প্রযুক্তি ও পরিবেশবান্ধব উৎপাদনে পোশাকশিল্পের নতুন সম্ভাবনা
বিশ্বের পোশাকশিল্পে দ্রুত পরিবর্তন আসছে। পরিবেশগত বিধিনিষেধ, সরবরাহব্যবস্থার রূপান্তর এবং নৈতিকভাবে কাঁচামাল সংগ্রহের বিষয়ে ক্রেতাদের বাড়তি আগ্রহ উৎপাদনকারীদের নতুন করে ভাবতে বাধ্য করছে। এই পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মেলাতে উৎপাদন সক্ষমতার পাশাপাশি প্রযুক্তির ব্যবহার, পরিবেশবান্ধব পদ্ধতি ও আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুসরণের গুরুত্ব বাড়ছে।
বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম পোশাক রপ্তানিকারক বাংলাদেশও এ পরিবর্তনের মুখে দাঁড়িয়ে। বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় নিজেদের অবস্থান ধরে রাখতে দেশের পোশাকশিল্পে আধুনিক প্রযুক্তি, দক্ষ জনশক্তি এবং টেকসই উৎপাদনব্যবস্থায় বিনিয়োগ প্রয়োজন।
এ প্রেক্ষাপটে বৈশ্বিক অভিজ্ঞতা ও প্রযুক্তিগত দক্ষতা কাজে লাগিয়ে বাংলাদেশে দীর্ঘমেয়াদি উৎপাদন সক্ষমতা গড়ে তোলার উদ্যোগ নিয়েছে এমএএস হোল্ডিংস (MAS Holdings)। তিন দশকের বেশি সময় ধরে পোশাকশিল্পে কাজ করা প্রতিষ্ঠানটি স্পোর্টসওয়্যার, পারফরম্যান্স পোশাক ও বিশেষায়িত পণ্য উৎপাদনে দক্ষতা অর্জন করেছে।
বাংলাদেশে প্রতিষ্ঠানটির কার্যক্রমে আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুসরণ, কর্মীদের দক্ষতা উন্নয়ন এবং টেকসই উৎপাদনব্যবস্থাকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। এমএএস সুমান্ত্রার জেনারেল ম্যানেজার আদিত্য বান্দারা বলেন, পোশাক উৎপাদনের ভবিষ্যৎ প্রযুক্তি ও টেকসই উৎপাদনের ওপর নির্ভর করবে। তাঁর মতে, বাংলাদেশের জন্য এটি শুধু প্রতিযোগিতায় টিকে থাকার বিষয় নয়; বরং দক্ষতা, আধুনিক প্রযুক্তি ও বিশ্বমানের উৎপাদনের মাধ্যমে পণ্যের মূল্য বাড়ানোর সুযোগ।
পোশাক কারখানায় বর্জ্য কমানো, উৎপাদনদক্ষতা বাড়ানো এবং সম্পদের কার্যকর ব্যবহার নিশ্চিত করতে প্রযুক্তির ভূমিকা বাড়ছে। স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থা, তথ্যভিত্তিক উৎপাদন পরিকল্পনা, ডিজিটাল পর্যবেক্ষণ ও জ্বালানি ব্যবস্থাপনা এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
এমএএসের বৈশ্বিক টেকসই উন্নয়ন কৌশল ‘প্ল্যান ফর চেইঞ্জ’-এর আওতায় টেকসই পণ্য তৈরি, পুনর্ব্যবহার, জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলা, পানিসম্পদের দায়িত্বশীল ব্যবহার ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
এর একটি উদাহরণ এমএএস সুমান্ত্রা ও প্রযুক্তি প্ল্যাটফর্ম রিভার্স রিসোর্সেসের (Reverse Resources) অংশীদারি। ২০২০ সালের জুলাইয়ে শুরু হওয়া এ উদ্যোগের আওতায় কাপড় কাটার পর তৈরি হওয়া অবশিষ্টাংশ পুনর্ব্যবহারের ব্যবস্থা করা হয়েছে। ২০২৪ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৬ সালের আগস্ট পর্যন্ত ১৫৬ টনের বেশি বস্ত্রের অবশিষ্টাংশ পুনর্ব্যবহারের জন্য পাঠানো হয়েছে।
স্থানীয় সুতা উৎপাদকেরা এসব উপকরণ থেকে সুতা তৈরি করেন। পরে ইমপ্রেস-নিউটেক্স কম্পোজিট টেক্সটাইলস সেই সুতা দিয়ে কাপড় তৈরি করে, যা সংগ্রহ করে এমএএস সুমান্ত্রা। এ প্রক্রিয়ায় উৎপাদনবর্জ্য কমানোর পাশাপাশি সম্পদের পুনর্ব্যবহারের সুযোগ তৈরি হয়েছে
বাংলাদেশে এমএএসের পাঁচ হাজারের বেশি কর্মী রয়েছেন। পাশাপাশি অংশীদার প্রতিষ্ঠানের উৎপাদন কার্যক্রমে যুক্ত আছেন আরও প্রায় চার হাজার কর্মী। প্রতিষ্ঠানটির কারখানায় উত্তর আমেরিকা, ইউরোপ ও এশিয়ার বাজারের জন্য ক্রীড়াপোশাক, সেলাইবিহীন পোশাক ও অন্তর্বাস তৈরি হয়।
আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুসরণের পাশাপাশি কর্মীদের দক্ষতা বৃদ্ধি, নেতৃত্বের গুণাবলি বিকাশ এবং নিরাপদ কর্মপরিবেশ তৈরিতেও গুরুত্ব দিচ্ছে প্রতিষ্ঠানটি। ‘বিয়ন্ড বর্ডারস’ কর্মসূচির মাধ্যমে কর্মীরা বিভিন্ন দেশের কার্যক্রমে অংশ নিয়ে অভিজ্ঞতা অর্জন এবং নেতৃত্বের দক্ষতা বাড়ানোর সুযোগ পান।
এমএএস সুমান্ত্রার জেনারেল ম্যানেজার আদিত্য বান্দারা বলেন, প্রযুক্তি ও টেকসই উৎপাদন পোশাকশিল্পের ভবিষ্যৎ নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। বাংলাদেশের জন্য এ বিষয়গুলো প্রতিযোগিতায় টিকে থাকার পাশাপাশি দক্ষতা, আধুনিক প্রযুক্তি ও বিশ্বমানের উৎপাদনের মাধ্যমে পণ্যের মূল্য বাড়ানোর সুযোগ তৈরি করছে। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, এমএএস এ পরিবর্তনকে এমন কারখানা গড়ে তোলার সুযোগ হিসেবে দেখে, যেগুলো দক্ষতার পাশাপাশি ভবিষ্যতের চাহিদা পূরণেও প্রস্তুত।
বাংলাদেশে এমএএসের কার্যক্রম কারখানার বাইরেও বিস্তৃত। ২০২৪ থেকে ২০২৬ সালের মধ্যে প্রতিষ্ঠানটি স্বাস্থ্য পরীক্ষা ক্যাম্পসহ বিভিন্ন সামাজিক উদ্যোগে সহায়তা করেছে। পাশাপাশি এতিমখানার ১৩০ শিশুর জন্য মাসিক শুকনো খাদ্যসামগ্রী সরবরাহের উদ্যোগেও যুক্ত হয়েছে।
পরিবেশ সচেতনতা বাড়াতে ১৫টির বেশি স্কুলে বর্জ্য পৃথকীকরণ, বৃক্ষরোপণ, কার্বন নিঃসরণ কমানো এবং সম্পদের দায়িত্বশীল ব্যবহার বিষয়ে কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে।
বিশ্ববাজারে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে বাংলাদেশের পোশাকশিল্পকে উৎপাদন সক্ষমতার পাশাপাশি স্বচ্ছতা, পরিবেশগত কার্যকারিতা ও শ্রমিককল্যাণ নিশ্চিত করতে হবে। প্রযুক্তির কার্যকর ব্যবহার, দক্ষ জনশক্তি তৈরি এবং টেকসই উৎপাদনব্যবস্থায় বিনিয়োগ এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ।
বৈশ্বিক অভিজ্ঞতা ও স্থানীয় সক্ষমতার সমন্বয়ে এমএএসের কার্যক্রম বাংলাদেশের পোশাকশিল্পের রূপান্তরের একটি উদাহরণ। ভবিষ্যতে এ ধরনের উদ্যোগ দেশের রপ্তানি প্রতিযোগিতা জোরদার করার পাশাপাশি দায়িত্বশীল উৎপাদনে বাংলাদেশের অবস্থান শক্তিশালী করতে ভূমিকা রাখতে পারে।













Disqus comments are not configured yet.