হেফাজতের সহযোগিতার জন্য কৃতজ্ঞতা, আগের মতো পাশে থাকার আহ্বান প্রধানমন্ত্রীর
জাতীয় নির্বাচনে পাশে থাকা এবং দেশের মানুষকে সঙ্গে নিয়ে ‘একটি বড় বিপদ’ থেকে দেশকে রক্ষায় ভূমিকা রাখায় হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশসহ সংশ্লিষ্টদের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। একই সঙ্গে আগের মতো হেফাজতে ইসলামকে বিএনপির সঙ্গে থাকার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।
রোববার (৯ আগস্ট) চট্টগ্রামের ফটিকছড়িতে হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের আমির আল্লামা শাহ মুহিবুল্লাহ বাবুনগরীর সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ এবং দেশের শীর্ষ আলেমদের সঙ্গে মতবিনিময় অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী এসব কথা বলেন।
মতবিনিময় সভায় নির্বাচনের সময় সহযোগিতার কথা স্মরণ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, “নির্বাচনের সময় আমরা সবাই একসঙ্গে থেকে যে কাজ করেছি, যেভাবে দেশের মানুষকে সঙ্গে নিয়ে দেশকে একটি বড় বিপদের হাত থেকে রক্ষা করেছি, সেটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়।”
তিনি বলেন, ওই সময়ে যারা তাঁর সঙ্গে ছিলেন, মাঠে কাজ করেছেন, মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছেন এবং তাঁদের জন্য দোয়া করেছেন, তাঁদের সবার প্রতি তিনি কৃতজ্ঞ।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, “আমরা যে কাজটি একসঙ্গে করেছি, সেটি আল্লাহর রহমত ও আপনাদের সহযোগিতার কারণেই সম্ভব হয়েছে। কিন্তু আমাদের মনে রাখতে হবে, সমস্যা এখনো শেষ হয়ে যায়নি।”
দেশের মানুষের প্রতি দেওয়া প্রতিশ্রুতির প্রসঙ্গ তুলে তিনি বলেন, জনগণকে দেওয়া কথা বাস্তবায়ন করতে হবে। একজন মুসলমান হিসেবে কোনো অঙ্গীকার করলে তা রক্ষা করা দায়িত্ব। কথা রাখতে না পারলে কাজের কোনো মূল্য থাকে না।
সরকারপ্রধান বলেন, “আমরা দেশের মানুষকে বলেছি, আমরা আপনাদের জন্য ভালো কিছু করতে চাই এবং ভালো কিছু করার চেষ্টা করব। আল্লাহ যেন আমাদের সেই প্রতিশ্রুতি রক্ষা করার তৌফিক দেন।”
দেশের মানুষের শান্তি, নিরাপত্তা, ন্যায়বিচার ও কল্যাণ নিশ্চিত করতে সবাইকে একসঙ্গে কাজ করার আহ্বান জানান প্রধানমন্ত্রী। নির্বাচনের পর বিভিন্ন পরিস্থিতি মোকাবিলার প্রসঙ্গ তুলে তিনি বলেন, নির্বাচনের পর গুরুত্বপূর্ণ অনেক কাজ সম্পন্ন করতে হয়েছে। এরপরই রমজান শুরু হয়। একই সময়ে বিভিন্ন রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক পরিস্থিতি মোকাবিলা করতে হয়েছে। আন্তর্জাতিক পর্যায়ের সংকটের প্রভাবও দেশের অর্থনীতিতে পড়েছে।
নারী-পুরুষ নির্বিশেষে দেশের সবাই যেন শান্তি ও নিরাপদে বসবাস করতে পারে—এমন একটি দেশ গড়ার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন প্রধানমন্ত্রী। একই সঙ্গে সন্তানদের জন্য স্কুল-কলেজে নিরাপদ ও সুষ্ঠু শিক্ষার পরিবেশ নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্বারোপ করেন তিনি।
এর আগে বেলা ৩টার দিকে বাঁশখালীর জনসভা শেষে ফটিকছড়ির পাইন্দং সিঅ্যান্ডবি মাঠে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে বহনকারী হেলিকপ্টার অবতরণ করে। স্থানীয় সংসদ সদস্য সরওয়ার আলমগীর তাঁকে অভ্যর্থনা জানান। হেলিকপ্টার অবতরণের পর মাঠে অপেক্ষমাণ সাধারণ মানুষ প্রধানমন্ত্রীকে স্বাগত জানান।
পরে প্রধানমন্ত্রী বুলেটপ্রুফ বাসে করে সড়কপথে ফটিকছড়ির ঐতিহ্যবাহী আল-জামিয়াতুল ইসলামিয়া আজিজুল উলুম বাবুনগর মাদ্রাসার উদ্দেশে রওনা হন। তাঁকে একনজর দেখতে চট্টগ্রাম-খাগড়াছড়ি আঞ্চলিক মহাসড়কের দুই পাশে মানুষের উপস্থিতি দেখা যায়। প্রধানমন্ত্রীও হাত নেড়ে তাঁদের শুভেচ্ছার জবাব দেন।
মতবিনিময় সভায় সরকারের অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ, ভূমি ও পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী মীর মুহাম্মদ হেলালউদ্দিন, বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিডা) নির্বাহী চেয়ারম্যান আশিক চৌধুরী, রাউজানের সংসদ সদস্য গিয়াসউদ্দিন কাদের চৌধুরী, ফটিকছড়ির সংসদ সদস্য সরওয়ার আলমগীর, মীরসরাইয়ের সংসদ সদস্য নুরুল আমিন, রাঙ্গুনিয়ার সংসদ সদস্য হুম্মাম কাদের চৌধুরী, চট্টগ্রাম-১০ আসনের সংসদ সদস্য সাঈদ আল নোমান এবং বিচারপতি ফয়সল মাহমুদ ফয়েজী উপস্থিত ছিলেন।
হেফাজতে ইসলামের পক্ষে উপস্থিত ছিলেন সংগঠনটির মহাসচিব মাওলানা সাজিদুর রহমান, কেন্দ্রীয় নায়েবে আমির ও হেফাজত আমিরের ছেলে মাওলানা আইয়ুব বাবুনগরী, মাওলানা মহিউদ্দিন এবং কেন্দ্রীয় যুগ্ম মহাসচিব ও মুখপাত্র মাওলানা আজিজুল হক ইসলামীবাদী।
মতবিনিময়ের সময় হেফাজতে ইসলামের পক্ষ থেকে সংগঠনটির মহাসচিব মাওলানা সাজিদুর রহমান সরকারপ্রধানের কাছে কয়েকটি লিখিত দাবি পেশ করেন।
হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের পক্ষ থেকে উত্থাপিত দাবিগুলোর মধ্যে রয়েছে—
১. মহান আল্লাহ, রাসুলুল্লাহ (সা.), পবিত্র কোরআন ও ইসলাম ধর্মের অবমাননা রোধে সর্বোচ্চ শাস্তির বিধান রেখে জাতীয় সংসদে আইন পাস করা।
২. কোরআন-সুন্নাহর সঙ্গে সাংঘর্ষিক কোনো আইন পাস না করা।
৩. ২০১৩ সালের ৫ মে শাপলা চত্বরে সংঘটিত হত্যাকাণ্ডে জড়িতদের বিচার নিশ্চিত করা। একই সঙ্গে ২০২১ সালের মোদিবিরোধী আন্দোলন এবং ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের সহিংসতায় জড়িত, হুকুমের আসামি ও হত্যাকাণ্ডে জড়িত ব্যক্তিদের বিচার নিশ্চিতের মাধ্যমে বাংলাদেশে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করা।
৪. দাওরায়ে হাদিসের মাস্টার্সের সমমানের স্বীকৃতি কার্যকর করে কওমি মাদ্রাসার শিক্ষার্থীদের জন্য দেশ-বিদেশে কর্মসংস্থান ও উচ্চশিক্ষার সুযোগ উন্মুক্ত করা। বিশেষ করে ধর্মীয় শিক্ষক হিসেবে সরকারি চাকরির বিজ্ঞপ্তিতে সরকারি মাদ্রাসার ডিগ্রির পাশাপাশি কওমি মাদ্রাসার দাওরায়ে হাদিস (মাস্টার্সের সমমান) ডিগ্রির উল্লেখ করা।
৫. প্রাথমিক থেকে উচ্চমাধ্যমিক স্তর পর্যন্ত মুসলিম শিক্ষার্থীদের জন্য ইসলাম ধর্ম শিক্ষা বাধ্যতামূলক করা।
৬. কাদিয়ানী সম্প্রদায়কে অমুসলিম ঘোষণা এবং হিজবুত তাওহীদকে নিষিদ্ধ করা।
৭. পার্বত্য চট্টগ্রাম নিয়ে দেশি-বিদেশি মিশনারিদের কথিত ষড়যন্ত্র ও অপতৎপরতা বন্ধ করা।
৮. আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে আলেমদের বিরুদ্ধে করা কথিত মিথ্যা মামলাগুলো প্রত্যাহার করে দেশের আলেম-ওলামাকে রাষ্ট্র পুনর্গঠনে অংশীদার করা।
৯. বাংলাদেশে তাবলিগ জামাতের কার্যক্রম ও টঙ্গীর বিশ্ব ইজতেমা ওলামায়ে কেরামের তত্ত্বাবধানে পরিচালনা করা, ভারতের মাওলানা সাদ সাহেবের বাংলাদেশে প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা বহাল রাখা এবং টঙ্গী ময়দানে সাদপন্থীদের ইজতেমা আয়োজনের অনুমতি না দেওয়া।
মতবিনিময় শেষে প্রধানমন্ত্রী সড়কপথে আল-জামিয়াতুল আহলিয়া দারুল উলুম মঈনুল ইসলাম (হাটহাজারী বড় মাদ্রাসা)-এর উদ্দেশে রওনা হন। সেখানে তিনি হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠাতা আল্লামা শাহ আহমদ শফীর কবর জিয়ারত করেন।











Warning: Array to string conversion in /home/dkishoreganj/public_html/wp-content/plugins/gs-facebook-comments/public/class-wpfc-public.php on line 311
Array