আইসিবিকে বাজারমুখী ও পেশাদার প্রতিষ্ঠানে রূপান্তরের তাগিদ
দেশের পুঁজিবাজারের কাঠামো ও বিনিয়োগের ধরন দ্রুত বদলে যাচ্ছে। পরিবর্তিত এই বাস্তবতায় ইনভেস্টমেন্ট করপোরেশন অব বাংলাদেশকে (আইসিবি) পুরোনো কাঠামোয় না রেখে বাজারমুখী, প্রতিযোগিতামূলক ও পেশাদার প্রতিষ্ঠানে রূপান্তর করতে হবে বলে জানিয়েছেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী।
তিনি বলেন, শুধু সরকারি সহায়তা কিংবা আশীর্বাদের ওপর নির্ভর করে কোনো প্রতিষ্ঠান দীর্ঘমেয়াদে টিকে থাকতে পারে না। তাই আইসিবিকে নিজস্ব সক্ষমতা বাড়িয়ে বাজারের নিয়মে পরিচালিত হতে হবে। একই সঙ্গে প্রতিষ্ঠানটির কার্যক্রম পুরোপুরি ডিজিটাল ও অটোমেটেড করার ওপরও গুরুত্ব দেন তিনি।
বৃহস্পতিবার (১ অক্টোবর) রাজধানীর হোটেল পূর্বাণীতে আইসিবির ৫০ বছর পূর্তি উপলক্ষে আয়োজিত সুবর্ণজয়ন্তী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে এসব কথা বলেন অর্থমন্ত্রী।
আমির খসরু বলেন, বাংলাদেশের অর্থনীতিকে বাজারভিত্তিক ও মুক্তবাজার অর্থনীতির দিকে এগিয়ে নেওয়ার পাশাপাশি পুঁজিবাজারকে অর্থনীতির অন্যতম ভিত্তি হিসেবে গড়ে তোলার লক্ষ্যেই আইসিবি প্রতিষ্ঠা করা হয়েছিল। সাধারণ মানুষের সঞ্চয়কে বিনিয়োগে রূপান্তরের মাধ্যমে অর্থনীতিতে কাজে লাগানো ছিল প্রতিষ্ঠানটির অন্যতম প্রধান উদ্দেশ্য।
তবে পাঁচ দশকে দেশের পুঁজিবাজারের চিত্র অনেকটাই বদলে গেছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, এই পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে আইসিবিকেও নতুনভাবে ভাবতে হবে। বাংলাদেশের পুঁজিবাজার এখনো অনেকাংশে খুচরা বা রিটেইল বিনিয়োগকারীনির্ভর। অথচ বিশ্বের উন্নত পুঁজিবাজারগুলোতে প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের ভূমিকা বেশি। রিটেইলনির্ভর বাজারকে প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগনির্ভর করে তুলতে আইসিবি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
অর্থমন্ত্রী আরও বলেন, আইসিবি কর-সুবিধাসহ কিছু সরকারি সুবিধা পেলেও প্রতিষ্ঠানটিকে বাজারের নিয়মেই পরিচালিত হতে হবে। দক্ষতা, প্রতিযোগিতা ও পেশাদারিত্বের ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠানটিকে এগিয়ে নিতে হবে।
আর্থিক খাতে রাজনৈতিক নিয়োগ না দেওয়ার সরকারের অবস্থান তুলে ধরে তিনি বলেন, আইসিবিতেও কোনো রাজনৈতিক নিয়োগ দেওয়া হবে না। আর্থিক খাতকে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত রাখার বিষয়টি সরকার গুরুত্বের সঙ্গে দেখছে।
পুঁজিবাজারের সংস্কার প্রসঙ্গে আমির খসরু বলেন, নতুন কমিশন দায়িত্ব নেওয়ার পর বাজারে বিভিন্ন সংস্কারের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সরাসরি তালিকাভুক্তির প্রক্রিয়া সহজ করার পাশাপাশি বাংলাদেশের পুঁজিবাজারকে আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে আরও বেশি সম্পৃক্ত করার কাজ চলছে।
সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াল স্ট্রিটে অনুষ্ঠিত একটি ব্রেকফাস্ট মিটিংয়ের প্রসঙ্গও তুলে ধরেন অর্থমন্ত্রী। তিনি জানান, ওই আয়োজনে ১৫টি বড় কোম্পানি অংশ নেয়, যাদের সম্মিলিত মূল্য প্রায় ৩৬ ট্রিলিয়ন ডলার। সেখানে প্রাইভেট ফান্ড, প্রাইভেট ফান্ডিং ও ডেরিভেটিভসহ বিভিন্ন আর্থিক পণ্য নিয়ে আলোচনা হয়েছে। আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীদের বাংলাদেশে বিনিয়োগের আগ্রহ রয়েছে বলেও জানান তিনি।
আমির খসরু বলেন, আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীরা বাংলাদেশে এলে তাদের উপযোগী একটি আধুনিক ও প্রতিযোগিতামূলক বাজার নিশ্চিত করতে হবে। এ জন্য আইসিবিসহ পুঁজিবাজারের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সব প্রতিষ্ঠানকে সময়ের সঙ্গে নিজেদের সক্ষমতা বাড়াতে হবে।
আইসিবির ডিজিটাল রূপান্তরের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে তিনি বলেন, প্রতিষ্ঠানটির সব কার্যক্রম অটোমেশনের আওতায় আনতে হবে। কোনো পেপারভিত্তিক লেনদেন থাকা উচিত নয়। এসইসি, স্টক এক্সচেঞ্জ ও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর সিদ্ধান্ত গ্রহণ, তালিকাভুক্তি এবং লিস্টিংয়ের আবেদনসহ পুরো প্রক্রিয়া অনলাইনে নিয়ে আসার প্রয়োজন রয়েছে।
অনুষ্ঠানে আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সচিব নাজমা মোবারেক বলেন, যথাযথ বাজার বিশ্লেষণ ছাড়াই বিনিয়োগ এবং উচ্চ সুদে অর্থ নিয়ে বিনিয়োগ করা আইসিবির বর্তমান সমস্যাগুলোর অন্যতম কারণ। এ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে পোর্টফোলিও পুনর্বিন্যাসের পাশাপাশি ব্যবস্থাপনার দক্ষতা বাড়ানো জরুরি।
তিনি জানান, অর্থ বিভাগ দুই দফায় আইসিবিকে মোট ৪ হাজার কোটি টাকা দিয়েছে। প্রথম দফার ৩ হাজার কোটি টাকার মধ্যে ২ হাজার কোটি টাকা দিয়ে উচ্চ সুদের ঋণ পরিশোধ করা হয়। অবশিষ্ট ১ হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগ করে প্রায় ১৭৬ কোটি টাকা আয় করে আইসিবি। পরে দেওয়া আরও ১ হাজার কোটি টাকা থেকে প্রায় ১৪৩ কোটি টাকা আয় হয়েছে।
বিএসইসি চেয়ারম্যান মাসুদ খান বলেন, সময়ের সঙ্গে আইসিবির সঙ্গে প্রতিযোগিতা করার মতো দক্ষ অনেক অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে। ফলে পোর্টফোলিও ব্যবস্থাপনায় আইসিবিকে আরও পেশাদার হতে হবে। বিনিয়োগের প্রয়োজন অনুযায়ী পুনর্বিন্যাস, স্বচ্ছ রিপোর্টিং এবং আন্তর্জাতিক আর্থিক প্রতিবেদনের মানদণ্ড অনুসরণের ওপরও গুরুত্ব দেন তিনি।
অনুষ্ঠানে আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সচিব নাজমা মোবারেক, অর্থ বিভাগের সচিব ড. মো. খায়রুজ্জামান মজুমদার, বিএসইসি চেয়ারম্যান মাসুদ খান, আইসিবির চেয়ারম্যান আবু আহমেদসহ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা উপস্থিত ছিলেন। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন আইসিবির ব্যবস্থাপনা পরিচালক নিরঞ্জন চন্দ্র দেবনাথ।














Warning: Array to string conversion in /home/dkishoreganj/public_html/wp-content/plugins/gs-facebook-comments/public/class-wpfc-public.php on line 311
Array