যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় লেবানন-ইসরায়েল সমঝোতা, হিজবুল্লাহর কড়া প্রত্যাখ্যান
যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় ওয়াশিংটনে পাঁচ দফা আলোচনার পর লেবানন ও ইসরায়েলের মধ্যে একটি ত্রিপক্ষীয় কাঠামোগত সমঝোতা হয়েছে। শুক্রবার (২৬ জুন) স্বাক্ষরিত এই সমঝোতায় তৃতীয় পক্ষ হিসেবে যুক্তরাষ্ট্র অংশ নিয়েছে। চুক্তির লক্ষ্য হিসেবে লেবাননের সার্বভৌমত্ব পুনঃপ্রতিষ্ঠা, হিজবুল্লাহর সামরিক সক্ষমতা হ্রাস এবং সীমান্তে দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠার বিষয়গুলো উল্লেখ করা হয়েছে। তবে এই সমঝোতা সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেছে হিজবুল্লাহ।
বার্তা সংস্থা রয়টার্স জানায়, ওয়াশিংটনে অনুষ্ঠিত আলোচনার পর এই কাঠামোগত সমঝোতা চূড়ান্ত হয়। অপরদিকে মিডল ইস্ট আই জানিয়েছে, চুক্তি স্বাক্ষরের আগে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও সাংবাদিকদের বলেন, “এটি কেবল শুরু—শুরুরও শুরু (the beginning of the beginning)।”
চুক্তির পর এক লিখিত বিবৃতিতে রুবিও জানান, জাতিসংঘের সমন্বয়ে যুদ্ধক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলোর জন্য যুক্তরাষ্ট্র ১০০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার মানবিক সহায়তা দেবে। পাশাপাশি লেবাননের সশস্ত্র বাহিনীকে সহায়তার জন্য ট্রাম্প প্রশাসন ৩০ মিলিয়ন ডলার বরাদ্দ দেবে।
তিনি বলেন, এই কাঠামোর আওতায় হিজবুল্লাহর নিরস্ত্রীকরণ, সংগঠনটির সামরিক অবকাঠামো অপসারণ এবং নিরাপত্তা পরিস্থিতির উন্নতি সাপেক্ষে সীমান্তবর্তী এলাকা থেকে ইসরায়েলি বাহিনীর ধাপে ধাপে সরে যাওয়ার একটি রূপরেখা নির্ধারণ করা হয়েছে। এছাড়া যুক্তরাষ্ট্রের তত্ত্বাবধানে মিলিটারি কো-অর্ডিনেশন গ্রুপ ফর লেবানন (Military Coordination Group for Lebanon) নামে একটি পাইলট সমন্বয় কাঠামো গঠনের কথাও উল্লেখ করা হয়েছে।
লেবাননের প্রধানমন্ত্রী নাওয়াফ সালাম সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক বার্তায় বলেন, এই সমঝোতা দেশটির সার্বভৌমত্ব পুনঃপ্রতিষ্ঠার পথে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ।
তবে তিনি স্পষ্ট করে বলেন, এটি নতুন কোনো বাধ্যবাধকতা সৃষ্টি করছে না। বরং জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের ১৭০১ নম্বর প্রস্তাব এবং ২০২৪ সালের যুদ্ধবিরতি চুক্তির বাস্তবায়নকে এগিয়ে নেওয়ার একটি কাঠামো মাত্র।
তিনি আরও বলেন, লেবাননের ভূখণ্ডে অস্ত্র বহনের অধিকার কেবল বৈধ রাষ্ট্রীয় বাহিনীরই রয়েছে।
আলোচনায় হিজবুল্লাহ সরাসরি অংশ নেয়নি। তবে মার্কো রুবিও জানান, সংগঠনটির সঙ্গে পরোক্ষভাবে যোগাযোগ রাখা হয়েছিল।
বর্তমানে হিজবুল্লাহকে লেবাননের সবচেয়ে শক্তিশালী সশস্ত্র সংগঠন হিসেবে বিবেচনা করা হয়। বিশ্লেষকদের মতে, তাদের সামরিক সক্ষমতা দেশটির নিয়মিত সেনাবাহিনীর তুলনায় অনেক বেশি।
ওয়াশিংটনে লেবাননের রাষ্ট্রদূত নাদা হামেদা মোয়ায়েদ আলোচনাকে “দীর্ঘ ও কঠিন” উল্লেখ করে বলেন, এটি লেবাননের সার্বভৌমত্ব ও ভৌগোলিক অখণ্ডতা পুনঃপ্রতিষ্ঠা, স্থায়ী যুদ্ধবিরতি এবং বাস্তুচ্যুত মানুষের নিরাপদ প্রত্যাবর্তনের পথে প্রথম ধাপ।
অন্যদিকে, ইসরায়েলের রাষ্ট্রদূত ইয়াখেল লেইতার বলেন, “ইরান ও হিজবুল্লাহ বাইরে থাকলে ইসরায়েল-লেবানন শান্তির নতুন পথ উন্মুক্ত হবে।”
ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু বলেছেন, হিজবুল্লাহ সম্পূর্ণ নিরস্ত্রীকরণ না হওয়া পর্যন্ত দক্ষিণ লেবাননের নিরাপত্তা অঞ্চলে ইসরায়েলি সেনাবাহিনী অবস্থান বজায় রাখবে।
পরিকল্পনা অনুযায়ী, লিতানি নদীর দক্ষিণ ও উত্তর অংশে দুটি পাইলট নিরাপত্তা অঞ্চল গঠন করা হবে। ইসরায়েলি সেনা প্রত্যাহারের পর সেখানে লেবাননের সেনাবাহিনী মোতায়েন করা হবে।
তবে নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, সীমিত সক্ষমতার লেবাননের সেনাবাহিনী এত বড় দায়িত্ব কতটা কার্যকরভাবে পালন করতে পারবে এবং প্রয়োজন হলে হিজবুল্লাহর বিরুদ্ধে অবস্থান নেবে কি না—তা এখনো অনিশ্চিত।
অন্যদিকে আনাদোলু এজেন্সি জানিয়েছে, ওয়াশিংটনের এই সমঝোতা প্রত্যাখ্যান করেছে হিজবুল্লাহ।
টেলিভিশনে দেওয়া ভাষণে সংগঠনটির মহাসচিব নাইম কাশেম বলেন, ইসরায়েলকে কোনো শর্ত ছাড়াই লেবাননের ভূখণ্ড থেকে সেনা প্রত্যাহার করতে হবে।
তিনি বলেন, “লেবাননের সার্বভৌমত্ব ক্ষুণ্ন করে এমন কোনো প্রতিশ্রুতি গ্রহণযোগ্য নয়। এ ধরনের কোনো চুক্তিতে স্বাক্ষর করার অধিকার কারও নেই।”
ইসরায়েলের রাষ্ট্রায়ত্ত সম্প্রচারমাধ্যম কান জানিয়েছে, আলোচনার অন্যতম বিরোধপূর্ণ বিষয় ছিল তথাকথিত ‘ইয়েলো লাইন’ বা অ্যান্টি-ট্যাংক লাইন। এপ্রিল মাসে নির্ধারিত এই কাল্পনিক রেখাটি ইসরায়েল সীমান্ত থেকে প্রায় ৮ কিলোমিটার লেবাননের অভ্যন্তরে বিস্তৃত।
লেবাননের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের ২ মার্চ থেকে শুরু হওয়া ইসরায়েলি সামরিক অভিযানে এখন পর্যন্ত ৪ হাজার ২৩১ জন নিহত এবং ১২ হাজার ১৭৯ জন আহত হয়েছেন।







