কিশোরগঞ্জের শহীদ সৈয়দ নজরুল ইসলাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে (SSNIMCH) প্রায় ১২ কোটি টাকার একটি টেন্ডারে (টেন্ডার আইডি: ১২৫৭৯১-১২৫৭৯০১, আইএফটি নং: SSNIMCH/Kishore/e-Tender/2025-2026/550,তারিখ:১৩/০৪/২০২৬) ‘নিয়ন্ত্রিত প্রতিযোগিতা’ ও স্বচ্ছতা লঙ্ঘনের গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। ঢাকার মেডিকেল ডিভাইস সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান ‘বায়োকেয়ার’-এর পক্ষ থেকে দাখিলকৃত লিখিত অভিযোগ ও মাঠপর্যায়ের অনুসন্ধানে দেখা গেছে, টেন্ডার ডকুমেন্টের ‘অ্যাডিশনাল টার্মস অ্যান্ড কন্ডিশনস’ অংশে এমন একগুচ্ছ শর্ত যুক্ত করা হয়েছে, যা পাবলিক প্রকিউরমেন্ট অ্যাক্ট (পিপিএ) ২০০৬ ও পাবলিক প্রকিউরমেন্ট রুলস (পিপিআর) ২০০৮/২০২৫-এর মৌলিক নীতিমালা- স্বচ্ছতা, সমতা ও উন্মুক্ত প্রতিযোগিতার পরিপন্থী। অভিযোগে আরও দাবি করা হয়েছে, অতীতের একই ধরনের শর্তাবলি ব্যবহার করে নির্দিষ্ট একটি প্রতিষ্ঠান বা গোষ্ঠীকে বারবার কাজ পাইয়ে দেওয়ার প্যাটার্ন বিদ্যমান।
টেন্ডার ডকুমেন্ট পর্যালোচনায় দেখা যায়, স্ট্যান্ডার্ড টেন্ডার ডকুমেন্ট (STD)-এর বাইরে গিয়ে একাধিক অতিরিক্ত শর্ত আরোপ করা হয়েছে। অভিযোগপত্রে চিহ্নিত প্রধান শর্তগুলো হলো:
(১) চেম্বার অব কমার্স সনদ (জামানত রসিদসহ) বাধ্যতামূলক করা, যা পিপিআর/এসটিডিতে নির্ধারিত নয় এবং অপ্রয়োজনীয়ভাবে দরদাতাদের অংশগ্রহণ সীমিত করে। (২) টেন্ডার জমার আগে সব আইটেমের নমুনা (স্যাম্পল) জমা দেওয়ার বাধ্যবাধকতা, যা সরবরাহকারীদের ওপর অযৌক্তিক লজিস্টিক ও আর্থিক চাপ সৃষ্টি করে এবং সাবজেক্টিভ মূল্যায়নের মাধ্যমে ‘নন-রেসপন্সিভ’ ঘোষণার ঝুঁকি তৈরি করে। (৩) ডিভিসি নম্বর ও ই-জিপি যাচাইকৃত নির্দিষ্ট ফরম্যাটের অডিট রিপোর্ট চাওয়া, যা পিপিআর/এসটিডি-তে নির্ধারিত আর্থিক সক্ষমতার মানদণ্ডের বাইরে গিয়ে ক্ষুদ্র ও মাঝারি দরদাতাদের অংশগ্রহণে বাধা সৃষ্টি করতে পারে। (৪) নির্দিষ্ট তারিখের (০১/০৪/২০২৬-এর পরে স্বাক্ষরিত) একাধিক নোটারাইজড অ্যাফিডেভিট বাধ্যতামূলক করা, যা এসটিডি-তে নির্ধারিত ন্যূনতম ডকুমেন্টেশনের বাইরে এবং অপ্রয়োজনীয় প্রশাসনিক জটিলতা সৃষ্টি করে। (৫) কারণ দর্শানো ছাড়াই টেন্ডার বাতিল ও সর্বনিম্ন দর গ্রহণে বাধ্য না থাকার ক্ষমতা, যা পিপিএ-পিপিআর-এর স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নীতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক। (৬) প্রত্যাখ্যাত দরপত্রের বিষয়ে কোনো আপত্তি বা জিজ্ঞাসা নিষিদ্ধকরণ, অথচ পিপিআর অনুযায়ী দরদাতার অভিযোগ ও আপিলের আইনগত অধিকার রয়েছে। (৭) নোটিশ বা শুনানি ছাড়াই ব্ল্যাকলিস্টিংয়ের শর্ত, যা পিপিআর-এর যথাযথ নোটিশ, শুনানি ও প্রক্রিয়া অনুসরণের বিধানের পরিপন্থী।
বিশেষজ্ঞদের মতে, পিপিএ ২০০৬-এর ধারা ১১ এবং পিপিআর ২০০৮/২০২৫-এর ৯৮, ১২৭-১৩০ নম্বর বিধান অনুযায়ী সরকারি ক্রয়ে স্বচ্ছতা, প্রতিযোগিতা ও সমঅধিকার নিশ্চিত করা বাধ্যতামূলক। এসটিডি-এর বাইরে অতিরিক্ত ও বৈষম্যমূলক শর্ত আরোপ করলে তা ‘নিয়ন্ত্রিত প্রতিযোগিতা’ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান যেমন ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব নিউরোসায়েন্সেস (NINS) ও ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব কার্ডিওভাসকুলার ডিজিজেস (NICVD)-এর টেন্ডারে সাধারণত এসটিডি-অনুযায়ী সীমিত ও যুক্তিসঙ্গত শর্ত রাখা হয়, যা এখানে প্রশ্নবিদ্ধ।
অভিযোগপত্রে দাবি করা হয়েছে, বিগত বছরগুলোতেও একই ধরনের শর্ত প্রয়োগ করে নির্দিষ্ট একটি প্রতিষ্ঠানকে বারবার কাজ দেওয়া হয়েছে। ভিন্ন একটি হাসপাতালের তুলনামূলক বিবরণী (সিএস) এবং শহীদ সৈয়দ নজরুল ইসলাম মেডিকেল কলেজের ২০২০ সালের একটি কার্যাদেশের কপি পর্যালোচনায় দেখা যায়, সিএস-তে উল্লিখিত তিনটি প্রতিষ্ঠানের ঠিকানা একই। অভিযোগকারীর দাবি, ওই সিএস-এ অংশ নেওয়া তিনটি প্রতিষ্ঠানের মালিকানা একই ব্যক্তির, যা ‘নিয়ন্ত্রিত দরপত্র’-এর স্পষ্ট ইঙ্গিত দেয়। আরও উল্লেখ করেন, ওই প্রতিষ্ঠানের স্বত্বাধিকারী ২০২১ সালে মন্ত্রণালয় থেকে ফাইল গায়েবের মামলায় সিআইডি কর্তৃক গ্রেপ্তার হন, যার সংবাদ ১ নভেম্বর ২০২১ তারিখে একটি জাতীয় দৈনিকে প্রকাশিত হয়। বর্তমান টেন্ডারেও ওই প্রতিষ্ঠানের পক্ষে কাজ নিশ্চিত করতে হাসপাতালের কিছু কর্মকর্তা-কর্মচারীর ‘অস্বাভাবিক তৎপরতা’ রয়েছে বলে অভিযোগ করা হয়েছে। ২০২৪-এর গণঅভ্যুত্থান ও পরবর্তী সরকার পরিবর্তনের পরও হাসপাতালটির ক্রয় প্রক্রিয়ায় ‘পুরনো কালো ছায়া’ মুক্ত হয়নি বলে অভিযোগকারী পক্ষ দাবি করে।
মাঠপর্যায়ের অনুসন্ধানে দেখা গেছে, অভিযোগ গ্রহণ ও এ সংক্রান্ত কর্মকর্তাদের বক্তব্যে বেশ অসামঞ্জস্য রয়েছে। ২৯ এপ্রিল হাসপাতালের পরিচালক ডা. সাইফুল ইসলাম বলেন, “২২ এপ্রিল ২০২৬ তারিখের মধ্যে ‘বায়োকেয়ার’ নামক কোনো প্রতিষ্ঠান থেকে আমি কোনো অভিযোগ পাইনি। টেন্ডারে সব নিয়মকানুন মেনেই শর্ত দেওয়া হয়েছে। কোনো বিতর্কিত শর্ত থাকার প্রশ্নই নেই।”
অথচ, হাসপাতালের হিসাবরক্ষক মাহফুজা আক্তার রিক্তার স্বাক্ষরে ২২/০৪/২০২৬ তারিখে বায়োকেয়ারের স্বত্বাধিকারী মো. হারুন-অর-রশীদ খানের অভিযোগপত্র গ্রহণের প্রমাণ প্রতিবেদকের হাতে রয়েছে। এ বিষয়ে হিসাবরক্ষক মাহফুজা আক্তার রিক্তা ফোনে বলেন, “রিসিভ করে আমি পত্রিকার বিল মনে করে আমার কলিগের কাছে দিয়েছিলাম। ওইদিন কলিগ উপস্থিত না থাকায় আমি গ্রহণ করে রেখে দিই।” তার সহকর্মী বলেন, “এটা (টেন্ডারের অভিযোগ) নিয়ে আমি প্রতিদিন খুঁজি, কে দিলো, কেন দিলো? আগামীকাল স্যারের কাছে জমা দেব। আমি তো এটা ড্রয়ারে দেখে পত্রিকার বিল মনে করেছিলাম।”
গুরুত্বপূর্ণ পদে থাকা কর্মকর্তাদের এমন বেখেয়ালি মন্তব্য রহস্যের জন্ম দিয়েছে। অফিসিয়াল প্যাডে স্পষ্ট বিষয়, প্রেরকের নাম, ফোন ও ইমেইল থাকার পরও ‘পত্রিকার বিল’ বলে উড়িয়ে দেওয়ার বিষয়টি তদন্ত সাপেক্ষ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। ৩০ এপ্রিল পরিচালক ডা. সাইফুল ইসলাম পুনরায় ফোনে বলেন, “আমাদের টেন্ডার হয় অনলাইনে, অভিযোগও করতে হবে অনলাইনে। হার্ডকপির কোনো সুযোগ নেই। দুজন অভিযোগ করেছে, দুজনের উত্তর দেওয়া হয়েছে।” তবে অধীনস্থ কর্মকর্তাদের মাধ্যমে হার্ডকপি গ্রহণের বিষয়টি তিনি কৌশলে এড়িয়ে যান। কিশোরগঞ্জের সিভিল সার্জন ডা. অভিজিত শর্মার কাছে এ বিষয়ে জানতে চাওয়া হলে তিনি জানান, বিষয়টি তার আওতাধীন নয়।
বায়োকেয়ারের স্বত্বাধিকারী মো. হারুন-অর-রশীদ খান বলেন, “২০১৯ সাল থেকে আমি কিশোরগঞ্জ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের টেন্ডারে অংশ নিচ্ছি। কিন্তু এখানে এমন শর্ত আরোপ করা হয়, যা স্বচ্ছতা ও উন্মুক্ত প্রতিযোগিতার পরিপন্থী। একই ধরনের শর্ত অন্য প্রতিষ্ঠানেও দেখেছি। প্রতিযোগিতায় একই ঠিকানার তিনটি প্রতিষ্ঠান অংশ নেওয়ায় ‘নিয়ন্ত্রিত দরপত্র’-এর ইঙ্গিত মেলে। এসব শর্ত নির্দিষ্ট ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানকে সুযোগ দিতেই আরোপ করা হয়েছে।”
তিনি বিতর্কিত শর্তগুলো অবিলম্বে বাতিল বা সংশোধন করে পিপিএ-পিপিআর অনুযায়ী টেন্ডার পুনঃপ্রকাশের দাবি জানান। অন্যথায় সরকারের কেন্দ্রীয় ক্রয় কারিগরি ইউনিট (CPTU), বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগ (IMED) ও স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়সহ সংশ্লিষ্ট তদন্তকারী সংস্থার কাছে বিষয়টি উত্থাপনসহ প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার হুঁশিয়ারি দেন।
সরকারি ক্রয়ে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে পিপিএ-পিপিআর ও এসটিডি-এর বিধান কঠোরভাবে পালন করা বাধ্যতামূলক। অতিরিক্ত ও বৈষম্যমূলক শর্ত আরোপ, অভিযোগ গ্রহণে অনীহা এবং কর্মকর্তাদের পরস্পরবিরোধী বক্তব্য স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্নের জন্ম দেয়। বিশেষ করে যেখানে অতীতে একই মালিকানাধীন একাধিক প্রতিষ্ঠানের অংশগ্রহণের প্রমাণ এবং হার্ডকপি গ্রহণে ‘পত্রিকার বিল’-এর মতো অস্বাভাবিক ব্যাখ্যা উঠে এসেছে, সেখানে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নিরপেক্ষ তদন্ত ও স্বচ্ছ ব্যাখ্যা প্রত্যাশিত।
কিশোরগঞ্জের শহীদ সৈয়দ নজরুল ইসলাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ, কেন্দ্রীয় ক্রয় কারিগরি ইউনিট (সিপিটিইউ), বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগ (IMED) ও স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের দ্রুত হস্তক্ষেপ ছাড়া এই টেন্ডার প্রক্রিয়া নিয়ে ওঠা প্রশ্নের নিরসন কঠিন হবে। জনগণের করের টাকায় পরিচালিত স্বাস্থ্যখাতে স্বচ্ছ ক্রয় প্রক্রিয়া নিশ্চিত করা কেবল আইনি বাধ্যবাধকতা নয়, বরং নাগরিক অধিকারেরও দাবি।