ইন্টার্ন চিকিৎসকদের আন্দোলনে অচলাবস্থা, উদ্বেগে রোগী-স্বজনরা
সংগ্রহীত ছবি
কিশোরগঞ্জে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের একটি নোটিশ প্রত্যাহারসহ ছয় দফা দাবিতে অনির্দিষ্টকালের কর্মবিরতি পালন করছেন ইন্টার্ন চিকিৎসকেরা। একই দাবিতে মেডিকেল কলেজ শিক্ষার্থীদের ডাকা ‘একাডেমিক শাটডাউন’ কর্মসূচির কারণে শিক্ষা কার্যক্রমও কার্যত স্থবির হয়ে পড়েছে। ফলে চিকিৎসাসেবা ও শিক্ষাকার্যক্রম—উভয় ক্ষেত্রেই সৃষ্টি হয়েছে অচলাবস্থা। সবচেয়ে বেশি দুর্ভোগে পড়েছেন হাসপাতালে ভর্তি রোগী ও চিকিৎসা নিতে আসা সাধারণ মানুষ।
সোমবার (৮ জুন) দুপুরে কিশোরগঞ্জের শহীদ সৈয়দ নজরুল ইসলাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল চত্বরে ইন্টার্ন ডক্টরস অ্যাসোসিয়েশনের ব্যানারে মানববন্ধন ও বিক্ষোভ কর্মসূচি অনুষ্ঠিত হয়। এতে ইন্টার্ন চিকিৎসকদের পাশাপাশি মেডিকেল কলেজের সাধারণ শিক্ষার্থীরাও অংশ নেন।
আন্দোলনকারীদের অভিযোগ, স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের সাম্প্রতিক নোটিশ চিকিৎসকদের স্বার্থবিরোধী, বৈষম্যমূলক এবং অযৌক্তিক। এ কারণে তাঁরা কর্মবিরতিতে যেতে বাধ্য হয়েছেন। দাবি পূরণ না হওয়া পর্যন্ত আন্দোলন ও কর্মবিরতি অব্যাহত রাখার ঘোষণা দিয়েছেন তাঁরা।
হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, বর্তমানে শহীদ সৈয়দ নজরুল ইসলাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে প্রায় ৬৪৭ জন রোগী ভর্তি রয়েছেন। নিয়মিত চিকিৎসকদের পাশাপাশি প্রায় ৮০ জন ইন্টার্ন চিকিৎসক বিভিন্ন ওয়ার্ডে দায়িত্ব পালন করেন। টানা দ্বিতীয় দিনের মতো কর্মবিরতি চলায় হাসপাতালের চিকিৎসাসেবা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। বিশেষ করে ভর্তি রোগীদের নিয়মিত তদারকি, জরুরি চিকিৎসাসেবা এবং চিকিৎসা-সংক্রান্ত বিভিন্ন কার্যক্রমে সংকট তৈরি হয়েছে।
সরেজমিনে হাসপাতালে গিয়ে দেখা যায়, বহির্বিভাগ ও জরুরি বিভাগের সামনে রোগীদের দীর্ঘ সারি। দূরদূরান্ত থেকে আসা শত শত রোগী চিকিৎসকের জন্য অপেক্ষা করছেন। টিকিট কাউন্টার খোলা থাকলেও প্রয়োজনের তুলনায় চিকিৎসক সংকট থাকায় অনেক রোগী ক্ষোভ প্রকাশ করেন।
হাসপাতালের বিভিন্ন ওয়ার্ডেও দেখা দিয়েছে অতিরিক্ত চাপ। ইন্টার্ন চিকিৎসকদের অনুপস্থিতিতে দায়িত্বরত নার্স ও অন্যান্য স্বাস্থ্যকর্মীদের ওপর কাজের চাপ কয়েকগুণ বেড়েছে। ফলে রোগীদের নিয়মিত পরীক্ষা-নিরীক্ষা, ফলোআপ এবং ওষুধ ব্যবস্থাপনায় বিলম্ব হচ্ছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।
তাড়াইল উপজেলা থেকে অসুস্থ মাকে নিয়ে হাসপাতালে আসা মো. রহমত আলী বলেন, “সকাল থেকে মাকে নিয়ে হাসপাতালে দাঁড়িয়ে আছি। টিকিট কেটেছি, কিন্তু এখনও ডাক্তার দেখাতে পারিনি। ভেতরে গিয়ে দেখি চিকিৎসক নেই। গরিব মানুষের কষ্ট দেখার যেন কেউ নেই।”
মেডিসিন ওয়ার্ডে ভর্তি এক রোগীর স্বজন হোসেনপুর উপজেলার মো. শফিকুল ইসলাম বলেন, “আমার ভাইকে দুই দিন আগে জ্বর ও শ্বাসকষ্ট নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি করেছি। বড় ডাক্তাররা রাউন্ড দিয়ে চলে যাওয়ার পর কোনো সমস্যা হলে ইন্টার্ন চিকিৎসকদের পাওয়া যেত। কিন্তু গত দুই দিন ধরে তাঁদের দেখা মিলছে না। রোগী নিয়ে আমরা উদ্বেগ ও আতঙ্কের মধ্যে আছি।”
দুপুরের বিক্ষোভ সমাবেশে বক্তব্য দেন ইন্টার্ন ডক্টরস অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি ডা. মো. আবু ইউসুফ, সাধারণ সম্পাদক ডা. মো. আদনান কবির, সাংগঠনিক সম্পাদক মো. তওসিফ ফারহান সামি, মেডিকেল কলেজ ছাত্রদলের সভাপতি মো. রাফিউল সাকিব এবং সাধারণ সম্পাদক মো. মোক্তাদির আল বিরুনী।
সমাবেশে বক্তারা বলেন, তাঁদের যৌক্তিক দাবি নিয়ে এখন পর্যন্ত সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে কোনো দৃশ্যমান উদ্যোগ বা ইতিবাচক আশ্বাস পাওয়া যায়নি। এ কারণে তাঁরা আন্দোলনের পথ বেছে নিতে বাধ্য হয়েছেন।
ইন্টার্ন ডক্টরস অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি ডা. মো. আবু ইউসুফ বলেন, “আমাদের দেয়ালে পিঠ ঠেকে গেছে। আমরা কখনোই রোগীদের কষ্ট দিতে চাই না। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে দাবি উপেক্ষিত হওয়ায় বাধ্য হয়েই কঠোর কর্মসূচি গ্রহণ করতে হয়েছে। দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত আমাদের আন্দোলন চলবে।”
এদিকে কর্মবিরতি দীর্ঘায়িত হলে চিকিৎসাসেবার সংকট আরও তীব্র হতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন রোগী ও তাঁদের স্বজনরা। দ্রুত আলোচনার মাধ্যমে সংকট নিরসন এবং হাসপাতালের স্বাভাবিক চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন তারা।










