জনমিতিক সুবিধা কাজে লাগাতে বাংলাদেশের হাতে সময় দুই দশক: বিশ্বব্যাংক
কর্মক্ষম মানুষের বিশাল জনগোষ্ঠী থাকা সত্ত্বেও বাংলাদেশ জনমিতিক সুবিধা পুরোপুরি কাজে লাগাতে পারছে না। কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে ধীরগতি, শ্রমবাজারে নারীর কম অংশগ্রহণ এবং দক্ষতার ঘাটতি দেশের অর্থনৈতিক সম্ভাবনাকে সীমিত করছে। ফলে উৎপাদনশীলতা ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বাড়ানোর সুযোগ হারাচ্ছে দেশ।
বিশ্বব্যাংকের নতুন এক প্রতিবেদনে এসব বিষয় তুলে ধরে সতর্ক করা হয়েছে, জনমিতিক পরিবর্তনের ফলে সৃষ্ট সুযোগ কাজে লাগাতে বাংলাদেশের হাতে সময় রয়েছে প্রায় দুই দশক। ২০৪৫ সালে দেশে কর্মক্ষম জনসংখ্যার অনুপাত সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছাবে। এরপর ধীরে ধীরে বয়স্ক জনগোষ্ঠীর চাপ বাড়তে থাকবে।
মঙ্গলবার প্রকাশিত বিশ্বব্যাংকের ‘ডেমোগ্রাফিক চেঞ্জ ইন সাউথ এশিয়া: ফ্রম টেলউইন্ডস টু হেডউইন্ডস ফর ডেভেলপমেন্ট’ শীর্ষক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশ এখনো অনুকূল জনসংখ্যা কাঠামোকে কর্মসংস্থান ও উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধিতে রূপান্তর করতে পারেনি। এ জন্য শ্রমবাজারে সংস্কার, তরুণদের দক্ষতা উন্নয়ন এবং নারীদের কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়ানো জরুরি।
প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশের মোট শ্রমশক্তির প্রায় ৮৪ শতাংশ বা আনুমানিক পাঁচ কোটি ৮০ লাখ মানুষ অনানুষ্ঠানিক খাতে কাজ করেন। অন্যদিকে, আনুষ্ঠানিক খাতের প্রতিষ্ঠানগুলোতে কর্মসংস্থান সৃষ্টি হচ্ছে ধীরগতিতে। সাম্প্রতিক সময়ে ছোট প্রতিষ্ঠানগুলোতে গড়ে কর্মীর সংখ্যাও কমেছে। এমনকি উচ্চশিক্ষা অর্জনের পরও আনুষ্ঠানিক খাতে চাকরির নিশ্চয়তা মিলছে না।
বিশ্বব্যাংকের বাংলাদেশ ও ভুটান অঞ্চলের বিভাগীয় পরিচালক জ্যঁ পেসমে বলেন, বাংলাদেশের জনমিতিক সুযোগ নির্ভর করছে এখন দেশটি কী ধরনের পদক্ষেপ নিচ্ছে তার ওপর। প্রতিষ্ঠানগুলোকে মানসম্মত কর্মসংস্থান তৈরিতে সহায়তা, তরুণদের বাজার উপযোগী দক্ষতায় রূপান্তর এবং কর্মক্ষেত্রে নারীদের প্রবেশের বাধা দূর করতে হবে।
তিনি আরও বলেন, একই সঙ্গে বয়স্ক জনগোষ্ঠীর জন্য স্বাস্থ্যসেবা ও সামাজিক নিরাপত্তা জোরদার করতে হবে। জনসংখ্যার পরিবর্তনের ফলে ভবিষ্যতে যে বাড়তি অর্থায়নের প্রয়োজন হবে, তা মোকাবেলায় অভ্যন্তরীণ সম্পদ সংগ্রহ বাড়ানো জরুরি।
প্রতিবেদনে বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ জনসংখ্যা কাঠামো নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, ২০৫১ সালের মধ্যে বাংলাদেশের জনসংখ্যার একটি বড় অংশের বয়স হবে ৬৫ বছর বা তার বেশি। তুলনামূলকভাবে মাথাপিছু আয় কম থাকা অবস্থায় এ বার্ধক্যজনিত পরিবর্তন ঘটবে। ফলে বয়স্ক জনগোষ্ঠীর জন্য প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্যসেবা ও সামাজিক সুরক্ষা নিশ্চিত করা কঠিন হতে পারে।
দক্ষিণ এশিয়ার সামগ্রিক পরিস্থিতিও উদ্বেগজনক বলে উল্লেখ করেছে বিশ্বব্যাংক। বর্তমানে এ অঞ্চলে কর্মক্ষম জনসংখ্যা প্রায় ১১৭ কোটি। এক দশকের কম সময়ের মধ্যে এ সংখ্যা সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছাবে। এরপর কর্মক্ষম মানুষের সংখ্যা কমতে শুরু করবে। প্রক্ষেপণ অনুযায়ী, ২০৪৯ সালের মধ্যে দক্ষিণ এশিয়ার মোট জনসংখ্যার ১৪ শতাংশের বয়স হবে ৬৫ বছর বা তার বেশি।
বিশ্বব্যাংকের দক্ষিণ এশিয়াবিষয়ক ভাইস প্রেসিডেন্ট জোহানেস জুট বলেন, দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর অর্থনীতি উন্নয়নের তুলনায় দ্রুত এবং আগেই বার্ধক্যের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে।
প্রতিবেদনে এ অঞ্চলের পেনশন ও স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থার দুর্বলতাও তুলে ধরা হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীর মাত্র ১৭ শতাংশ পেনশন স্কিমে অবদান রাখেন। অন্যদিকে, বয়স্কদের মাত্র ১০ শতাংশ পেনশন সুবিধা পান, যা বিশ্বের সর্বনিম্ন হারগুলোর একটি। দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্যসেবা ও বয়স্কদের পরিচর্যার ব্যবস্থাও অপর্যাপ্ত।
বিশ্বব্যাংকের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, বাংলাদেশের সামনে এখন দ্বিমুখী চ্যালেঞ্জ। একদিকে কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীকে উৎপাদনশীল কর্মসংস্থানে যুক্ত করতে হবে, অন্যদিকে ভবিষ্যতের বয়স্ক জনগোষ্ঠীর জন্য স্বাস্থ্যসেবা, পেনশন ও সামাজিক নিরাপত্তার ভিত্তি তৈরি করতে হবে। সময়মতো প্রয়োজনীয় সংস্কার না হলে জনমিতিক সুবিধা কাজে লাগানোর সুযোগ হারানোর পাশাপাশি ভবিষ্যতে অর্থনীতির ওপর বাড়তি চাপ তৈরি হতে পারে।










Disqus comments are not configured yet.