সরকারি গাছ কাটার হিড়িক কুলিয়ারচরে, প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন
কিশোরগঞ্জের কুলিয়ারচরে সরকারি রাস্তা ও জায়গা থেকে অবাধে মূল্যবান গাছ কেটে নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। গত কয়েক মাসে উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় একের পর এক সরকারি গাছ কাটার ঘটনা ঘটলেও প্রশাসনের কার্যকর ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন স্থানীয়রা। নামমাত্র অভিযোগ দায়ের করে প্রকৃত জড়িতদের আড়াল করার অভিযোগেও স্থানীয় সচেতন মহলের মধ্যে ক্ষোভ দেখা দিয়েছে।
বুধবার (১৯ আগস্ট) সকালে উপজেলার আগরপুর-ভাগলপুর সড়কের রামদী বড়চর ফিডমিলসংলগ্ন এলাকায় সরেজমিনে দেখা যায়, স্থানীয় হেলাল মুন্সির জমির সীমানাঘেঁষা সরকারি রাস্তার পাশ থেকে বিভিন্ন প্রজাতির কয়েকটি গাছ কেটে মাটিতে ফেলে রাখা হয়েছে। স্থানীয়দের ধারণা, কাটা গাছগুলোর মূল্য প্রায় এক লাখ টাকা।
এ সময় গাছ কাটার কাজে নিয়োজিত শ্রমিকদের কাছে জানতে চাইলে তারা জানান, পার্শ্ববর্তী মনোহরপুর গ্রামের শহিদুল তাদের গাছগুলো কাটতে পাঠিয়েছেন। তবে গাছগুলো বিক্রির সঙ্গে কারা জড়িত, সে বিষয়ে তারা কোনো তথ্য দিতে পারেননি।
বিষয়টি তাৎক্ষণিকভাবে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. ইয়াসিন খন্দকার ও কুলিয়ারচর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) কাজী আরিফ উদ্দীনকে জানানো হলে প্রশাসনের পক্ষ থেকে গাছ কাটা ও নিয়ে যাওয়ার কাজে বাধা দেওয়া হয়।
এ বিষয়ে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে কি না জানতে চাইলে ইউএনও মো. ইয়াসিন খন্দকার বলেন, ‘তদন্ত সাপেক্ষে প্রয়োজনীয় আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
এর আগে চলতি বছরের জানুয়ারির শুরুতে উপজেলার গোবরিয়া আবদুল্লাহপুর ইউনিয়ন ভূমি অফিসের মাত্র ১০০ গজ দূরে সরকারি খাল ও রাস্তার পাশ থেকে ২০ থেকে ২৫টি গাছ কেটে বিক্রির অভিযোগ ওঠে। এ ঘটনায় সদ্য বদলি হওয়া গোবরিয়া আবদুল্লাহপুর ইউনিয়ন ভূমি সহকারী কর্মকর্তা নাছিমা আক্তার ও অফিস সহায়ক মো. রুকন উদ্দিনের বিরুদ্ধে অভিযোগ ওঠে।
অভিযোগকারীদের দাবি, ওই গাছগুলো বিক্রি করে প্রায় ১০ লাখ টাকা হাতিয়ে নেওয়া হয়। পরে ঘটনা ধামাচাপা দিতে গত ১৫ জানুয়ারি কুলিয়ারচর থানায় অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ১৮টি গাছ চুরির অভিযোগ দেন নাছিমা আক্তার। তবে স্থানীয়দের দাবি, ওই অভিযোগ থানায় মামলা হিসেবে নথিভুক্ত হয়নি এবং দৃশ্যমান কোনো তদন্তও হয়নি।
অভিযোগকারীদের ভাষ্য, ওই লিখিত অভিযোগ দেখিয়ে বিষয়টি ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করা হয়। এর কিছুদিন পর একইভাবে আরও তিনটি গাছ বিক্রি করে প্রায় ৮০ হাজার টাকা হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ ওঠে। এ ঘটনাতেও কার্যকর আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ স্থানীয়দের।
এরই ধারাবাহিকতায় গত ২৪ থেকে ২৬ জুলাই একই স্থান থেকে আরও তিনটি মূল্যবান গাছ কেটে নেওয়ার অভিযোগ ওঠে। স্থানীয় বাসিন্দারা গাছ কাটার ভিডিও উপজেলা প্রশাসন ও ভূমি কর্মকর্তাদের কাছে পাঠান।
স্থানীয়দের দাবি, ভিডিওতে গাছ কাটার কাজে নিয়োজিত ব্যক্তিদের একজনকে ‘মাসুদ’ নামে এক ব্যক্তির নির্দেশে গাছ কাটার কথা বলতে শোনা যায়। এরপরও গত ২৬ জুলাই থানায় দেওয়া অভিযোগে নির্দিষ্ট কারও নাম উল্লেখ না করে অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিদের আসামি করা হয়।
স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রশাসনকে অবহিত করার পর প্রথমে গাছ কাটা বন্ধ করা হলেও কয়েক দিন পর গাছগুলো নিয়ে যাওয়া হয়। এ ঘটনায় কার্যকর ব্যবস্থা না নেওয়ায় সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
তবে অভিযোগের বিষয়ে কুলিয়ারচর থানার ওসি কাজী আরিফ উদ্দীন বলেন, ‘সম্প্রতি বদলি হওয়া গোবরিয়া আবদুল্লাহপুর ইউনিয়ন ভূমি সহকারী কর্মকর্তা নাছিমা আক্তার লিখিত অভিযোগে কোনো আসামির নাম উল্লেখ করেননি। পুলিশ আসামিদের নাম দিতে বললেও বাদী তা দেননি। বিষয়টি তদন্ত করে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
এর আগে গত বছরের ১৬ ও ১৭ নভেম্বর উপজেলার বাজরা মাছিমপুর এলাকায় সরকারি রাস্তা ও ঈদগাহ মাঠ থেকে শতবর্ষী জাম, আম ও রেন্ট্রি গাছ কেটে বিক্রি করে দেওয়ার অভিযোগ ওঠে। এ ঘটনায় ১৭ নভেম্বর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কাছে লিখিত অভিযোগ দেন স্থানীয়রা।
অভিযোগ পাওয়ার পর সহকারী কমিশনার (ভূমি) মেফতাহুল হাসান পুলিশ নিয়ে ঘটনাস্থলে যান। পরে কাটা গাছ জব্দ করে স্থানীয় সালুয়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ কাইয়ুমের জিম্মায় রাখা হয়।
অভিযোগকারীরা জানান, বাজরা মাছিমপুর খেলার মাঠের পাশ দিয়ে যাওয়া পুরোনো সরকারি রেকর্ডভুক্ত রাস্তা ও ঈদগাহ মাঠে থাকা শতবর্ষী একটি রেন্ট্রি, একটি আম ও একটি জামগাছ প্রশাসনের অনুমতি ছাড়াই কেটে বিক্রি করা হয়। তাঁদের দাবি, তিনটি গাছের আনুমানিক মূল্য প্রায় দুই লাখ টাকা।
অভিযোগে মাছিমপুর গ্রামের সিরাজুল ইসলাম, সাইফুল ইসলাম লিটন, নুরুল মনছুর টেনাম ও তানভীর আহমেদসহ কয়েকজনের নাম উল্লেখ করা হয়।
স্থানীয়দের ভাষ্য, গাছগুলো বিক্রির পর মনোহরপুর গ্রামের নূরুল ইসলামের ছেলে ও গাছ ব্যবসায়ী মো. ফুল মিয়া (৪৫) গাছ কাটতে শুরু করেন। খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে গাছ কাটা ও নিয়ে যেতে বাধা দেয়।
এ বিষয়ে মাছিমপুর গ্রামের মো. সাইফুল ইসলাম লিটনসহ গাছ বিক্রির সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিরা গাছ বিক্রির কথা স্বীকার করেন। তাঁদের দাবি, গ্রামের পুরোনো চলাচলের রাস্তা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় নতুন রাস্তা ব্যবহারের উপযোগী করতে এবং সরকারি প্রকল্পের মাধ্যমে রাস্তা সংস্কারের জন্য সেটি দৃশ্যমান করার প্রয়োজন ছিল।
তাঁদের ভাষ্য, স্থানীয় মুরব্বিদের সঙ্গে পরামর্শ করে এবং ইউপি চেয়ারম্যান ও সদস্যকে অবহিত করে রাস্তার ওপর থাকা একটি জামগাছ এবং ঈদগাহের সীমানায় থাকা একটি রেন্ট্রি ও একটি আমগাছ ১ লাখ ১৮ হাজার টাকা নির্ধারণ করে বিক্রি করা হয়। পরে প্রশাসনের নির্দেশে গাছ কাটা ও নিয়ে যাওয়া বন্ধ রাখা হয়। এ ঘটনায় সংশ্লিষ্টরা নিজেদের ভুল স্বীকার করেন।
এ ছাড়া গত ৭ ও ৮ মে বাজরা বাসস্ট্যান্ড থেকে কামালপুর যাওয়ার সড়কের মোড় থেকে একটি মূল্যবান রেন্ট্রি গাছ প্রায় ৮০ শতাংশ কেটে ফেলার পর স্থানীয়দের বাধায় কাজ বন্ধ হয়ে যায়।
স্থানীয়দের অভিযোগ, কুলিয়ারচর পৌরসভার সাবেক পৌর কমিশনার শহিদ মিয়া গাছটি কাটাচ্ছিলেন। তবে শহিদ মিয়া গাছটি কাটার কথা স্বীকার করে বলেন, গাছটি তাঁদের সীমানায় তাঁরাই রোপণ করেছিলেন। গাছটির কারণে যানবাহন চলাচল ও দোকানদারদের সমস্যা হওয়ায় তিনি সেটি কাটছিলেন।
সরকারি সম্পত্তি রক্ষায় প্রশাসনের এমন ভূমিকা নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন স্থানীয় সচেতন নাগরিকেরা। তাঁদের দাবি, কোনো কর্মকর্তা বদলি হলেই সমস্যার সমাধান হয় না। ভিডিও ফুটেজ, প্রত্যক্ষদর্শীর বক্তব্য ও অন্যান্য প্রমাণের ভিত্তিতে প্রকৃত জড়িতদের শনাক্ত করে আইনগত ব্যবস্থা নিতে হবে।
একই সঙ্গে সরকারি রাস্তা, খাল, ঈদগাহ মাঠসহ অন্যান্য সরকারি জায়গা থেকে নিয়মবহির্ভূতভাবে গাছ কেটে সরকারি সম্পদের ক্ষতি করেছেন- এমন ব্যক্তিদের বিরুদ্ধেও দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন তাঁরা।
এ বিষয়ে কুলিয়ারচর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. ইয়াসিন খন্দকার বলেন, ‘নিয়মবহির্ভূতভাবে সরকারি সম্পত্তি থেকে গাছ কাটার সত্যতা পাওয়া গেলে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে দ্রুত মামলা দায়েরসহ আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এসব বিষয়ে তদন্ত চলছে।’














Warning: Array to string conversion in /home/dkishoreganj/public_html/wp-content/plugins/gs-facebook-comments/public/class-wpfc-public.php on line 311
Array