সরকারের বিভিন্ন ক্যাডারে নিয়মিত পদোন্নতি হলেও বাংলাদেশ পুলিশের উচ্চপর্যায়ে পদোন্নতির প্রক্রিয়া দীর্ঘদিন ধরে আটকে আছে। অতিরিক্ত মহাপরিদর্শক (অতিরিক্ত আইজিপি) ও উপমহাপরিদর্শক (ডিআইজি) পর্যায়ে একাধিক পদ শূন্য থাকার পরও প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত না হওয়ায় পদোন্নতি দেওয়া যাচ্ছে না। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ভাষ্য, প্রয়োজনীয় নথিপত্র ও যাচাই-বাছাইয়ের প্রক্রিয়া শেষ হলেও মন্ত্রিপরিষদ সচিবের সভাপতিত্বে সুপিরিয়র সিলেকশন বোর্ডের (এসএসবি) সভা আহ্বান না হওয়ায় পুরো প্রক্রিয়া থমকে আছে।
উচ্চপর্যায়ের পদোন্নতি আটকে থাকায় এর প্রভাব পড়ছে নিচের ধাপেও। এতে একদিকে পুলিশের নেতৃত্বের স্বাভাবিক ধারাবাহিকতা ব্যাহত হচ্ছে, অন্যদিকে দীর্ঘদিন পদোন্নতির অপেক্ষায় থাকা কর্মকর্তাদের মধ্যে হতাশা ও মনোবল কমে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও পুলিশ অধিদপ্তরের একাধিক সূত্র জানায়, পদোন্নতির জন্য সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের কর্মজীবনের বিবরণ, বার্ষিক গোপনীয় প্রতিবেদন (এসিআর), গোয়েন্দা সংস্থার ভেটিং প্রতিবেদনসহ প্রয়োজনীয় নথিপত্র ইতোমধ্যে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। এখন এসএসবি সভা আহ্বান করে পদোন্নতির বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার অপেক্ষা।
পুলিশের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, অতিরিক্ত আইজিপি পর্যায়ে পদোন্নতি হলে পরবর্তী ধাপে ডিআইজি পদে শূন্যতা তৈরি হবে। এতে নিচের ধাপের কর্মকর্তাদেরও পদোন্নতির সুযোগ সৃষ্টি হবে। ফলে উচ্চপর্যায়ের একটি সিদ্ধান্তের মাধ্যমে দীর্ঘদিনের পদোন্নতি-জট অনেকটাই কাটতে পারে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, সাবেক আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে বিভিন্ন কারণে পদোন্নতি থেকে বঞ্চিত হওয়া বেশ কিছু কর্মকর্তা বর্তমানে পদোন্নতির অপেক্ষায় রয়েছেন। জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর অতিরিক্ত আইজিপি, ডিআইজি ও অতিরিক্ত ডিআইজি পর্যায়ের ১৪১ কর্মকর্তাকে অবসরে পাঠানো হলেও প্রত্যাশিত সংখ্যায় নিয়মিত পদ শূন্য হয়নি।
সূত্রগুলো বলছে, এর অন্যতম কারণ হলো সাবেক সরকারের সময়ে নিয়মিত পদের বাইরে অতিরিক্ত বা সুপারনিউমারারি পদ সৃষ্টি করে পদোন্নতি দেওয়ার নজির। বর্তমান সরকার সুপারনিউমারারি পদে পদোন্নতি না দিয়ে প্রয়োজন অনুযায়ী নতুন নিয়মিত পদ সৃষ্টির সিদ্ধান্ত নিয়েছে বলে জানা গেছে। এ বিষয়ে পুলিশ সদর দপ্তরের একাধিক দল কাজ করছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রের হিসাবে, বাংলাদেশ পুলিশের নিয়মিত ডিআইজি পদের সংখ্যা ৮৭। এর মধ্যে বর্তমানে ৮২টি পদে কর্মকর্তা কর্মরত রয়েছেন। ফলে পাঁচটি পদ শূন্য রয়েছে। পুলিশের বিসিএস ২০ ব্যাচের বেশ কয়েকজন কর্মকর্তা ডিআইজি পদে পদোন্নতির অপেক্ষায় রয়েছেন।
অতিরিক্ত আইজিপি পর্যায়ে গ্রেড-২-এর ২০টি এবং গ্রেড-১-এর দুটি—মোট ২২টি পদ রয়েছে। এর মধ্যে পাঁচটি পদ শূন্য রয়েছে। এ ছাড়া অতিরিক্ত আইজিপি পর্যায়ে পাঁচটি সুপারনিউমারারি পদ রয়েছে। পুলিশের বিসিএস ১৭ ও ১৮ ব্যাচের কয়েকজন কর্মকর্তা এই পর্যায়ে পদোন্নতির অপেক্ষায় রয়েছেন।
পুলিশ অধিদপ্তর সম্প্রতি অতিরিক্ত আইজিপি ও ডিআইজি পদে পদোন্নতির জন্য ১৪ কর্মকর্তার একটি তালিকা স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়েছে। তালিকার সঙ্গে প্রয়োজনীয় নথিপত্রও সংযুক্ত করা হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
এখন মন্ত্রিপরিষদ সচিবের সভাপতিত্বে এসএসবি সভা অনুষ্ঠিত হলে পদোন্নতির বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া সম্ভব হবে বলে মনে করছেন কর্মকর্তারা।
পুলিশের একাধিক কর্মকর্তার মতে, অতিরিক্ত আইজিপি পদে পাঁচজনকে পদোন্নতি দেওয়া হলে সমসংখ্যক ডিআইজি পদ শূন্য হবে। এরপর ডিআইজি পদে পদোন্নতি দেওয়া হলে নিচের ধাপেও পদোন্নতির সুযোগ তৈরি হবে। অর্থাৎ উচ্চপর্যায়ের পদোন্নতির একটি সিদ্ধান্ত পুরো পদোন্নতি-শৃঙ্খলকে সচল করতে পারে।
পুলিশের একাধিক কর্মকর্তা বলছেন, প্রশাসন ক্যাডারে ধারাবাহিকভাবে পদোন্নতি হলেও পুলিশের ক্ষেত্রে একই গতি দেখা যাচ্ছে না।
সম্প্রতি প্রশাসন ক্যাডারের ২৫ ব্যাচের কর্মকর্তাদের যুগ্ম সচিব পদে পদোন্নতি দেওয়া হয়েছে। এর প্রায় এক বছর আগে ২৪ ব্যাচের কর্মকর্তারাও যুগ্ম সচিব পদে পদোন্নতি পেয়েছেন। অথচ পুলিশের ২৪ ব্যাচের একটি বড় অংশ এখনও অতিরিক্ত ডিআইজি পদে কর্মরত।
একইভাবে পুলিশের ২৫ ব্যাচের কর্মকর্তাদের অতিরিক্ত ডিআইজি পদে পদোন্নতির জন্য বিভাগীয় পদোন্নতি কমিটির (ডিপিসি) সভাও এখনো আহ্বান করা হয়নি বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
অন্যদিকে পুলিশের ৩০ ব্যাচের অনেক কর্মকর্তা দীর্ঘদিন ধরে পুলিশ সুপার (এসপি) পদে পদোন্নতির যোগ্য হলেও এখনো পদোন্নতি পাননি। বিপরীতে প্রশাসন ক্যাডারের ৩০ ব্যাচের উল্লেখযোগ্যসংখ্যক কর্মকর্তা পদ শূন্য না থাকলেও সিনিয়র সহকারী সচিব থেকে উপসচিব পদে পদোন্নতি পেয়েছেন বলে সূত্রগুলো জানিয়েছে।
পুলিশের দায়িত্বশীল কর্মকর্তাদের ভাষ্য, উচ্চপর্যায়ের পদোন্নতি দীর্ঘদিন আটকে থাকায় নিচের ধাপের পদোন্নতিও বিলম্বিত হচ্ছে। ফলে একই ব্যাচের কর্মকর্তাদের মধ্যে কর্মজীবনে বৈষম্যের অনুভূতি তৈরি হওয়ার পাশাপাশি হতাশাও বাড়ছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ডিআইজি পদমর্যাদার এক কর্মকর্তা বলেন, “আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় দিন-রাত কাজ করার পরও যদি বছরের পর বছর পদোন্নতির অপেক্ষায় থাকতে হয়, তাহলে হতাশা তৈরি হওয়া স্বাভাবিক।”
আরেক কর্মকর্তা বলেন, “পদোন্নতি শুধু আর্থিক সুবিধার বিষয় নয়; এটি একজন কর্মকর্তার কর্মপ্রেরণা ও নেতৃত্বের স্বীকৃতির সঙ্গেও জড়িত।”
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর দাবি, দীর্ঘদিন পদোন্নতি আটকে থাকায় অনেক কর্মকর্তার মধ্যে হতাশা তৈরি হয়েছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষার মতো গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে কর্মকর্তাদের মনোবল গুরুত্বপূর্ণ। পদোন্নতি অনিশ্চিত হয়ে পড়লে পেশাগত উদ্দীপনায় এর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
তবে পদোন্নতির ক্ষেত্রে মেধা, জ্যেষ্ঠতা, শৃঙ্খলাজনিত রেকর্ড এবং সরকারি বিধিবিধান যথাযথভাবে অনুসরণ করা জরুরি বলে মনে করেন জনপ্রশাসন বিশ্লেষকেরা।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব মনজুর মোর্শেদ চৌধুরী কোনো মন্তব্য করতে চাননি। পুলিশ অধিদপ্তরের দায়িত্বশীল কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত তাদের আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
প্রশাসনিক প্রক্রিয়া অনুযায়ী, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে মন্ত্রিপরিষদ সচিবের সভাপতিত্বে সুপিরিয়র সিলেকশন বোর্ডের সভা অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা। এরপরই পুলিশের ডিআইজি ও অতিরিক্ত আইজিপি পদে পদোন্নতির বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
ফলে বর্তমানে পদোন্নতিপ্রত্যাশী পুলিশ কর্মকর্তাদের নজর এসএসবি সভার দিকে। সংশ্লিষ্টদের মতে, দীর্ঘদিনের এই সিদ্ধান্তহীনতার অবসান ঘটিয়ে শূন্য পদে দ্রুত পদোন্নতি দেওয়া গেলে পুলিশের উচ্চপর্যায়ের নেতৃত্বের ধারাবাহিকতা বজায় রাখার পাশাপাশি নিচের ধাপের পদোন্নতির পথও উন্মুক্ত হবে।
তবে সিদ্ধান্তহীনতা আরও দীর্ঘ হলে উচ্চপর্যায় থেকে মাঠপর্যায়ের নেতৃত্ব পর্যন্ত এর প্রভাব বিস্তৃত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।
Warning: Array to string conversion in /home/dkishoreganj/public_html/wp-content/plugins/gs-facebook-comments/public/class-wpfc-public.php on line 311
Array