কিশোরগঞ্জের হোসেনপুর উপজেলার ঐতিহ্যবাহী পিপলাকান্দি উচ্চ বিদ্যালয়ে শিক্ষা কার্যক্রম ও স্বাভাবিক পরিবেশ দীর্ঘদিন ধরে নানা প্রশাসনিক জটিলতা, অভ্যন্তরীণ বিরোধ ও আর্থিক অনিয়মের অভিযোগে ব্যাহত হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে। বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক, সহকারী প্রধান শিক্ষকসহ কয়েকজন শিক্ষককে ঘিরে পাল্টাপাল্টি অভিযোগ, অনাস্থা, মামলা-মোকদ্দমা ও প্রশাসনিক জটিলতার কারণে শিক্ষার পরিবেশ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে বলে দাবি করেছেন সংশ্লিষ্ট কয়েকজন।
এসব বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে লিখিত অভিযোগ দিয়ে সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত ঘটনা উদঘাটন এবং অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে প্রয়োজনীয় আইনগত ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানানো হয়েছে।
অভিযোগগুলোতে প্রতিষ্ঠানের অর্থ ব্যবস্থাপনায় অনিয়ম, শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে বিভিন্ন খাতে অতিরিক্ত অর্থ আদায়, বিনামূল্যের সরকারি বই বিতরণে অনিয়ম, পরীক্ষার ফি ও অন্যান্য আর্থিক বিষয়ে অসংগতি, শিক্ষক-কর্মচারীদের মধ্যে বিভাজন এবং বিদ্যালয়ের প্রশাসনিক কার্যক্রমে নানা জটিলতার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। তবে এসব অভিযোগের সত্যতা স্বাধীনভাবে যাচাই করা হয়নি। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমেই প্রকৃত ঘটনা স্পষ্ট হতে পারে।
বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মো. নাজমুল ইসলাম ভূইয়া অভিযোগের বিষয়ে বলেন, প্রতিষ্ঠানের স্বাভাবিক কার্যক্রম ব্যাহত করে এমন বিভিন্ন কর্মকাণ্ডের বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের একাধিকবার অবহিত করা হলেও কার্যকর সমাধান হয়নি।
তাঁর দাবি, সরকারি বরাদ্দসহ বিভিন্ন খাতের অর্থের হিসাব যথাযথভাবে পরিচালনা এবং আর্থিক কার্যক্রমে পূর্ণ স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা জরুরি। শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে সরকারি নির্দেশনার বাইরে কোনো অর্থ আদায়ের অভিযোগ থাকলে তা তদন্তের মাধ্যমে যাচাই করা উচিত বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
প্রধান শিক্ষক আরও বলেন, বিদ্যালয়ের কয়েকজন শিক্ষককে কেন্দ্র করে অভ্যন্তরীণ বিভাজন তৈরি হওয়ায় শিক্ষক-কর্মচারীদের মধ্যে বিরোধ দেখা দিয়েছে। এর প্রভাব নিয়মিত পাঠদান ও প্রশাসনিক কার্যক্রমেও পড়ছে। অতীতের বিভিন্ন ঘটনা ও বিরোধকে কেন্দ্র করে মামলা-মোকদ্দমা, অভিযোগ-পাল্টা অভিযোগ এবং প্রশাসনিক চাপের পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে বলেও দাবি করেন তিনি।
অন্যদিকে বিদ্যালয়ের সহকারী প্রধান শিক্ষক মোহাম্মদ হেলাল উদ্দিন প্রধান শিক্ষকের বিরুদ্ধে ব্যাপক অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ রয়েছে দাবি করে বলেন, বিষয়গুলো সুষ্ঠুভাবে তদন্ত করা প্রয়োজন।
তিনি জানান, এসব অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে শিক্ষকরা মিলে প্রধান শিক্ষকের বিরুদ্ধে অনাস্থা দেওয়ার বিষয়েও উদ্যোগ নেওয়ার কথা ভাবছেন।
তবে প্রধান শিক্ষকের বিরুদ্ধে ওঠা এসব অভিযোগের সত্যতা নিরপেক্ষভাবে যাচাই করা হয়নি।
বিদ্যালয়ের কয়েকজন অভিভাবক সদস্য মো. হুমায়ুন সরকার, মো. রুহুল মিয়া ও ওয়াদুদ ভূইয়া বলেন, পিপলাকান্দি উচ্চ বিদ্যালয় এলাকার একটি পুরোনো ও ঐতিহ্যবাহী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। দীর্ঘদিন ধরে এ বিদ্যালয় থেকে বহু শিক্ষার্থী শিক্ষা গ্রহণ করে বিভিন্ন ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠিত হয়েছেন।
তাঁদের মতে, ব্যক্তিগত দ্বন্দ্ব, আর্থিক অনিয়ম কিংবা প্রশাসনিক বিরোধের কারণে প্রতিষ্ঠানের সুনাম ও শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ যেন ক্ষতিগ্রস্ত না হয়, সে বিষয়ে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন।
তাঁরা বলেন, কোনো পক্ষের অভিযোগকে একতরফাভাবে সত্য ধরে না নিয়ে নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত ঘটনা বের করে আনা জরুরি। একই সঙ্গে বিদ্যালয়ের আর্থিক লেনদেন, হিসাব-নিকাশ, শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে আদায় করা অর্থ এবং বিভিন্ন খাতের ব্যয়ের বিষয়গুলো যাচাই করার দাবি জানান তাঁরা।
বিদ্যালয়ের বর্তমান পরিচালনা কমিটির সভাপতি ইঞ্জিনিয়ার শফিকুল ইসলাম (রুবেল), শিক্ষক-কর্মচারী ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বিভিন্ন সময়ে কমিটি গঠন, নির্বাচন ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্তকে কেন্দ্র করে বিদ্যালয়ে বিরোধের সৃষ্টি হয়েছে। এসব বিরোধের প্রভাব বিদ্যালয়ের দৈনন্দিন কার্যক্রমেও পড়ছে বলে তাঁরা জানান।
সংশ্লিষ্টদের দাবি, প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে বিভিন্ন সময়ে মামলা, অভিযোগ ও তদন্তের ঘটনা ঘটেছে। আবার কোনো কোনো অভিযোগ পরবর্তীতে মিথ্যা প্রমাণিত হয়েছে বলেও তাঁরা দাবি করেন। এ কারণে অভিযোগ-পাল্টা অভিযোগের পরিবর্তে নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত ঘটনা উদঘাটনের ওপর গুরুত্বারোপ করেন তাঁরা।
তাঁদের মতে, শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের স্বার্থে বিদ্যালয়ে শান্তিপূর্ণ ও শিক্ষাবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করা জরুরি। কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর ব্যক্তিগত বিরোধের কারণে যেন শিক্ষার্থীদের পড়াশোনা ব্যাহত না হয়, সেদিকে সংশ্লিষ্ট শিক্ষা কর্তৃপক্ষকে নজর দিতে হবে।
সংশ্লিষ্টরা আরও বলেন, দুর্নীতি ও আর্থিক অনিয়মের যেসব অভিযোগ উঠেছে, সেগুলো নিরপেক্ষভাবে তদন্তের পাশাপাশি প্রতিষ্ঠানের আর্থিক লেনদেন ও হিসাব-নিকাশ যাচাই করা প্রয়োজন। শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে আদায় করা অর্থের সঠিক হিসাব পর্যালোচনা এবং প্রশাসনিক কার্যক্রমে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করারও দাবি জানান তাঁরা।
অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে দায়ীদের বিরুদ্ধে বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন তাঁরা।
বিদ্যালয়ের নবম শ্রেণির শিক্ষার্থী সাখাওয়াত হোসেন ও দূর্জয় বলেন, বিদ্যালয়ের ভর্তি ফরমসহ বিভিন্ন আর্থিক কার্যক্রম ব্যাংকের মাধ্যমে পরিচালনা করা হলে লেনদেনে স্বচ্ছতা বাড়বে। এতে অনিয়মের সুযোগ কমবে এবং বিদ্যালয় তার পুরোনো ঐতিহ্য ফিরে পাবে বলে তাঁরা আশা প্রকাশ করেন।
এ বিষয়ে উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা আবুল কালাম আজাদ বলেন, বিদ্যালয়ের বিভিন্ন বিষয় নিয়ে অভিযোগ ও মামলা-মোকদ্দমা হয়েছে। এর মধ্যে অনেক অভিযোগের তদন্ত করে প্রতিবেদনও দেওয়া হয়েছে।
তিনি বলেন, প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার পরিবেশ ও ঐতিহ্য ফিরিয়ে আনতে হলে শিক্ষকদের মধ্যে চলমান কোন্দল ও রেষারেষি সামাজিকভাবে বসে মীমাংসা করা অত্যন্ত জরুরি।
উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা আরও বলেন, একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মূল লক্ষ্য হচ্ছে শিক্ষার্থীদের সুষ্ঠু ও মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করা। তাই শিক্ষক-কর্মচারীদের অভ্যন্তরীণ বিরোধের প্রভাব যাতে শিক্ষার্থীদের ওপর না পড়ে, সে বিষয়ে সবাইকে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে।
স্থানীয়দের মতে, পিপলাকান্দি উচ্চ বিদ্যালয় শুধু একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নয়; এটি দীর্ঘদিন ধরে এলাকার শিক্ষা ও সামাজিক উন্নয়নের সঙ্গে জড়িত একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান। নানা অভিযোগ, বিরোধ ও প্রশাসনিক জটিলতার কারণে শিক্ষার পরিবেশ নষ্ট হলে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে শিক্ষার্থীরা।
তাই অভিযোগগুলোর সত্যতা যাচাইয়ে দ্রুত নিরপেক্ষ তদন্ত, আর্থিক হিসাব-নিকাশ পর্যালোচনা, প্রশাসনিক কার্যক্রমে স্বচ্ছতা নিশ্চিত এবং শিক্ষক-কর্মচারীদের মধ্যে চলমান বিরোধ নিরসনে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন অভিভাবক ও স্থানীয়রা।
তাঁদের প্রত্যাশা, সংশ্লিষ্ট শিক্ষা কর্তৃপক্ষ দ্রুত প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিয়ে পিপলাকান্দি উচ্চ বিদ্যালয়ের দীর্ঘদিনের ঐতিহ্য, সুনাম ও স্বাভাবিক শিক্ষার পরিবেশ ফিরিয়ে আনবে।
Warning: Array to string conversion in /home/dkishoreganj/public_html/wp-content/plugins/gs-facebook-comments/public/class-wpfc-public.php on line 311
Array