গোলপোস্টের প্রহরীরাই লিখছেন বিশ্বকাপের নতুন গল্প
বিশ্বকাপে প্রথমবার অংশ নিয়েই ফুটবল বিশ্বকে চমকে দিয়েছে কুরাসাও, কেপ ভার্দে ও ডিআর কঙ্গোর মতো দেশগুলো। প্রত্যাশার চেয়েও ভালো পারফরম্যান্স করে তারা জায়গা করে নিয়েছে আলোচনার কেন্দ্রে। আর এই সাফল্যের পেছনে সবচেয়ে বড় অবদান রেখেছেন দলগুলোর গোলরক্ষকেরা। ভোজিনহা, অরল্যান্ডো গিল, লিওনেল এমপাসি, এলয় রুম ও আলিরেজার মতো গোলকিপাররা দুর্দান্ত নৈপুণ্যে নিজেদের অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছেন।
কেপ ভার্দের অভিজ্ঞ গোলরক্ষক ভোজিনহা চার ম্যাচে আটটি নিশ্চিত গোল রক্ষা করে আলোচনায় এসেছেন। স্পেনের বিপক্ষে একাই সাতটি এবং আর্জেন্টিনার বিপক্ষে আটটি গুরুত্বপূর্ণ সেভ করেন তিনি। এমনকি লিওনেল মেসির শটও প্রতিহত করেছেন ৪০ বছর বয়সী এই গোলরক্ষক। আর্জেন্টিনার বিপক্ষে গোল হজমের পর যখন সতীর্থরা হতাশ হয়ে পড়েছিলেন, তখন তাদের সাহস জুগিয়ে দলকে লড়াইয়ে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করেন ভোজিনহা।
কুরাসাওয়ের গোলরক্ষক এলয় রুমও নজর কেড়েছেন নিজের পারফরম্যান্সে। জার্মানির কাছে ৭-০ গোলে হারের পর ডার্ক হর্স ইকুয়েডরের বিপক্ষে ১৫টি সেভ করে বিশ্বকাপে রেকর্ড গড়েন তিনি। তার অসাধারণ নৈপুণ্যে কুরাসাও প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপে মূল্যবান একটি পয়েন্ট অর্জন করে। যদিও শেষ পর্যন্ত দ্বিতীয় রাউন্ডে উঠতে পারেনি ক্যারিবীয় দ্বীপদেশটি।
বিশ্বকাপের অন্যতম বড় অঘটনের নায়ক ডিআর কঙ্গোর গোলরক্ষক অরল্যান্ডো গিল। রাউন্ড অব ৩২-এ জার্মানির বিপক্ষে শুধু নির্ধারিত সময়েই দুর্ভেদ্য ছিলেন না, টাইব্রেকারেও দুটি শট ঠেকিয়ে চারবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়নদের বিদায় নিশ্চিত করেন।
তবে মাঠের সাফল্যের পেছনে রয়েছে তার সংগ্রামের গল্পও। কয়েক বছর আগে সদ্যজাত সন্তানের চিকিৎসার ব্যয় মেটাতে নিজের জার্সি, বুটসহ বিভিন্ন ক্রীড়া সামগ্রী বিক্রি করতে হয়েছিল তাকে। জার্মানির বিপক্ষে ম্যাচসেরা হওয়ার পর সেই পুরস্কার অসুস্থ ভাইপোকে উৎসর্গ করেন গিল।
বেলজিয়ামের বিপক্ষে গোলশূন্য ড্র করা ম্যাচে ইরানের নায়ক ছিলেন ৬ ফুট ৪ ইঞ্চি উচ্চতার গোলরক্ষক আলিরেজা। তিনি একাই সাতটি দুর্দান্ত সেভ করে দলকে গুরুত্বপূর্ণ এক পয়েন্ট এনে দেন।
ইরানের লোরেস্তান প্রদেশের দরিদ্র যাযাবর কুর্দি লাক পরিবারে জন্ম নেওয়া আলিরেজার শৈশব কেটেছে চরম অভাব-অনটনের মধ্যে। ফুটবলার হওয়ার স্বপ্নে কিশোর বয়সে বাড়ি ছেড়ে তেহরানে চলে যান। জীবিকা নির্বাহের জন্য ঝাড়ুদার, গাড়ি ধোয়া ও টায়ার পরিষ্কারের মতো নানা কাজ করেছেন তিনি। সেই আলিরেজার হাতেই এবার আটকে যান কেভিন ডি ব্রুইনে ও রোমেলু লুকাকুর মতো তারকা ফুটবলারের শট।
রাউন্ড অব ৩২-এ কলম্বিয়ার কাছে হেরে ঘানার বিশ্বকাপ যাত্রা শেষ হলেও গোলরক্ষক লরেন্স আলি জিঘি ও বেনজামিন আসারে আলোচনায় ছিলেন। ইংল্যান্ডের বিপক্ষে আসারের অসাধারণ গোলরক্ষণের কারণে ঘানা গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচে লড়াই ধরে রাখতে সক্ষম হয়।
ঘানার স্থানীয় ক্লাব হার্টস অব ওক-এর হয়ে খেলেন আসারে। ফিফার নিয়ম অনুযায়ী, বিশ্বকাপে অংশ নেওয়ার জন্য কোনো ক্লাব খেলোয়াড় ছাড়লে প্রতিদিন খেলোয়াড়প্রতি নির্দিষ্ট অর্থ পায় সংশ্লিষ্ট ক্লাব। সেই বিবেচনাতেও আসারের অংশগ্রহণ ক্লাবটির জন্য গুরুত্বপূর্ণ ছিল।
ডিআর কঙ্গোর গোলরক্ষক লিওনেল এমপাসিও ছিলেন টুর্নামেন্টের অন্যতম আলোচিত পারফরমার। ৫২ বছর পর বিশ্বকাপের মূলপর্বে ফিরে প্রথমেই পর্তুগালকে রুখে দেন তিনি। এরপর ইংল্যান্ডের বিপক্ষেও অন্তত তিনটি নিশ্চিত গোল প্রতিহত করে দলের অন্যতম নায়ক হয়ে ওঠেন।
এ ছাড়া চেক প্রজাতন্ত্রের মাতেজ কোভার এবং আইভরি কোস্টের এদুয়ার্দ মেন্ডিও নিজেদের পারফরম্যান্স দিয়ে প্রশংসা কুড়িয়েছেন।
বিশ্বকাপের ইতিহাসে গোলকিপারদের আলোচনায় আরেকটি পরিচিত নাম গিয়ের্মো ওচোয়া। মেক্সিকোর এই অভিজ্ঞ গোলরক্ষক প্রায় প্রতিটি বিশ্বকাপেই অসাধারণ নৈপুণ্য দেখিয়ে ফুটবলপ্রেমীদের মুগ্ধ করেছেন।
এবার প্রথম একাদশে নিয়মিত সুযোগ না পেলেও চেক প্রজাতন্ত্রের বিপক্ষে ৭৭ মিনিটে বদলি হিসেবে মাঠে নামেন তিনি। ম্যাচ শেষে গোলপোস্টে চুম্বন করে বিশ্বকাপকে বিদায় জানান ওচোয়া। এ সময় সতীর্থ, কোচিং স্টাফ ও দলের সদস্যরা তাকে আবেগঘন বিদায় জানান।
বিশ্বকাপের এবারের আসরে বড় বড় তারকাদের পাশাপাশি অখ্যাত দেশগুলোর গোলরক্ষকেরাও নিজেদের অসাধারণ পারফরম্যান্স দিয়ে প্রমাণ করেছেন, আধুনিক ফুটবলে একটি দলের সাফল্যের পেছনে একজন দক্ষ গোলকিপারের ভূমিকা কতটা গুরুত্বপূর্ণ।










