কিশোরগঞ্জের কটিয়াদী উপজেলার আচমিতা ইউনিয়নের অন্যতম সামাজিক ও স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন ‘আশ্রয়’-এর ২৫ বছর পূর্তি (রজতজয়ন্তী) উপলক্ষে বরেণ্যজন সম্মাননা, আলোচনা সভা ও মনোজ্ঞ সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হয়েছে। বর্ণাঢ্য এ আয়োজনকে ঘিরে স্থানীয় জনসাধারণ, সমাজসেবী, শিক্ষাবিদ, সাংস্কৃতিক কর্মী ও বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত উপস্থিতিতে উৎসবমুখর পরিবেশের সৃষ্টি হয়।
রোববার বিকেলে আচমিতা আদর্শ উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে অনুষ্ঠিত অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন ‘আশ্রয়’-এর সদস্য শহিদুজ্জামান শহিদ। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থেকে বক্তব্য রাখেন কিশোরগঞ্জ-২ (কটিয়াদী-পাকুন্দিয়া) আসনের সংসদ সদস্য অ্যাডভোকেট মোহাম্মদ জালাল উদ্দিন।
বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন কটিয়াদী উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক আরিফুর রহমান কাঞ্চন, কটিয়াদী পৌর বিএনপির সভাপতি আশরাফুল হক দাদন, কটিয়াদী মডেল থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মোহাম্মদ রফিকুল ইসলাম, উপজেলা বিএনপির সহ-সভাপতি মাহাবুবুর রহমান বাচ্চু, মিজানুর রহমান স্বপন, শেখ জসিম উদ্দিন মেনু ও শফিকুর রহমান বাদল, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক শফিকুল ইসলাম ফুলু, সাংগঠনিক সম্পাদক মো. খলিলুর রহমান, কেন্দ্রীয় ছাত্রদলের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মো. নুরুজ্জামান চন্দন, আচমিতা ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি আব্দুল হান্নান, আচমিতা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মো. মতিউর রহমানসহ বিভিন্ন সামাজিক, রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক ও পেশাজীবী সংগঠনের নেতৃবৃন্দ।
অনুষ্ঠানের শুরুতে সংগঠনটির ২৫ বছরের কার্যক্রম নিয়ে একটি প্রামাণ্য ও স্মৃতিচারণমূলক উপস্থাপনা প্রদর্শন করা হয়। এতে প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকে বর্তমান সময় পর্যন্ত ‘আশ্রয়’-এর বিভিন্ন মানবিক, সামাজিক, পরিবেশবান্ধব ও জনকল্যাণমূলক কর্মকাণ্ড তুলে ধরা হয়। উপস্থাপনায় সংগঠনের দীর্ঘ পথচলার নানা চ্যালেঞ্জ, সাফল্য এবং সমাজকল্যাণে অবদানের চিত্র উপস্থিত দর্শকদের সামনে তুলে ধরা হয়।
পরে এলাকার বিশিষ্ট সমাজসেবক, শিক্ষাবিদ, সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব, কৃতী নাগরিক ও বিভিন্ন ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখা গুণীজনদের সম্মাননা স্মারক, উত্তরীয় ও ক্রেস্ট প্রদান করা হয়। সম্মাননা প্রাপ্তদের মধ্যে অনেকেই দীর্ঘদিন ধরে শিক্ষা, সমাজসেবা, মানবকল্যাণ ও সাংস্কৃতিক উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখে আসছেন।
আলোচনা সভায় বক্তারা বলেন, প্রায় ২৫ বছর আগে সামাজিক দায়বদ্ধতা ও মানবসেবার প্রত্যয় নিয়ে প্রতিষ্ঠিত হয় ‘আশ্রয়’। প্রতিষ্ঠার পর থেকে সংগঠনটি সুবিধাবঞ্চিত, হতদরিদ্র ও অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়িয়ে বিভিন্ন মানবিক কার্যক্রম পরিচালনা করে আসছে। খাদ্যসামগ্রী বিতরণ, চিকিৎসা সহায়তা, শিক্ষা উপকরণ প্রদান, বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি, পরিবেশ সংরক্ষণ, সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধি এবং দুর্যোগকালে ত্রাণ সহায়তা প্রদানের মতো অসংখ্য উদ্যোগের মাধ্যমে সংগঠনটি স্থানীয় পর্যায়ে প্রশংসিত হয়েছে।
বক্তারা বিশেষভাবে উল্লেখ করেন, ‘আশ্রয়’-এর অন্যতম ব্যতিক্রমী উদ্যোগ হলো পাখি ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণে গাছে গাছে কলসি ও মাটির পাতিল বেঁধে পাখিদের জন্য নিরাপদ আবাসস্থল তৈরি করা। পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য রক্ষায় এ উদ্যোগটি স্থানীয় পর্যায়ে ব্যাপক প্রশংসা কুড়িয়েছে। তারা বলেন, এ ধরনের উদ্যোগ নতুন প্রজন্মের মধ্যে প্রকৃতিপ্রেম, পরিবেশ সচেতনতা ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণের মানসিকতা গড়ে তুলতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে সংসদ সদস্য অ্যাডভোকেট মোহাম্মদ জালাল উদ্দিন বলেন, “একটি সমাজকে এগিয়ে নিতে সরকারের পাশাপাশি সামাজিক সংগঠনগুলোরও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। ‘আশ্রয়’ গত ২৫ বছর ধরে যে নিষ্ঠা, সততা ও মানবিকতার সঙ্গে মানুষের সেবা করে যাচ্ছে, তা নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয় এবং অনুকরণীয়।”
তিনি আরও বলেন, “সমাজের বিত্তবান ও সচেতন মানুষদেরও এ ধরনের সামাজিক ও মানবিক কর্মকাণ্ডে এগিয়ে আসা উচিত। সমাজের অসহায় ও সুবিধাবঞ্চিত মানুষের পাশে দাঁড়ানো আমাদের নৈতিক দায়িত্ব।”
দেশের সার্বিক উন্নয়নের প্রসঙ্গ তুলে তিনি বলেন, “বর্তমান সরকার শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কৃষি, যোগাযোগ ও অবকাঠামো খাতে ব্যাপক উন্নয়ন কর্মকাণ্ড বাস্তবায়ন করছে। খাল খনন, নদী পুনরুদ্ধার, গ্রামীণ সড়ক উন্নয়ন এবং জনকল্যাণমূলক বিভিন্ন প্রকল্পের মাধ্যমে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের মানুষের জীবনমান উন্নয়নে কাজ করা হচ্ছে।”
অনুষ্ঠানে সংগঠনের প্রতিষ্ঠাতা সদস্য ও প্রবীণ ব্যক্তিরা ‘আশ্রয়’-এর দীর্ঘ ২৫ বছরের নানা স্মৃতিচারণ করেন। তারা ভবিষ্যতে সংগঠনের কার্যক্রম আরও বিস্তৃত করে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, পরিবেশ সংরক্ষণ ও মানবকল্যাণমূলক কর্মকাণ্ডকে আরও শক্তিশালী করার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন।
আলোচনা সভা শেষে কিশোরগঞ্জ একতা নাট্যগোষ্ঠীর পরিবেশনায় গীতিনাট্য ‘মহুয়া সুন্দরী’ মঞ্চস্থ হয়। নাটকটির প্রাণবন্ত পরিবেশনা দর্শকদের মুগ্ধ করে। এছাড়া সাংস্কৃতিক পর্বে সংগীত, আবৃত্তি ও অন্যান্য পরিবেশনায় উপস্থিত দর্শক-শ্রোতারা আনন্দঘন সময় উপভোগ করেন।
রজতজয়ন্তী উপলক্ষে আয়োজিত এ অনুষ্ঠানটি শুধু একটি সংগঠনের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উদযাপন নয়, বরং সামাজিক দায়বদ্ধতা, মানবিক মূল্যবোধ ও সমাজসেবার এক অনন্য উদাহরণ হিসেবে স্থানীয়দের কাছে স্মরণীয় হয়ে থাকবে বলে মনে করেন উপস্থিত অতিথিরা।