার সেগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ করা যায়। যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়া, বার্কলির গ্রহ ও মহাকাশ পদার্থবিজ্ঞানী রব লিলিস বলেন, মঙ্গলে থাকা একটি মহাকাশযানকে বেশির ভাগ সময় নিজে নিজেই কাজ চালিয়ে যেতে হয়।
মার্স ওডিসি ও এমআরওর দীর্ঘস্থায়ী সাফল্যের পর মঙ্গল অনুসন্ধানের ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন করে ভাবছেন বিজ্ঞানীরা। এই দুই মহাকাশযানের মাধ্যমেই মঙ্গল গবেষণার একটি যুগের অবসান ঘটতে যাচ্ছে কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। প্রযুক্তির উন্নতির সঙ্গে ভবিষ্যতের মঙ্গল অভিযানে নতুন পদ্ধতি ব্যবহারের সম্ভাবনা রয়েছে, যা লাল গ্রহটি অনুসন্ধান ও গবেষণার পদ্ধতিতে বড় পরিবর্তন আনতে পারে।
তবে ভবিষ্যতের অভিযান নিয়ে অনিশ্চয়তা থাকলেও মার্স ওডিসি ও মার্স রিকনাইস্যান্স অরবিটারের দীর্ঘদিনের সাফল্য মঙ্গলসহ মহাকাশের অন্যান্য অংশ নিয়ে গবেষণায় গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখবে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।













Disqus comments are not configured yet.