মালয়েশিয়া-চীন সফরে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান: শ্রমবাজার, বিনিয়োগ ও নতুন চুক্তির প্রত্যাশা
প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের পর প্রথম বিদেশ সফরে যাচ্ছেন তারেক রহমান। আগামীকাল রোববার (২১ জুন) তিনি দুই দিনের সফরে মালয়েশিয়ার উদ্দেশে রওনা হবেন। সেখানকার সফর শেষে চীনে যাবেন তিনি। দুই দেশ মিলিয়ে মোট ছয় দিনের এই সফরকে কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে দেখা হচ্ছে। বিশেষ করে মালয়েশিয়া সফরে বাংলাদেশি শ্রমবাজার পুনরায় চালুর বিষয়ে ইতিবাচক অগ্রগতির আশা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, প্রধানমন্ত্রীর মালয়েশিয়া সফরে দুটি সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) এবং দুটি ‘নোট অব এক্সচেঞ্জ’ স্বাক্ষরিত হতে পারে। পাশাপাশি বাংলাদেশি কর্মীদের জন্য মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার পুনরায় চালু, অনিয়মিত কর্মীদের বৈধতা প্রদান এবং দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য সম্প্রসারণ সফরের অন্যতম প্রধান আলোচ্য বিষয় হবে। হালাল পণ্য রপ্তানির সম্ভাবনাও আলোচনায় গুরুত্ব পাবে।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিমের আমন্ত্রণে কুয়ালালামপুর সফরে যাচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। রোববার বিকেলে তিনি ঢাকা ত্যাগ করবেন। সফরের আনুষ্ঠানিক কর্মসূচি শুরু হবে ২২ জুন।
মালয়েশিয়ায় বাংলাদেশ হাইকমিশনের এক কর্মকর্তা জানান, সোমবার দুই দেশের প্রধানমন্ত্রীর মধ্যে দ্বিপাক্ষিক বৈঠক অনুষ্ঠিত হবে। বৈঠক শেষে দুটি সমঝোতা স্মারক ও দুটি ‘নোট অব এক্সচেঞ্জ’ সই হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। শ্রমবাজার পুনরায় সচল করাই হবে আলোচনার অন্যতম কেন্দ্রবিন্দু।
তিনি বলেন, মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার বাংলাদেশের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিভিন্ন কারণে দীর্ঘদিন ধরে এই বাজার স্থবির রয়েছে। চলমান সফরের মাধ্যমে শ্রমবাজার পুনরায় চালুর বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত আসতে পারে বলে আশা করা হচ্ছে।
মালয়েশিয়ায় বসবাসরত প্রবাসী বাংলাদেশিরাও এ সফরকে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ হিসেবে দেখছেন। তাদের প্রত্যাশা, সফরের মাধ্যমে বন্ধ শ্রমবাজার পুনরায় চালু, সিন্ডিকেটমুক্ত কলিং ভিসা ব্যবস্থা, অনিয়মিত কর্মীদের বৈধতার সুযোগ এবং দূতাবাস-সংক্রান্ত বিভিন্ন সমস্যার কার্যকর সমাধান হবে।
কুয়ালালামপুরে কর্মরত প্রবাসী জাহিদ বলেন, দুই দেশের সরকার যদি সরাসরি ও স্বচ্ছ পদ্ধতিতে কর্মী নিয়োগ নিশ্চিত করে, তাহলে সাধারণ শ্রমিকরা কম খরচে মালয়েশিয়ায় যাওয়ার সুযোগ পাবেন। তিনি এ বিষয়ে কার্যকর সিদ্ধান্তের প্রত্যাশা ব্যক্ত করেন।
আরেক প্রবাসী জাকারিয়া বলেন, কলিং ভিসা চালু হলেও যদি সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম্য বন্ধ না হয়, তাহলে সাধারণ মানুষের প্রকৃত উপকার হবে না। তাই জবাবদিহিমূলক ও স্বচ্ছ নিয়োগব্যবস্থা নিশ্চিত করা জরুরি।
বর্তমানে মালয়েশিয়ায় উল্লেখযোগ্য সংখ্যক বাংলাদেশি বিভিন্ন কারণে অনিয়মিত অবস্থায় রয়েছেন। কেউ নিয়োগকর্তার প্রতারণার শিকার হয়েছেন, আবার কেউ কর্মসংস্থানের অভাবে বৈধ অবস্থান হারিয়েছেন। তাদের আশা, নতুন বৈধকরণ কর্মসূচি চালু হলে তারা আইনগত স্বীকৃতি পেয়ে অধিক আয় ও বেশি রেমিট্যান্স পাঠাতে সক্ষম হবেন।
মালয়েশিয়ায় অধ্যয়নরত বাংলাদেশি শিক্ষার্থীরাও এই সফরের মাধ্যমে উচ্চশিক্ষা, গবেষণা সহযোগিতা, শিক্ষার্থী বিনিময় কর্মসূচি এবং বৃত্তির সুযোগ বৃদ্ধির দাবি জানিয়েছেন।
ইসলামিক ইউনিভার্সিটির গবেষক আলমগীর চৌধুরী আকাশ বলেন, মালয়েশিয়া আন্তর্জাতিক শিক্ষার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র। দুই দেশের মধ্যে শিক্ষা ও গবেষণা সহযোগিতা আরও সম্প্রসারিত হওয়া প্রয়োজন।
অন্যদিকে ব্যবসায়ী মহল আশা করছে, এই সফরের মাধ্যমে দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য ও বিনিয়োগে নতুন গতি আসবে। বিশেষ করে হালাল শিল্প, কৃষি, প্রযুক্তি ও উৎপাদন খাতে যৌথ উদ্যোগ সম্প্রসারণের সুযোগ সৃষ্টি হতে পারে।
প্রবাসী কমিউনিটি নেতা ও মালয়েশিয়া বিএনপির সহসাধারণ সম্পাদক কাজী সালাহউদ্দিন বলেন, প্রধানমন্ত্রীর এ সফর শুধু কূটনৈতিক আনুষ্ঠানিকতা নয়; বরং মালয়েশিয়ায় বসবাসরত লাখো বাংলাদেশির দীর্ঘদিনের প্রত্যাশা পূরণের একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ। তাঁর মতে, শ্রমবাজার সম্প্রসারণ, সিন্ডিকেটমুক্ত নিয়োগ এবং প্রবাসীবান্ধব নীতিমালা দুই দেশের সম্পর্ককে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাবে।
উল্লেখ্য, ২০২৫ সালের আগস্টে তৎকালীন প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মোহাম্মদ ইউনূস মালয়েশিয়া সফরকালে পাঁচটি সমঝোতা স্মারক ও তিনটি ‘নোট অব এক্সচেঞ্জ’ স্বাক্ষরিত হয়েছিল।
মালয়েশিয়া সফর শেষে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান চীনের উদ্দেশে রওনা হবেন। কূটনৈতিক মহলে এই সফরকেও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। ঢাকা-বেইজিং সম্পর্কের ভবিষ্যৎ দিকনির্দেশনা এই সফরে স্পষ্ট হতে পারে।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং এবং প্রধানমন্ত্রী লি কিয়াংয়ের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের পৃথক দ্বিপাক্ষিক বৈঠকের সম্ভাবনা রয়েছে। সফরের প্রস্তুতির অংশ হিসেবে সম্প্রতি পররাষ্ট্র সচিব আসাদ আলম সিয়াম বেইজিং সফর করে চীনের উপ-পররাষ্ট্রমন্ত্রী হুয়া চুনইংয়ের সঙ্গে সম্ভাব্য কর্মসূচি, চুক্তি ও সমঝোতা নিয়ে আলোচনা করেন।
সফরে প্রধানমন্ত্রীর স্ত্রী ডা. জোবাইদা রহমান, পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান, প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনা উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীরসহ উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিদল সফরসঙ্গী থাকবেন।
প্রধানমন্ত্রী দালিয়ানে অনুষ্ঠিতব্য ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের ‘অ্যানুয়াল মিটিং অব দ্য নিউ চ্যাম্পিয়নস’-এ অংশগ্রহণ করবেন। সেখান থেকে ২৪ জুন বুলেট ট্রেনে বেইজিংয়ে যাওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একজন কর্মকর্তা জানান, সফরে বাণিজ্য ও বিনিয়োগ বৃদ্ধি, জ্বালানি সহযোগিতা, চীনা শিল্প বাংলাদেশে স্থানান্তর, অর্থনৈতিক অঞ্চল উন্নয়ন, তিস্তা মহাপরিকল্পনা, মোংলা বন্দরের আধুনিকায়ন এবং গুয়াংজু-চট্টগ্রাম ও সাংহাই-চট্টগ্রাম সরাসরি বিমান যোগাযোগ চালুর বিষয়গুলো আলোচনায় থাকবে।
এ ছাড়া নবায়নযোগ্য জ্বালানি, আরসিইপি, ব্রিকস এবং সাংহাই কো-অপারেশন অর্গানাইজেশনে (এসসিও) বাংলাদেশের সম্ভাব্য সম্পৃক্ততা নিয়েও আলোচনা হতে পারে। চীনের অর্থায়নে বাংলাদেশে চলমান বিশেষায়িত হাসপাতাল নির্মাণ প্রকল্পগুলোর অগ্রগতি পর্যালোচনার পাশাপাশি নীলফামারীতে এক হাজার শয্যাবিশিষ্ট ‘বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী হাসপাতাল’ প্রতিষ্ঠার জন্য একটি দ্বিপাক্ষিক চুক্তি স্বাক্ষরের সম্ভাবনাও রয়েছে।
এ ছাড়া মোংলা বন্দরের সম্প্রসারণ ও আধুনিকায়ন, তিস্তা ব্যারাজ প্রকল্প, প্রস্তাবিত পদ্মা ব্যারাজসহ বেশ কয়েকটি বড় অবকাঠামো প্রকল্পে চীনের অর্থায়ন ও সহযোগিতা চাওয়া হতে পারে।













