গাছ, পরিবেশ ও আমাদের দায়িত্ব: রাজনীতির ঊর্ধ্বে সত্য অনুসন্ধান
গাছ বাঁচলে বাঁচবে জীবন, টিকে থাকবে পরিবেশ ও ভবিষ্যৎ
সম্প্রতি গাছ কাটা নিয়ে কিশোরগঞ্জসহ দেশজুড়ে আলোচনা চলছে। দুঃখজনকভাবে দেখা যাচ্ছে, কিছু ক্ষেত্রে বিষয়টিকে পরিবেশ সুরক্ষার মূল উদ্দেশ্য থেকে সরিয়ে রাজনৈতিক ইস্যুতে রূপ দেওয়ার অপচেষ্টা চলছে। একজন সাংবাদিক হিসেবে আমরা বিশ্বাস করি—সংবাদ পরিবেশনের মূল লক্ষ্য হবে সত্য উদ্ঘাটন ও জনস্বার্থ সংরক্ষণ, কোনো বিশেষ মহলের ফায়দা হাসিল নয়।
বার্তাকক্ষের দায়িত্বে থেকে আমরা প্রতিনিয়ত অনেক কিছু দেখি, শুনি এবং যাচাই করি। সেই অভিজ্ঞতা থেকেই বলা যায়—পরিবেশ, গাছ ও প্রকৃতি নিয়ে আলোচনা হওয়া উচিত তথ্যভিত্তিক, দায়িত্বশীল ও সমাধানমুখী। বিভ্রান্তি নয়, বরং জনসচেতনতা সৃষ্টিই হওয়া দরকার আমাদের প্রধান লক্ষ্য।
বাংলাদেশের পরিবেশ, জলবায়ু ও জীববৈচিত্র্য রক্ষায় গাছের গুরুত্ব অপরিসীম। অথচ নগরায়ন, অবাধ গাছ কর্তন ও অপরিকল্পিত উন্নয়নের কারণে দেশে সবুজায়ন উদ্বেগজনক হারে কমে যাচ্ছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, গাছ শুধু পরিবেশের সৌন্দর্য বাড়ায় না—মানুষের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার অন্যতম প্রধান ভিত্তি এটি।
গাছকে পৃথিবীর “প্রাণভোমরা” বলা হয়। গাছ বাতাস থেকে কার্বন ডাই-অক্সাইড শোষণ করে অক্সিজেন সরবরাহ করে, যা মানুষের বেঁচে থাকার জন্য অপরিহার্য। একই সঙ্গে গাছ পরিবেশের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ করে, বায়ুদূষণ ও শব্দদূষণ কমায় এবং ছায়া ও আশ্রয় প্রদান করে। ফলজ, বনজ ও ঔষধি গাছ মানুষের খাদ্য ও চিকিৎসার চাহিদা পূরণেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় গাছের অবদান অনস্বীকার্য। গাছের শিকড় মাটিকে দৃঢ় করে ধরে রাখে, ফলে ভূমিক্ষয় ও নদীভাঙন কমে। বৃষ্টিপাতের স্বাভাবিক চক্র বজায় রাখতেও গাছ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। পাখি, প্রাণী ও অসংখ্য কীটপতঙ্গের আবাসস্থল হিসেবে গাছ জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণের অন্যতম মাধ্যম।
বাংলাদেশ একটি জলবায়ু ঝুঁকিপূর্ণ দেশ। ঘূর্ণিঝড়, বন্যা, নদীভাঙন ও তাপপ্রবাহের মতো দুর্যোগ মোকাবিলায় গাছ প্রাকৃতিক ঢাল হিসেবে কাজ করে। উপকূলীয় অঞ্চলে ম্যানগ্রোভ বন ঝড়ের তীব্রতা কমায়, শহর এলাকায় গাছ ‘হিট আইল্যান্ড’ প্রভাব হ্রাস করে এবং গ্রামীণ অঞ্চলে কৃষি ও মাটির উর্বরতা রক্ষায় সহায়তা করে।
আইনের দৃষ্টিতেও গাছ কাটা একটি গুরুতর বিষয়। বন আইন, ১৯২৭ এবং পরিবেশ সংরক্ষণ আইন, ১৯৯৫ অনুযায়ী অনুমতি ছাড়া সরকারি বা সংরক্ষিত গাছ কাটা দণ্ডনীয় অপরাধ। রাস্তার পাশে, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বা সরকারি জমির গাছ কাটতে হলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অনুমতি বাধ্যতামূলক। আইন প্রয়োগের পাশাপাশি এই বিষয়ে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করাও জরুরি।
তবে বাস্তবতা হলো—কখনো কখনো উন্নয়ন, জননিরাপত্তা বা জরুরি প্রয়োজনে গাছ কাটার প্রয়োজন হতে পারে। সে ক্ষেত্রে যথাযথ কর্তৃপক্ষের অনুমতি, পরিবেশগত প্রভাব মূল্যায়ন এবং বিকল্প হিসেবে একাধিক গাছ রোপণের পরিকল্পনা থাকা অপরিহার্য। উন্নয়ন ও পরিবেশ—এই দুটির মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করাই হওয়া উচিত রাষ্ট্র ও সমাজের লক্ষ্য।
পরিবেশবিদরা মনে করেন, শুধু আইন থাকলেই হবে না—জনসচেতনতা বাড়াতে হবে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, স্থানীয় প্রশাসন, গণমাধ্যম ও নাগরিক সমাজকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে। প্রতিটি নাগরিকের দায়িত্ব—গাছ লাগানো, গাছ রক্ষা করা এবং অবৈধ গাছ কাটার বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়া।
গাছ শুধু প্রকৃতির অংশ নয়—এটি মানুষের জীবনরক্ষাকারী অনুষঙ্গ। গাছ বাঁচানো মানে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য দেশকে বাসযোগ্য করে রাখা। রাজনৈতিক বিতর্ক নয়, বরং পরিকল্পিত বৃক্ষরোপণ ও সংরক্ষণই হতে পারে টেকসই বাংলাদেশের পথ।
একটি গাছ একটি প্রাণ—সবুজেই টিকে থাকুক বাংলাদেশ।









Warning: Array to string conversion in /home/dkishoreganj/public_html/wp-content/plugins/gs-facebook-comments/public/class-wpfc-public.php on line 311
Array