বৃষ্টির পানিতে ব্যাহত পাঠদান, দীর্ঘদিনেও হয়নি বিদ্যালয়ের ভবন
সামান্য বৃষ্টি হলেই টিনের ছাউনি ভেদ করে শ্রেণিকক্ষে পানি পড়ে। বেঞ্চ সরিয়ে, কখনো গাদাগাদি করে, আবার কখনো পাঠদান বন্ধ রেখেই চলে শিক্ষা কার্যক্রম। দুই দফা মাটি পরীক্ষা, প্রকৌশলীদের একাধিক পরিদর্শন এবং ভবন নির্মাণের আশ্বাস মিললেও কিশোরগঞ্জের বাজিতপুর উপজেলার হিলচিয়া পশ্চিমপাড়া আব্দুল মান্নাফ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে গত আট বছরেও নির্মিত হয়নি নতুন ভবন। ফলে ১৫১ জন কোমলমতি শিক্ষার্থী প্রতিদিনই ঝুঁকিপূর্ণ টিনশেড ভবনে পাঠ নিতে বাধ্য হচ্ছে।
জানা গেছে, বিদ্যালয়টি ১৯৯৮ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় এবং ২০১৩ সালের ১ জানুয়ারি সরকারিকরণ করা হয়। বিদ্যালয়ের জন্য জমি দান করেন বীর মুক্তিযোদ্ধা মো. আব্দুল মান্নাফ। হিলচিয়া মৌজার খতিয়ান নম্বর ২৫৯/৯৩ এবং দাগ নম্বর ৩১৪৭/৪১৬৭-এর জমিতে প্রতিষ্ঠিত বিদ্যালয়টিতে বর্তমানে ১৫১ জন শিক্ষার্থী অধ্যয়ন করছে। এর মধ্যে ৮৬ জন ছাত্রী ও ৬৫ জন ছাত্র। অনুমোদিত ছয়টি শিক্ষক পদের বিপরীতে বর্তমানে কর্মরত রয়েছেন পাঁচজন শিক্ষক।
উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিস সূত্রে জানা গেছে, বাজিতপুর উপজেলার ১১১টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মধ্যে বর্তমানে মাত্র তিনটি বিদ্যালয়ে এখনো টিনশেড ভবনে পাঠদান চলছে। এর মধ্যে রয়েছে হিলচিয়া পশ্চিমপাড়া আব্দুল মান্নাফ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, বাজিতপুর পৌর এলাকার গোলক চন্দ্র সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় এবং মিরাবন সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়।
সরেজমিনে দেখা যায়, বিদ্যালয়ের বর্তমান ভবনের দৈর্ঘ্য প্রায় ৫৪ ফুট এবং প্রস্থ ২৩ ফুট। অফিস কক্ষসহ মাত্র চারটি কক্ষ থাকায় শিক্ষার্থীদের গাদাগাদি করে পাঠ গ্রহণ করতে হয়। বর্ষা মৌসুমে টিনের ছাউনি দিয়ে পানি পড়ায় শ্রেণিকক্ষের স্বাভাবিক পরিবেশ নষ্ট হয়। অনেক সময় বেঞ্চ সরিয়ে ক্লাস নিতে হয়, আবার কখনো পাঠদান ব্যাহত হয়।
বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক মোছা. মাহবুবা সুলতানা বলেন, “বিদ্যালয়ের নতুন ভবনের জন্য ২০১৮ সালে একবার এবং ২০২৩ সালে আবার মাটি পরীক্ষা করা হয়েছে। একাধিকবার প্রকৌশলীরা এসে পরিমাপও করেছেন। পরিকল্পনা অনুযায়ী এখানে ১০০ ফুট দৈর্ঘ্যের আট কক্ষবিশিষ্ট একটি ভবন নির্মাণ হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু একই সময়ে যেসব বিদ্যালয়ের মাটি পরীক্ষা করা হয়েছিল, সেসব বিদ্যালয়ে ভবন নির্মাণ শেষ হলেও আমাদের বিদ্যালয়টি এখনো টিনশেড ভবনেই পরিচালিত হচ্ছে।”
তিনি আরও বলেন, “বিদ্যালয়ের পেছনে একটি পুকুর রয়েছে। ভবন নির্মাণের জন্য কিছু অংশ ভরাট করা প্রয়োজন। জমিদাতা নিজ উদ্যোগে কিছু মাটি ভরাট করেছেন। আরও প্রায় ১৮ হাজার ঘনফুট মাটি ভরাট করা গেলে ভবন নির্মাণের কাজ এগিয়ে নেওয়া সম্ভব হবে। এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের জরুরি উদ্যোগ প্রয়োজন।”
বিদ্যালয়ের জমিদাতা বীর মুক্তিযোদ্ধা মো. আব্দুল মান্নাফ বলেন, “বিদ্যালয়ের উন্নয়নের স্বার্থে আমি নিজ খরচে প্রায় সাড়ে চার লাখ টাকা ব্যয়ে মাটি ভরাট করেছি। শিক্ষার্থীদের নিরাপদ ও সুন্দর পরিবেশে পড়াশোনার সুযোগ নিশ্চিত করতে জমি দান করেছি। এখন দ্রুত নতুন ভবন নির্মাণ করা অত্যন্ত জরুরি।”
বাজিতপুর উপজেলা সহকারী প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মো. সফিকুল ইসলাম বলেন, “বিদ্যালয়টির নতুন ভবন নির্মাণের বিষয়ে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে প্রয়োজনীয় প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে। বিষয়টি বর্তমানে প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। বরাদ্দ পাওয়া গেলে বিদ্যালয়টিকে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে ভবন নির্মাণের আওতায় আনা হবে।”
বাজিতপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) জালাল উদ্দিন বলেন, “বিদ্যালয়টির বর্তমান পরিস্থিতি সম্পর্কে খোঁজ নিয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। শিক্ষার্থীদের নিরাপদ শিক্ষার পরিবেশ নিশ্চিত করতে প্রশাসনের পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় সহযোগিতা করা হবে।”
স্থানীয় অভিভাবকদের অভিযোগ, বছরের পর বছর ধরে শুধু আশ্বাস মিললেও নতুন ভবনের কাজ শুরু হয়নি। বর্ষা এলেই শিক্ষার্থীদের দুর্ভোগ কয়েকগুণ বেড়ে যায়। তারা দ্রুত মাটি ভরাট, ভবনের অনুমোদন এবং নির্মাণকাজ শুরু করে শিক্ষার্থীদের জন্য নিরাপদ ও আধুনিক শিক্ষার পরিবেশ নিশ্চিত করার দাবি জানান।
শিক্ষাবিদদের মতে, প্রাথমিক শিক্ষার মানোন্নয়নে নিরাপদ ও উপযোগী অবকাঠামো নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি। ঝুঁকিপূর্ণ ভবনে শিক্ষা কার্যক্রম অব্যাহত থাকলে শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা যেমন বিঘ্নিত হয়, তেমনি পাঠদানের পরিবেশও মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তাই বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন।














Warning: Array to string conversion in /home/dkishoreganj/public_html/wp-content/plugins/gs-facebook-comments/public/class-wpfc-public.php on line 311
Array