ফুটবলে অতীতের অর্জন, ব্যক্তিগত রেকর্ড কিংবা কোটি ভক্তের ভালোবাসা—কোনোটিই বিশ্বকাপের নকআউট পর্বে নিশ্চিত নিরাপত্তা দেয় না। কয়েক দিনের ব্যবধানে সেই নির্মম বাস্তবতার শিকার হয়েছেন দুই মহাতারকা নেইমার জুনিয়র ও ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো। দুজনেরই শেষ বিশ্বকাপ শেষ হয়েছে চোখের জলে। এখন গোটা ফুটবল বিশ্ব তাকিয়ে আছে আরেক কিংবদন্তি লিওনেল মেসির দিকে। আজ আর্জেন্টিনা জিতবে, নাকি বিশ্বমঞ্চে আরেকটি অশ্রুসিক্ত বিদায়ের সাক্ষী হবে ফুটবল?

বিশ্বকাপের নকআউট পর্ব বরাবরই অনিশ্চয়তার অন্য নাম। একটি ভুল, একটি মিস কিংবা একটি মুহূর্ত বদলে দিতে পারে ইতিহাস। সেই কারণেই এবার ব্রাজিল ও পর্তুগালের বিদায় ফুটবলপ্রেমীদের মনে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে—তবে কি এবার মেসিরও শেষ বিশ্বকাপ এমন করেই শেষ হবে?

মেটলাইফেই শুরু, মেটলাইফেই শেষ নেইমারের আন্তর্জাতিক অধ্যায়

নিউ জার্সির মেটলাইফ স্টেডিয়ামে নরওয়ের কাছে ২-১ গোলে হেরে বিশ্বকাপের শেষ ষোলো থেকেই বিদায় নিয়েছে ব্রাজিল। বদলি হিসেবে নেমে যোগ করা সময়ে পেনাল্টি থেকে গোল করলেও দলের হার ঠেকাতে পারেননি নেইমার।

শেষ বাঁশি বাজতেই কান্নায় ভেঙে পড়েন ব্রাজিলের সর্বকালের সর্বোচ্চ গোলদাতা। পরে ব্রাজিলিয়ান গণমাধ্যমে দেওয়া প্রতিক্রিয়ায় ইঙ্গিত দেন, জাতীয় দলের জার্সিতে এটাই ছিল তার শেষ ম্যাচ।

বিশেষ এক কাকতালীয় ঘটনাও জড়িয়ে রইল তার বিদায়ে। ২০১০ সালে যুক্তরাষ্ট্রের বিপক্ষে ঠিক এই মেটলাইফ স্টেডিয়ামেই ব্রাজিলের হয়ে অভিষেক হয়েছিল নেইমারের। ১৬ বছর পর একই মাঠেই শেষ হলো তার আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ার।

সংখ্যার হিসেবে নেইমারের ক্যারিয়ার ঈর্ষণীয়—

কিন্তু শিরোপার তালিকায় রয়েছে কেবল ২০১৩ সালের কনফেডারেশন্স কাপ। অলিম্পিক স্বর্ণ জিতলেও বিশ্বকাপের ট্রফি অধরাই থেকে গেল।

বিশ্বকাপ ছুঁতে পারলেন না রোনালদোও

স্পেনের কাছে ১-০ গোলে হেরে বিদায় নিয়েছে পর্তুগাল। শেষ বাঁশির পর অশ্রু লুকাতে পারেননি ৪১ বছর বয়সী ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো।

এটাই ছিল তার ষষ্ঠ ও শেষ বিশ্বকাপ।

দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে ক্লাব ফুটবলে প্রায় সবকিছু জয় করা রোনালদোর ক্যারিয়ারে অপূর্ণ থেকে গেল একমাত্র বিশ্বকাপ।

তবে বিদায়বেলায়ও রেখে গেলেন ইতিহাস।

রোনালদোর বিশ্বকাপ রেকর্ড

পর্তুগালের সাবেক কোচ রবার্তো মার্টিনেজ বলেন,

“বিশ্বকাপ জেতাই ছিল তার স্বপ্ন। অধিনায়ক হিসেবে নিজের সর্বোচ্চটা দিয়েছেন। ফুটবলের ইতিহাসে তিনি চিরকাল একজন আইকন হয়ে থাকবেন।”

দুই কিংবদন্তির অশ্রু, এবার চোখ মেসির দিকে

নেইমার কাঁদলেন।

রোনালদো কাঁদলেন।

আজ মাঠে নামছেন লিওনেল মেসি।

বিশ্বকাপে মেসির নাম মানেই কোটি মানুষের আবেগ। ২০২২ সালে বিশ্বকাপ জিতে নিজের সবচেয়ে বড় অপূর্ণতা ঘুচিয়েছিলেন তিনি। কিন্তু চার বছর পর আরেকটি বিশ্বকাপ অভিযানে আবারও অনিশ্চয়তার মুখোমুখি আর্জেন্টিনা।

নকআউটে কোনো ফেভারিট নেই। অতীতে জার্মানি, স্পেন, ব্রাজিল কিংবা ফ্রান্স—সবাই এই বাস্তবতা দেখেছে।

তাই আজকের ম্যাচ ঘিরে একটাই প্রশ্ন-  শেষ হাসিটা কি মেসির হবে, নাকি বিশ্ব ফুটবল আরও একটি কিংবদন্তির অশ্রুসিক্ত বিদায় দেখবে?

ইতিহাস বলছে, বিশ্বকাপ কাউকে ছাড় দেয় না

বিশ্বকাপের সৌন্দর্যই হলো এর নিষ্ঠুরতা।

পেলে, মারাদোনা, জিদান, রোনালদো নাজারিও—প্রত্যেক কিংবদন্তির ক্যারিয়ারে বিশ্বকাপ লিখেছে গৌরব, আবার বেদনাও।

এবার সেই তালিকায় যোগ হয়েছে নেইমার ও ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদোর নাম।

একজন বিদায় নিলেন নিজের শুরু হওয়া স্টেডিয়ামেই।

আরেকজন বিদায় নিলেন ইতিহাসের প্রথম ফুটবলার হিসেবে ছয়টি বিশ্বকাপে গোল করার রেকর্ড রেখে।

বিশ্বকাপের মঞ্চে এখন আর ব্যক্তিগত রেকর্ডের মূল্য নেই। বেঁচে থাকার লড়াই।

আজ জিতলে আর্জেন্টিনা এগিয়ে যাবে আরেক ধাপ।

হারলে শেষ হয়ে যাবে মেসির বিশ্বকাপ অধ্যায়ও।

দুই কিংবদন্তির চোখের জল ইতোমধ্যেই বিশ্বজুড়ে ফুটবলপ্রেমীদের আবেগে ভাসিয়েছে।

এখন পুরো ফুটবল বিশ্বের দৃষ্টি এক মানুষকে ঘিরে-  লিওনেল মেসি কি হাসিমুখে কোয়ার্টার ফাইনালের পথে হাঁটবেন, নাকি বিশ্বকাপ আরেকটি অশ্রুসিক্ত বিদায়ের গল্প লিখবে?

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *