শনিবার, ৬ জুন ২০২৬, ২৩ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩
শনিবার, ৬ জুন ২০২৬, ২৩ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩

প্রচণ্ড তাপে বিপর্যয়ের পথে বাংলাদেশ, বলছে অক্সফোর্ডের গবেষণা

ডেস্ক রিপোর্ট প্রকাশিত: মঙ্গলবার, ২৭ জানুয়ারি, ২০২৬, ১২:০০ অপরাহ্ণ ই-পেপার প্রিন্ট ভিউ
প্রচণ্ড তাপে বিপর্যয়ের পথে বাংলাদেশ, বলছে অক্সফোর্ডের গবেষণা

উষ্ণতা বৃদ্ধির কারণে ২০৫০ সালের মধ্যে বিশ্বের সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত ছয়টি দেশের তালিকায় স্থান পেতে যাচ্ছে বাংলাদেশ। তালিকায় থাকা অন্য দেশগুলো হলো—ভারত, নাইজেরিয়া, ইন্দোনেশিয়া, পাকিস্তান ও ফিলিপাইন। যুক্তরাজ্যের অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকদের নেতৃত্বে পরিচালিত এক আন্তর্জাতিক গবেষণায় এ তথ্য উঠে এসেছে। গবেষণাটি সোমবার নেচার সাসটেইনেবিলিটি জার্নালে প্রকাশিত হয়।

গবেষণায় বলা হয়েছে, বৈশ্বিক তাপপ্রবাহের সংকট দ্রুত তীব্র রূপ ধারণ করছে, যা মানুষের দৈনন্দিন জীবন, অর্থনীতি এবং স্বাস্থ্য ব্যবস্থার ওপর গুরুতর প্রভাব ফেলছে।

জীবাশ্ম জ্বালানির বর্তমান ব্যবহার অব্যাহত থাকলে আগামী ২৫ বছরের মধ্যে প্রচণ্ড তাপের মধ্যে বসবাসকারী মানুষের সংখ্যা প্রায় দ্বিগুণ বেড়ে যেতে পারে।

গবেষকরা জানান, শিল্প-পূর্ব সময়ের তুলনায় বৈশ্বিক উষ্ণতা ২ ডিগ্রি সেলসিয়াসে পৌঁছালে চলতি শতাব্দীর মাঝামাঝি বিশ্বের প্রায় ৪১ শতাংশ মানুষ—অর্থাৎ প্রায় ৩৭৯ কোটি মানুষ—চরম তাপের মধ্যে বসবাস করবে। তুলনামূলকভাবে, ২০১০ সালে এ হার ছিল ২৩ শতাংশ বা প্রায় ১৫৪ কোটি।

গবেষণায় উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন জলবায়ু ও জনসংখ্যাভিত্তিক মডেল ব্যবহার করে তাপপ্রবাহের ঝুঁকি নির্ধারণ করা হয়েছে ‘কুলিং ডিগ্রি ডেজ’ (সিডিডি) সূচকের মাধ্যমে। এই সূচক নির্দেশ করে, মানুষের জন্য নিরাপদ ঘরোয়া তাপমাত্রা বজায় রাখতে বছরে কতটা শীতলীকরণ প্রয়োজন। বছরে ৩ হাজারের বেশি সিডিডি থাকা অঞ্চলগুলোকে ‘চরম তাপপ্রবণ’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।

গবেষণার প্রধান লেখক ও অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক ড. জেসুস লিজানা বলেন, বাংলাদেশের গড় জাতীয় তাপমাত্রা প্রকৃত ঝুঁকি আড়াল করতে পারে। তার মতে, দেশের অধিকাংশ মানুষ এমন এলাকায় বসবাস করছে, যেখানে বছরে শীতলীকরণের চাহিদা ৩ হাজার সিডিডির বেশি। এর অর্থ দীর্ঘমেয়াদি ও বিপজ্জনক তাপের মধ্যে জীবনযাপন, যা মানুষের জীবিকা, উৎপাদনশীলতা ও স্বাস্থ্যের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে।

বর্তমান জলবায়ু পরিস্থিতিতে বাংলাদেশ ইতোমধ্যেই বিশ্বের অন্যতম ঝুঁকিপূর্ণ দেশ। আগে আলোচনার মূল কেন্দ্র ছিল সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, ঘূর্ণিঝড় ও বন্যা। তবে নতুন গবেষণায় দেখা গেছে, এসব ঝুঁকির পাশাপাশি প্রবল তাপও সমানভাবে প্রাণঘাতী হুমকিতে পরিণত হচ্ছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, তাপপ্রবাহে হিটস্ট্রোক, হৃদরোগজনিত চাপ ও কিডনি রোগের ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ে। বিশেষ করে বয়স্ক, শিশু ও নিম্ন আয়ের মানুষের ঝুঁকি বেশি, যাদের শীতলীকরণ সুবিধা সীমিত।

গবেষণায় আরও বলা হয়েছে, উষ্ণ ও উপউষ্ণ অঞ্চলের নিম্ন ও মধ্য আয়ের দেশগুলোতে শীতলীকরণের চাহিদা সবচেয়ে দ্রুত বাড়বে। বিপরীতে, বৈশ্বিক উত্তরের ধনী দেশগুলোতে শীত নরম হওয়ায় ঘর গরম রাখার প্রয়োজন কমে আসবে।

ব্যক্তিপ্রতি সিডিডি সবচেয়ে বেশি বাড়বে যেসব দেশে, সেগুলো হলো—সেন্ট্রাল আফ্রিকান রিপাবলিক, নাইজেরিয়া, দক্ষিণ সুদান, লাওস ও ব্রাজিল। অন্যদিকে কানাডা, রাশিয়া, ফিনল্যান্ড, সুইডেন ও নরওয়েতে শীতের তীব্রতা কমায় গরমের চাহিদা কমে যাবে।

গবেষকরা সতর্ক করেছেন, চরম তাপপ্রবণ দেশগুলোতে এয়ার কন্ডিশনের ব্যবহার বাড়লে একটি ‘কুলিং ট্র্যাপ’ তৈরি হতে পারে। এতে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি ব্যবহার বাড়বে এবং যদি তা জীবাশ্ম জ্বালানি নির্ভর হয়, তবে কার্বন নিঃসরণ আরও বৃদ্ধি পাবে—যা জলবায়ু পরিবর্তনকে ত্বরান্বিত করবে।

গবেষণায় স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, বৈশ্বিক উষ্ণতা ১.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখতে পারলে প্রাণঘাতী তাপে আক্রান্ত মানুষের সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভব। বিজ্ঞানীদের মতে, সময় দ্রুত ফুরিয়ে আসছে। এখনই কার্বন নিঃসরণ হ্রাস, নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিনিয়োগ এবং শহর ও আবাসন নকশায় তাপ সহনশীল ব্যবস্থা গ্রহণ জরুরি। তা না হলে বাংলাদেশসহ ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোতে তাপপ্রবাহ বড় মানবিক ও স্বাস্থ্য সংকটে পরিণত হবে।

আবহাওয়া অধিদপ্তরের আবহাওয়াবিদ বজলুর রশিদ জানান, ভবিষ্যতে বাংলাদেশের তাপপ্রবাহ আরও বাড়বে এবং দেশের পশ্চিমাঞ্চলে প্রায় সারা বছরই তীব্র গরম বিরাজ করতে পারে। গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণ না কমালে ২০৪১ থেকে ২০৭০ সালের মধ্যে তাপমাত্রা ১ থেকে ২ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত বাড়তে পারে। ২১০০ সালের মধ্যে এই বৃদ্ধি ১.৫ থেকে ৪.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসে পৌঁছাতে পারে। বিশেষ করে মার্চ-মে সময়ে তাপপ্রবাহ আরও ঘন ঘন ঘটবে।

তিনি জানান, ২০৭০ সালের মধ্যে দেশের পশ্চিমাঞ্চলে বর্ষার আগে প্রায় ২০ দিন তাপপ্রবাহ থাকতে পারে। এমনকি বর্ষা মৌসুমেও তাপপ্রবাহ বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

২১০০ সালের মধ্যে পশ্চিমাঞ্চলের জেলাগুলোতে বর্ষা শুরুর আগের ৯০ দিনের মধ্যে প্রায় ৭০ দিন তাপপ্রবাহ থাকার আশঙ্কা রয়েছে। রাজধানী ঢাকায় বছরে অন্তত দুইবার প্রবল তাপপ্রবাহ দেখা দিতে পারে—একবার বর্ষার আগে, আরেকবার বর্ষার পরে।

আবহাওয়া অধিদপ্তরের পরিচালক মমিনুল ইসলাম বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের গতি ক্রমেই বাড়ছে এবং পৃথিবীর উষ্ণায়ন এখন স্পষ্টভাবে দৃশ্যমান।

বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সাল ছিল ইতিহাসের অন্যতম উষ্ণ বছর। এছাড়া ২০২৫ সালের অক্টোবর ইতোমধ্যে বৈশ্বিক ইতিহাসের অন্যতম উষ্ণ অক্টোবর হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে।

উষ্ণতা বৃদ্ধির ফলে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা উপকূলীয় জনগোষ্ঠীর জন্য বড় হুমকি হয়ে উঠবে। পাশাপাশি তীব্র তাপ স্বাস্থ্য, কৃষি ও নিরাপদ পানির ওপর গুরুতর চাপ সৃষ্টি করবে। এটি বাংলাদেশের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্কবার্তা।

চাঁদা দাবির অভিযোগে তোলপাড় ভৈরব, সংবাদ সম্মেলনের পরই আটক নেতা

নিজস্ব প্রতিবেদক প্রকাশিত: শুক্রবার, ৫ জুন, ২০২৬, ৮:১৪ অপরাহ্ণ
চাঁদা দাবির অভিযোগে তোলপাড় ভৈরব, সংবাদ সম্মেলনের পরই আটক নেতা

কিশোরগঞ্জের ভৈরবে প্রশাসনের নাম ভাঙিয়ে এক নারীর কাছে ৫ লাখ টাকা চাঁদা দাবির অভিযোগে পৌরসভার ৩ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির সভাপতি ওমর মোহাম্মদ অপু (৩৬)কে গ্রেপ্তার করেছে জেলা গোয়েন্দা (ডিবি) পুলিশ। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হওয়া একটি অডিও কল রেকর্ডকে কেন্দ্র করে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনার মধ্যেই তিনি নিজেকে নির্দোষ দাবি করে সংবাদ সম্মেলন করেন। তবে সেই সংবাদ সম্মেলনের প্রায় এক ঘণ্টার মধ্যেই তাকে গ্রেপ্তার করা হয়।

শুক্রবার (৫ জুন) সন্ধ্যায় ভৈরব থানা পুলিশ ও ডিবি পুলিশের যৌথ অভিযানে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন ভৈরব থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আতাউর রহমান আকন্দ।

গ্রেপ্তারকৃত ওমর মোহাম্মদ অপু পৌর শহরের পঞ্চবটি পুকুরপাড় এলাকার মোমতাজ হকের ছেলে। তিনি দীর্ঘদিন ধরে স্থানীয় রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত এবং পৌর বিএনপির ৩ নম্বর ওয়ার্ডের সভাপতির দায়িত্ব পালন করে আসছিলেন।

পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, গত এক সপ্তাহ ধরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি অডিও কল রেকর্ড নিয়ে ভৈরবজুড়ে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়। অডিওটিতে এক নারীর কাছে ৫ লাখ টাকা দাবি করতে শোনা যায় একজন ব্যক্তিকে। কথোপকথনের একপর্যায়ে তিনি দাবি করেন, ওই অর্থের একটি অংশ এলাকার কিছু যুবক এবং প্রশাসনকে দিতে হবে।

ভাইরাল অডিওকে কেন্দ্র করে স্থানীয় জনমনে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়। বিষয়টি রাজনৈতিক অঙ্গনেও আলোচনার জন্ম দেয়। অনেকেই অভিযোগের সুষ্ঠু তদন্ত এবং জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানান।

অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে বৃহস্পতিবার বিকেল ৫টার দিকে ৩ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করেন ওমর মোহাম্মদ অপু। সেখানে লিখিত বক্তব্যে তিনি দাবি করেন, একটি কুচক্রী মহল পরিকল্পিতভাবে তার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করছে।

তিনি বলেন, আধুনিক প্রযুক্তি ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ব্যবহার করে তার কণ্ঠস্বর নকল করে একটি ভুয়া অডিও তৈরি করা হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তা ছড়িয়ে দিয়ে তার রাজনৈতিক ও সামাজিক ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করার চেষ্টা চলছে। এলাকায় মাদকবিরোধী কর্মকাণ্ড পরিচালনা করায় একটি মহল ক্ষুব্ধ হয়ে তাকে হেয়প্রতিপন্ন করার অপচেষ্টা চালাচ্ছে বলেও তিনি দাবি করেন।

তবে সংবাদ সম্মেলনের কিছু সময় পরই ডিবি পুলিশ অভিযান চালিয়ে তাকে গ্রেপ্তার করে। এতে ঘটনাটি নতুন মাত্রা পায় এবং এলাকায় ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়।

মামলার বাদী পপি বেগম অভিযোগ করেন, তিনি কোনো ধরনের মাদক ব্যবসার সঙ্গে জড়িত নন। তা সত্ত্বেও এলাকায় বসবাস করতে হলে তাকে ৫ লাখ টাকা দিতে হবে বলে চাপ প্রয়োগ করা হয়। চাঁদার টাকা না দিলে তাকে এলাকা ছাড়তে বাধ্য করা হবে এবং বাড়িঘর বিক্রি করে অন্যত্র চলে যেতে বলা হয়। এমনকি টাকা না দিলে তার বাড়িতে তালা ঝুলিয়ে দেওয়ারও হুমকি দেওয়া হয় বলে তিনি অভিযোগ করেন।

নিজের নিরাপত্তা ও ন্যায়বিচারের স্বার্থে তিনি থানায় লিখিত অভিযোগ দায়ের করেন। সেই অভিযোগের ভিত্তিতে পুলিশ তদন্ত শুরু করে।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর একটি সূত্র জানিয়েছে, প্রাথমিক তদন্তে চাঁদা দাবির অভিযোগের কিছু সত্যতা পাওয়া গেছে। তবে বিষয়টি নিয়ে আরও তদন্ত চলছে।

ঘটনাটি ভৈরবের রাজনৈতিক ও সামাজিক অঙ্গনে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। একদিকে সংবাদ সম্মেলনে নিজেকে নির্দোষ দাবি, অন্যদিকে অল্প সময়ের ব্যবধানে গ্রেপ্তার— পুরো ঘটনাকে ঘিরে সাধারণ মানুষের মধ্যে নানা আলোচনা চলছে।

স্থানীয় সচেতন মহল বলছে, অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত সত্য উদঘাটন করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে রাজনৈতিক পরিচয় ব্যবহার করে কেউ যাতে চাঁদাবাজি বা অন্য কোনো অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করতে না পারে, সে বিষয়েও কঠোর নজরদারি প্রয়োজন।

ভৈরব থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আতাউর রহমান আকন্দ বলেন, “ভুক্তভোগী নারী পপি বেগম বাদী হয়ে থানায় মামলা দায়ের করেছেন। অভিযোগের ভিত্তিতে ওমর মোহাম্মদ অপুকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। চাঁদা দাবি করার ক্ষেত্রে প্রশাসনের নাম ব্যবহার করার অভিযোগও পাওয়া গেছে। বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করা হচ্ছে। কোনো ব্যক্তি রাজনৈতিক পরিচয় বা প্রভাব খাটিয়ে আইনের ঊর্ধ্বে থাকতে পারবেন না। অপরাধ প্রমাণিত হলে তার বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”

তিনি আরও জানান, গ্রেপ্তারকৃতকে আদালতে সোপর্দের প্রস্তুতি চলছে এবং মামলার তদন্ত অব্যাহত রয়েছে।

প্রিপেইড মিটারের দীর্ঘ টোকেনে চরম ভোগান্তি, গ্রাহকসেবার দুর্বলতায় ক্ষোভ কিশোরগঞ্জে

নূর আহাম্মদ পলাশ প্রকাশিত: শুক্রবার, ৫ জুন, ২০২৬, ৭:০৩ অপরাহ্ণ
প্রিপেইড মিটারের দীর্ঘ টোকেনে চরম ভোগান্তি, গ্রাহকসেবার দুর্বলতায় ক্ষোভ কিশোরগঞ্জে

প্রতীকি ছবি

বিদ্যুতের মূল্য সমন্বয় ও প্রিপেইড মিটারের নিরাপত্তা হালনাগাদ কার্যক্রমের পর দেশের বিভিন্ন এলাকার মতো কিশোরগঞ্জেও দীর্ঘ টোকেন নম্বর নিয়ে চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন গ্রাহকরা। আগে যেখানে মাত্র ২০ ডিজিটের টোকেন নম্বর ব্যবহার করে সহজেই বিদ্যুৎ রিচার্জ করা যেত, সেখানে বর্তমানে ১৬০ থেকে ৩২০ ডিজিট পর্যন্ত দীর্ঘ টোকেন নম্বর প্রবেশ করাতে হচ্ছে। এতে সাধারণ গ্রাহকদের মধ্যে বিভ্রান্তি, ভোগান্তি ও ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, প্রিপেইড মিটারের ‘কি রিভিশন নম্বর’ (KRN) বা নিরাপত্তা কোড হালনাগাদের অংশ হিসেবে বিদ্যুৎ বিতরণকারী প্রতিষ্ঠানগুলো এ কার্যক্রম পরিচালনা করছে। বিদ্যুতের নতুন মূল্যহার, ভ্যাট এবং সফটওয়্যারভিত্তিক বিভিন্ন তথ্য মিটারে হালনাগাদ করার জন্য আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুসরণ করে এই আপডেট সম্পন্ন করা হচ্ছে।

তবে বাস্তব পরিস্থিতিতে দীর্ঘ টোকেন নম্বর প্রবেশ করাতে গিয়ে নানামুখী সমস্যার মুখোমুখি হচ্ছেন গ্রাহকরা। একটি সংখ্যা ভুল হলে পুরো টোকেন বাতিল হয়ে যাচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে বারবার ভুল কোড প্রবেশের কারণে মিটার সাময়িকভাবে লক হয়ে যাওয়ার ঘটনাও ঘটছে।

কিশোরগঞ্জের হারুয়া এলাকার বাসিন্দা আলমাছ মিয়া অভিযোগ করে বলেন, “আমি দীর্ঘদিন ধরে ২০ ডিজিটের টোকেন ব্যবহার করে মিটারে রিচার্জ করে আসছি। কিন্তু চলতি মাসে প্রায় ১৮০ ডিজিটের একটি টোকেন পেয়ে বিভ্রান্ত হয়ে পড়ি। বিষয়টি জানতে বিদ্যুৎ অফিসে ফোন করলে আমাকে বলা হয়, সব নম্বর একসঙ্গে প্রবেশ করতে হবে। পরে দেখি, ২০ ডিজিটের বেশি মিটারের স্ক্রিনে প্রদর্শিত হচ্ছে না। আবার যোগাযোগ করলে বলা হয়, মিটার নষ্ট হয়ে গেছে এবং নতুন মিটার নিতে হবে।”

তিনি আরও বলেন, “পরে অন্য একটি সূত্র থেকে জানতে পারি, প্রতি ২০ ডিজিট প্রবেশের পর সবুজ বাটন চাপ দিয়ে পরবর্তী অংশ প্রবেশ করতে হয়। অথচ বিদ্যুৎ অফিস থেকে আমাকে এ তথ্য দেওয়া হয়নি। ফলে অযথা ভোগান্তির শিকার হতে হয়েছে।”

আরেক গ্রাহক রওফ মিয়া বলেন, “বিদ্যুৎ বিভাগের হটলাইন বা গ্রাহকসেবা কেন্দ্রে দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ দেওয়া জরুরি। অনেক সময় সঠিক তথ্যের অভাবে গ্রাহকরা হয়রানির শিকার হন। এ বিষয়ে বিদ্যুৎ বিভাগকে ব্যাপক জনসচেতনতামূলক কার্যক্রম পরিচালনা করা উচিত।”

ভুক্তভোগী গ্রাহকদের দাবি, প্রিপেইড মিটারের নতুন টোকেন পদ্ধতি চালুর আগে গণমাধ্যম, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, এসএমএস এবং স্থানীয় পর্যায়ে প্রচারণা চালানো হলে সাধারণ মানুষ এ ধরনের সমস্যার সম্মুখীন হতেন না। পাশাপাশি গ্রাহকসেবা কেন্দ্রের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের দক্ষতা বৃদ্ধি এবং দ্রুত সেবা নিশ্চিত করারও দাবি জানিয়েছেন তারা।

সচেতন নাগরিকদের মতে, প্রযুক্তিগত পরিবর্তনের সঙ্গে গ্রাহকদের যথাযথভাবে সম্পৃক্ত না করলে জনদুর্ভোগ বাড়বে। তাই নতুন টোকেন পদ্ধতি ব্যবহারের নিয়ম সম্পর্কে সহজ ভাষায় নির্দেশনা প্রচার এবং প্রয়োজনীয় সহায়তা প্রদান করা জরুরি।

এদিকে দীর্ঘ টোকেন নম্বর ব্যবহারের বিষয়টি নিয়ে বিদ্যুৎ বিভাগের পক্ষ থেকে আরও ব্যাপক প্রচারণা, সচেতনতামূলক কর্মসূচি এবং কার্যকর গ্রাহকসেবা নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। তাদের মতে, প্রযুক্তিগত উন্নয়ন তখনই সফল হবে, যখন সাধারণ গ্রাহক সহজে ও নির্বিঘ্নে সেই সেবা গ্রহণ করতে পারবেন।

রেলস্টেশন দখল করে তাণ্ডব, ভৈরবে সংঘর্ষে আহত পুলিশ সদস্যসহ ২৫

জয়নাল আবেদীন রিটন প্রকাশিত: শুক্রবার, ৫ জুন, ২০২৬, ৩:৫৭ পূর্বাহ্ণ
রেলস্টেশন দখল করে তাণ্ডব, ভৈরবে সংঘর্ষে আহত পুলিশ সদস্যসহ ২৫

কিশোরগঞ্জের ভৈরবে ফুটবল খেলাকে কেন্দ্র করে দুই পক্ষের সংঘর্ষে রেলস্টেশন এলাকায় ব্যাপক উত্তেজনা, ভাঙচুর ও নৈরাজ্যের ঘটনা ঘটেছে। সংঘর্ষে পুলিশ সদস্যসহ অন্তত ২৫ জন আহত হয়েছেন। এ সময় ভৈরব রেলওয়ে স্টেশনের প্ল্যাটফর্ম দখল করে স্টেশন মাস্টারের কক্ষসহ বিভিন্ন স্থাপনায় হামলা ও ভাঙচুর চালানো হয়। পরিস্থিতির অবনতির কারণে ঢাকা-চট্টগ্রাম, ঢাকা-সিলেট ও ঢাকা-ময়মনসিংহ রুটের অন্তত ৯টি ট্রেন বিভিন্ন স্টেশনে আটকা পড়ে। প্রায় সাত ঘণ্টা বন্ধ থাকার পর ট্রেন চলাচল স্বাভাবিক হয়।

বৃহস্পতিবার (৪ জুন) সন্ধ্যা ৭টা থেকে গভীর রাত পর্যন্ত ভৈরব রেলস্টেশন ও আশপাশের এলাকায় এ সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। এতে নারী, পুরুষ ও শিশুসহ বহু যাত্রী আতঙ্কিত হয়ে পড়েন এবং বিভিন্নভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হন।

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, ফুটবল খেলাকে কেন্দ্র করে সৃষ্ট বিরোধের জেরে দুই পক্ষের মধ্যে প্রথমে বাকবিতণ্ডা এবং পরে সংঘর্ষ শুরু হয়। একপর্যায়ে সংঘর্ষ ছড়িয়ে পড়ে ভৈরব রেলস্টেশন এলাকায়। উত্তেজিত লোকজন প্ল্যাটফর্ম দখল করে স্টেশন মাস্টারের কক্ষ ও অন্যান্য স্থাপনায় হামলা চালায়। এছাড়া প্ল্যাটফর্মে থাকা একাধিক দোকানপাটে ভাঙচুর ও লুটপাটের অভিযোগ পাওয়া গেছে।

সংঘর্ষের কারণে রেলপথে চলাচলকারী একাধিক ট্রেন বিভিন্ন স্টেশনে আটকা পড়ে। এর মধ্যে ৩৭ আপ নাসিরাবাদ এক্সপ্রেস ব্রাহ্মণবাড়িয়া, ৭০৩ আপ মহানগর গোধূলী ভৈরব বাজার জংশন আউটার সিগন্যালে, ৭১০ ডাউন পারাবত এক্সপ্রেস তালশহর, ৭২২ ডাউন মহানগর এক্সপ্রেস নরসিংদী, ৭৩৯ আপ উপবন এক্সপ্রেস জিনারদী, ৮১৪ কক্সবাজার এক্সপ্রেস আড়িখোলা, ৭৪৯ এগারসিন্ধু গোধূলী দৌলতকান্দি, নরসিংদী কমিউটার খানাবাড়ি এবং ৬০৬ ডাউন মালবাহী ট্রেন মেথিকান্দা স্টেশনে আটকা পড়ে।

দীর্ঘ সময় ট্রেন চলাচল বন্ধ থাকায় শত শত যাত্রীকে চরম দুর্ভোগ পোহাতে হয়। অনেক যাত্রী স্টেশন ও ট্রেনের ভেতরে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করেন। কেউ কেউ বিকল্প পরিবহনের খোঁজে স্টেশন ত্যাগ করেন।

সংঘর্ষে পুলিশের উপপরিদর্শক (এসআই) সাইফুল ইসলাম এবং রেলওয়ে নিরাপত্তা বাহিনীর (আরএনবি) সদস্য মুছা মিয়াসহ অন্তত ২৫ জন আহত হন। আহতদের মধ্যে কয়েকজনকে স্থানীয় হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। অন্যদের প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়া হয়েছে।

ঘটনার খবর পেয়ে রেলওয়ে পুলিশ, ভৈরব থানা পুলিশ, র‌্যাব ও সেনাবাহিনীর সদস্যরা ঘটনাস্থলে পৌঁছে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করেন। তবে সংঘর্ষে জড়িতদের ব্যাপক ইটপাটকেল নিক্ষেপের কারণে শুরুতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে হিমশিম খায়। পরে অতিরিক্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণের মাধ্যমে রাত পৌনে ১টার দিকে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসে।

পরিস্থিতি স্বাভাবিক হওয়ার পর রাত ১টা ৫০ মিনিটের দিকে ট্রেন চলাচল পুনরায় শুরু হয়।

ভৈরব রেলওয়ে স্টেশনের স্টেশন মাস্টার মো. ইউছুফ বলেন, “ফুটবল খেলাকে কেন্দ্র করে সৃষ্ট সংঘর্ষে রেলস্টেশন কার্যত রণক্ষেত্রে পরিণত হয়। হামলাকারীরা স্টেশনের বিভিন্ন স্থাপনা ও দোকানপাটে ভাঙচুর চালায়। সংঘর্ষ শুরু হলে যাত্রীরা আতঙ্কে নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে ছোটাছুটি করতে থাকেন।”

ভৈরব রেলওয়ে থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সাঈদ আহমেদ বলেন, “ফুটবল খেলাকে কেন্দ্র করে দুই পক্ষের মধ্যে সংঘর্ষের সূত্রপাত হয়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে দীর্ঘ সময় কাজ করতে হয়েছে। ঘটনায় জড়িতদের শনাক্ত করে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের প্রক্রিয়া চলছে।”

স্থানীয় সচেতন মহল মনে করছে, সামান্য খেলাধুলাকে কেন্দ্র করে এমন সহিংসতা এবং রেলস্টেশনের মতো গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় হামলার ঘটনা অত্যন্ত উদ্বেগজনক। তারা দোষীদের দ্রুত আইনের আওতায় এনে কঠোর শাস্তি নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন।