ঐতিহ্যবাহী নরসিংহ জিউর আখড়ার জমি নিয়ে বিতর্ক, জেলা প্রশাসনের হস্তক্ষেপ প্রত্যাশা
কিশোরগঞ্জের হোসেনপুর উপজেলার ঐতিহ্যবাহী শ্রী শ্রী নরসিংহ জিউর আখড়ার বিপুল পরিমাণ দেবোত্তর সম্পত্তি দীর্ঘদিন ধরে বেদখলে রয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয় হিন্দু ধর্মাবলম্বী, ভক্তবৃন্দ ও আখড়া পরিচালনা কমিটির দাবি, প্রভাবশালী একটি মহল আখড়ার অধিকাংশ সম্পত্তি দখল করে রেখেছে। ফলে ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানটির স্বাভাবিক কার্যক্রম, উন্নয়ন এবং ভবিষ্যৎ সম্প্রসারণ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। এ অবস্থায় বেদখলকৃত সম্পত্তি দ্রুত উদ্ধার করে আখড়ার স্বার্থ সংরক্ষণে প্রশাসনের কার্যকর হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন সংশ্লিষ্টরা।
আখড়া পরিচালনা কমিটি সূত্রে জানা যায়, সিএস ও এসএ রেকর্ড অনুযায়ী শ্রী শ্রী নরসিংহ জিউর আখড়ার নামে মোট ১ একর ৩৩ শতাংশ দেবোত্তর সম্পত্তি রয়েছে। তবে বাস্তবে এই সম্পত্তির প্রায় ৭০ থেকে ৮০ শতাংশ বর্তমানে বিভিন্ন ব্যক্তি ও গোষ্ঠীর দখলে রয়েছে বলে অভিযোগ করা হয়েছে।
কমিটির দেওয়া তথ্যমতে, রেকর্ডভুক্ত কয়েকটি দাগের জমি দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন ব্যক্তি ভোগদখল করে আসছেন। এর মধ্যে ৭৪ নম্বর দাগের ৫.৮১ শতাংশ জমি, ৭৩ নম্বর দাগের ৪ শতাংশ জমি এবং ৭৫ নম্বর দাগের ৩.৩২ শতাংশ জমি বিভিন্ন ব্যক্তি ও তাদের সহযোগীরা দখল করে রেখেছেন বলে দাবি করা হয়েছে। এছাড়া আখড়ার আরও কয়েকটি অংশ ভাড়াটিয়া ও দখলদারদের মাধ্যমে ব্যবহার করা হচ্ছে বলেও অভিযোগ রয়েছে।
সরেজমিনে দেখা যায়, আখড়ার মূল মন্দির ও আশপাশের উল্লেখযোগ্য অংশজুড়ে বিভিন্ন দোকানপাট, অস্থায়ী ও স্থায়ী স্থাপনা নির্মিত হয়েছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, এসব স্থাপনার একটি বড় অংশ দেবোত্তর সম্পত্তির ওপর গড়ে উঠেছে।
ধর্মীয় ও ঐতিহ্যবাহী এই প্রতিষ্ঠানের চারপাশের পরিবেশ আগের মতো নেই বলে জানান স্থানীয় ভক্তরা। তাদের মতে, একসময় আখড়ার বিস্তৃত এলাকা ধর্মীয় অনুষ্ঠান, পূজা-পার্বণ ও ভক্তদের সমাগমের জন্য ব্যবহৃত হলেও বর্তমানে জায়গা সংকুচিত হয়ে পড়েছে।
দীর্ঘদিন ধরে দেবোত্তর সম্পত্তি বেদখলে থাকায় স্থানীয় সনাতন ধর্মাবলম্বীদের মধ্যে ক্ষোভ ও উদ্বেগ বিরাজ করছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক ভক্ত বলেন, “এটি আমাদের পূর্বপুরুষদের দান করা দেবোত্তর সম্পত্তি। বছরের পর বছর ধরে আমরা দেখছি, আখড়ার জমি ধীরে ধীরে অন্যের দখলে চলে যাচ্ছে। দ্রুত ব্যবস্থা না নেওয়া হলে ভবিষ্যতে আখড়ার অস্তিত্বই সংকটের মুখে পড়তে পারে।”
তারা প্রশাসনের কাছে দ্রুত তদন্ত ও ভূমি উদ্ধারের উদ্যোগ নেওয়ার দাবি জানান।
দেবোত্তর সম্পত্তি উদ্ধারের দাবিতে ইতোমধ্যে উপজেলা প্রশাসনের কাছে লিখিত আবেদন করেছে আখড়া পরিচালনা কমিটি।
কমিটির নেতৃবৃন্দ জানান, শুধু মৌখিক অভিযোগ নয়, রেকর্ডপত্র ও প্রয়োজনীয় তথ্য-প্রমাণসহ তারা প্রশাসনের কাছে আবেদন জমা দিয়েছেন। তারা আশা করছেন, প্রশাসন বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেবে।
এ বিষয়ে হোসেনপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) এবং শ্রী শ্রী নরসিংহ জিউর আখড়া পরিচালনা কমিটির সভাপতি কাজী নাহিদ ইভা বলেন, “বিষয়টি অত্যন্ত সংবেদনশীল। আখড়ার দাবিকৃত সম্পত্তির সিএস, এসএ রেকর্ডসহ সংশ্লিষ্ট কাগজপত্র যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে।”
তিনি আরও বলেন, “ইতোমধ্যে বিষয়টি নিয়ে জেলা প্রশাসক ও অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব)-এর সঙ্গে আলোচনা হয়েছে। প্রয়োজনীয় কাগজপত্র যাচাই শেষে আইনানুগ প্রক্রিয়ায় বেদখলকৃত ভূমি উদ্ধারে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। দেবোত্তর সম্পত্তি রক্ষায় প্রশাসন বদ্ধপরিকর।”
উপজেলা প্রশাসনের আশ্বাসে স্থানীয় হিন্দু সম্প্রদায়ের মধ্যে কিছুটা আশাবাদ সৃষ্টি হলেও তারা দ্রুত দৃশ্যমান পদক্ষেপ দেখতে চান। তাদের মতে, শুধু তদন্ত নয়, বাস্তবিক অর্থে বেদখলকৃত জমি উদ্ধার এবং দখলদারদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা জরুরি।
স্থানীয় সচেতন মহলের অভিমত, ধর্মীয় ও ঐতিহ্যবাহী প্রতিষ্ঠানগুলোর সম্পত্তি সুরক্ষিত রাখা রাষ্ট্র ও প্রশাসনের দায়িত্ব। তাই দ্রুত প্রশাসনিক উদ্যোগের মাধ্যমে দেবোত্তর সম্পত্তি উদ্ধার করে আখড়ার স্বাভাবিক ধর্মীয় কার্যক্রম নিশ্চিত করা প্রয়োজন।










